হতাশা ও মনোবিদ ভাইয়া!
.
মূলঃ ডা. তানভীর রহমান
শ্রুতি লিখনঃ আব্দুস সালাম
ⓒ ষোলো ম্যাগাজিন, সংখ্যা ৩

—-

আমাদের আশেপাশে হতাশ মানুষের সংখ্যা কিন্তু নেহাতই কম না। এমনকি আমরাও ছোটখাটো তুচ্ছ বিষয়ে বেশ ভেঙে পড়ি। আর বয়সটা তো এমনই যে অনেক অনেক আবেগ জমা হয়ে থাকে মনের মধ্যে। পত্র-পত্রিকায় চোখ রাখলে কিছুদিন পরপরই খবর আসে কোনো না কোনো শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করছে। এর পেছনেও কিন্তু নাটের গুরু অধিকাংশ সময়ই এই হতাশা। চলো জেনে নেওয়া যাক প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে এই বিষয় সম্পর্কেঃ
.
 ডিপ্রেশন বা হতাশা কী ? সাধারণ মন খারাপ ও হতাশা’র মধ্যে পার্থক্যই বা কী?
.
– সাধারণ মন খারাপ হলো আমাদের একটি Emotional Reaction আর হতাশা হলো একটি মানসিক রোগ। আমাদের যে সাধারণ মন খারাপ হয়ে থাকে তা যখন অনেকদিন স্থায়ী হয় তখনই মূলত সেটি হতাশায় পরিণত হয়। যেটিকে Medical Science এর ভাষায় Clinical Depression অথবা Major Depressive Disorder বলা হয়, যা বলতে আমরা বিষণ্ণতা বুঝি। সাধারণ মন খারাপের সময় সীমা যত দীর্ঘ হতে থাকে তখন মূলত চিন্তা, আচরণ, আবেগ সবকিছুর সংমিশ্রণে সেটি হতাশা বা হতাশায় রূপ নেয়।
.
 আমরা কখন বুঝতে পারব যে, কেউ হতাশায় ভুগছে কি-না অথবা হতাশার লক্ষণ সমূহ কী কী?
.
– American Psychological Association এর মতে কিছু বিষয়কে তারা হতাশার Criteria বা নির্ণায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বর্তমানে Diagnostic Statistical Manual বা DSM-5 হতাশার ৯ থেকে ১৩ টি লক্ষণ নির্ধারণ করেছে। যদি কারো মধ্যে পাঁচটি পুরোপুরি প্রকাশ পায় তবে আমরা বলতে পারি সে হতাশায় ভুগছে। যেমনঃ
.
• দিনের অধিকাংশ সময় মন খারাপ থাকা।

• কোনো কিছুতেই পূর্বের ন্যায় আনন্দ না পাওয়া, পূর্বে যা ভালো লাগত তা আর ভালো না লাগা।

• আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া।

• খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, যেমন কম খাওয়া অথবা বেশি খাওয়া। ওজন কমে যাওয়া অথবা বেড়ে যাওয়া, রাতে দেরিতে ঘুম আসা বা ঘুম ভেঙে গেলে আর ঘুম না আসা।

• আত্মহত্যার চিন্তা-চেষ্টা করা, ইত্যাদি।
.

 হতাশা শুরু হয় কেন?
.
– বিষণ্ণতা সাধারণত কোনো কারণবশত শুরু হতে পারে আবার কোনো কারণ ছাড়াও শুরু হতে পারে, যেমন সাধারণ মন খারাপের যেসকল কারণ রয়েছে যেমন নিকট আত্মীয় মারা যাওয়া, ব্যবসায় লস হওয়া, রিলেশনশিপ ব্রেকআপ ইত্যাদি কারণে হতাশা হতে পারে আবার কোনো কারণ ছাড়াও হতে পারে যেটিকে Androgynous Depression বলা হয়।
.
 হতাশা থেকে বের হওয়ার উপায়?
.
– হতাশাকে সাধারণত Mild, Moderate, Severe এই তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়। Mild এবং Moderate এর বেলায় সাধারণত কোনো ঔষধ লাগেনা, যদি তাকে সাধারণ কাউন্সেলিং করা হয় এবং বন্ধুবান্ধব ও পরিবার সাপোর্ট দেয় তবে সে হতাশা থেকে বের হয় আসতে পারে। আর Severe এর বেলায় সাধারণত কাউন্সেলিং এ কাজ হয়না, তখন ঔষধের সাহায্য নেয়া হয়ে থাকে। এককথায় হতাশার তীব্রতা অনুযায়ী তার চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে। যদি সঠিক চিকিৎসা দেয়া হয় তবে ইনশা আল্লাহ এর থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব।
.
 প্রাথমিক স্তরের ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিজের পক্ষে ব্যাপারটি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব?
.
– প্রথমত আমাদের মাথায় এই কথাটি খুব ভালোভাবে গেঁথে নিতে হবে যে, “Life is not a bed of roses”, অর্থাৎ জীবন ফুলশয্যা নয়। জীবনটা কারো কাছেই সহজ নয়। আমরা সাধারণত যাদের বাইরে থেকে দেখি অথবা সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখে ভাবি যে, তার লাইফটা কত সুন্দর, কিন্তু‌ আমাদের মনে রাখতে হবে যে আমরা যেগুলো দেখি সেগুলো প্রায় সবই কৃত্রিম। সবাই সাধারণত নিজের সবচেয়ে ভালোটা সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করে এবং খারাপটাকে ঢেকে রাখে। তাই সেগুলো দেখে এমন ভাবা যাবে না যে সে অনেক ভালো অবস্থানে আছে আর আমার অবস্থান অনেক খারাপ। তাছাড়াও বন্ধু নির্বাচনে সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। যদি সবাইকে বন্ধু ভাবা যায় এবং সবাইকে যদি মনের কষ্টের কথা গুলো শেয়ার করা যায় তবে এমন হতে পারে যে, কিছু বন্ধু অনুপ্রেরণা দেয়ার পরিবর্তে উল্টো হতাশা বাড়িয়ে দিতে পারে। এমনও হতে পারে যে এর প্রেক্ষিতে হতাশায় আক্রান্ত ব্যক্তি আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করতে পারে যা সে আগে করার চিন্তা করেনি। এছাড়া বাবা-মায়ের সাথে যদি বোঝাপড়া ভালো হয় তবে তাদের সাথে বিষয়টি শেয়ার করা যেতে পারে অথবা বিশ্বস্ত কোনো বন্ধুর সাথে শেয়ার করে সাহায্য চাইতে হবে। আর যদি এমন অবস্থার সুযোগ না থাকে তবে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে অবশ্যই পরামর্শ করতে হবে।
.
 অনেক হতাশ মানুষই পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না, এক্ষেত্রে করণীয়?
.
– যদি এমন হয় যে, কেউ পূর্বে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারত কিন্তু এখন পারছে না তবে তার কারণটা খুঁজে বের করতে হবে। আরেকটি ব্যাপার হলো পড়াশোনার যে লক্ষ্য তা স্থির রাখতে হবে। সে পড়াশোনা করছে কেন বা পড়াশোনা করে সে আসলে কী করতে চায় বা কী হতে চায় এইটা যদি ঠিকমত মাথায় রাখে তবে ইনশা আল্লাহ বিষয়টি অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। তাছাড়া, সোশ্যাল মিডিয়া যেমন ফেসবুকে যদি অধিকাংশ সময় কাটানো যায় অথবা ওই দিকে মনোনিবেশ করলে যেমন পোস্টে কতগুলো রিয়্যাক্টস পড়ল, কতগুলো কমেন্ট পড়ল এসব ভাবনা মাথায় থাকলে কোনো কিছুতেই মনোযোগ দেয়া সম্ভব হবে না। মোটকথা উপরোক্ত বিষয়গুলো মাথায় রেখে মনোযোগ সহকারে পড়তে হবে নিয়মিত। হোক না সেটা অল্প সময় এর জন্য হলেও।
.
 অনেকেই আছেন যারা ভবিষ্যৎ নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকে, হয়ত ভবিষ্যতে ভালো কিছু পাব না কিংবা ভবিষ্যতে অনেক খারাপ কিছু হবে এসব চিন্তায় ভেতরে অস্থিরতা কাজ করে। এটি থেকে বের হবার উপায় কী?
.
– এই ধরনের সমস্যাকে বলা হয় OCD বা Obsessive Compulsive Disorder। এই ক্ষেত্রে এমনটা হয় যে, একটি চিন্তা মাথায় আসলে সারাক্ষণ সেটা নিয়েই ভাবতে থাকে, এক সময় সেটি বৃদ্ধি পেতে পেতে অনেক জটিল আকার ধারণ করে। আরেকটি কারণ হতে পারে এ্যানজাইটি বা এ্যানজাইটিজ ডিসঅর্ডার। এটার ক্ষেত্রে সে সব কিছু নিয়ে চিন্তা করে যে, ‘এটা কী হবে?, ওইটা কী হবে?’ সবকিছুতেই একটা উদ্বেগ কাজ করে, সাথে দুশ্চিন্তা তো রয়েছেই। তো এই ধরণের সমস্যার ক্ষেত্রে আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, আল্লাহ তা’আলা আমাদের তাক্বদীরে যা দেখেছেন তাই হবে। ভবিষ্যতের চিন্তা বাদ দিয়ে বরং বর্তমানটাকে কিভাবে সুন্দর করা যায় সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকার জন্য Breathing Exercise অনেক ভালো একটা সমাধান।
.
 Breathing Exercise! এই জিনিসটা আবার কী?
.
– এটি এক ধরনের শারীরিক ব্যায়াম বলতে পারো। এটি মূলত ধীরে ধীরে নাক দিয়ে শ্বাস ভেতরে নিয়ে সেকেন্ড পাঁচেক এর মতো ধরে রেখে মুখ দিয়ে আস্তে আস্তে নিঃশ্বাস ছাড়তে হয়। নিরিবিলি কোনো জায়গায় করলে বেশি ফলপ্রদ হয়। চেয়ারে বসে কিংবা বিছানায় শুয়ে যেকোনো উপায়েই করা যেতে পারে। যদি এটি নিয়মিত করা হয় তবে দেখা যাবে যে, তার অনেকগুলো উপসর্গ আপনা-আপনিই চলে গেছে।
.
আমি একটা কাজ আর করব না ঠিক করেছি (বারবার গুনাহ করে ফেলি), কিন্তু বারবার কাজটি করেই চলেছি, এর থেকে বের হওয়ার উপায় কী?
.
– কেউ একটি কাজ বারবার করছে তার মানে সে কাজটিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে এবং কাজটি করতে তার কাছে ভালো লাগছে। এখন কাজটি ছাড়তে হলে সেটি ছাড়ার প্রবল পরিমাণে ইচ্ছাশক্তি থাকতে হবে এবং সেই ইচ্ছাশক্তিকে সেই কাজে প্রয়োগ করতে হবে। আমরা অনেকেই ভাবি যে, আস্তে আস্তে কাজটি ছেড়ে দেব কিন্তু এমন করা যাবে না। কাজটি পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হবে। অন্যথায় দেখা যাবে আস্তে আস্তে ছেড়ে দেব বলে পুনরায় সে তাতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই এমন চিন্তা বাদ দিয়ে কাজটি পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হবে। এক্ষেত্রে, “মুক্ত বাতাসের খোঁজে” বইটি কিন্তু বেশ ভালো রকমের সাহায্য করবে। আর সর্বদা আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দু’আ করতে হবে।
.
 আমরা যদি আমাদের আশেপাশে এমন কাউকে দেখি যে, সে আত্মহত্যা করতে চাচ্ছে বা আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছে তবে আমরা তার জন্য কি কি করতে পারি?
.
– আমরা তাদের এইটা বুঝাতে পারি যে, সময় হয়তো এখন খারাপ কিন্তু আল্লাহ তা’আলা চাইলে নিশ্চয়ই আবার ভালো সময় আসবে। যাদের সমস্যাটা এমন যে, আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় আসে কিন্তু ততটা মারাত্মক না, তাদের ক্ষেত্রে সাধারণ কাউন্সেলিং করা যেতে পারে অথবা বিষণ্ণতা দূর করার যে সব উপায় সমূহ আছে, যেমন Breathing Exercise করা যেতে পারে। তাছাড়া, সম্প্রতি কিছু ঘটনায় দেখা গেছে, আত্মহত্যা করার আগে ব্যক্তিটি কিন্তু নিয়মিত ফেসবুকে পোস্ট দেয়, তাই এই ধরণের কোনো পোস্ট দেখার সাথে সাথে তার পরিবারের সাথে কোনো বিলম্ব ছাড়াই যোগাযোগ করবে। আর যখন দেখা যায় যে, তোমার পরিচিত কোনো ব্যক্তির সাথে Severe হতাশা এর লক্ষণগুলো মিলে যায় এবং সে কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছে এমন ক্ষেত্রে তাকে আর তার আগের অবস্থানে রাখা যাবে না, এক্ষেত্রে তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। তারপর চিকিৎসার মাধ্যমে তার অবস্থার উন্নতি হলে তখন তাকে বাসায় রেখে চিকিৎসা দেয়া যেতে পারে। আর যদি দেখা যায় যে, আমার নিজের মধ্যেই আত্মহত্যা চিন্তা আসছে তবে পরিবারের কাউকে হোক বা বিশ্বস্ত কোনো বন্ধুকে জানিয়ে হোক কোনো একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। সবশেষে এটাই বলব যে, আমাদের সব সময় এই কথাটি মাথায় রাখা উচিত, “আল্লাহ তা’আলা আমাকে যে জীবন দান করেছেন তার মালিক আমি না, তাই আমি সেটাকে নষ্ট করতে পারিনা।

শেয়ার করুনঃ