আলেয়ার আলো   

আলেয়ার আলো   

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

পাশের বাসার নাফিস ভাই। এক ক্লাস উপরে পড়তেন। একজন পরিপূর্ণ অলরাউন্ডার, চ্যাম্পিয়ন। যেমন পড়াশোনায় তেমনি বিতর্ক,আবৃত্তি, গল্প লিখা, বাবা মার সাথে সুন্দর ব্যবহার।  আমাদের পরিবারের কাছে তিনি সেলিব্রেটি টাইপের কিছু ছিলেন। দূর আকাশের তারা। (আমার কাছে অবশ্য ভিলেন।) উঠতে বসতে বাবা মা তাকে অনুসরণ করতে বলেন- নাফিসের মত হ, সে এতক্ষণ পড়াশোনা করে, সে দুপুরে ঘুমায় তোর মতো টো টো করে রোদে ঘুরে বেড়ায় না। মাথার চুল এতো বড় কেন তোর, শার্টের উপরের বোতাম দুইটা খোলা কেন, নাফিসের চুল দেখিস কতো সুন্দর করে কাটা। মা গিয়ে নাফিস ভাইয়ার কাছ থেকে নোট নিয়ে আসতেন,সাজেশন নিয়ে আসতেন,  পারলে নাফিস ভাইয়ার পা ধোঁয়া পানি নিয়ে এসে আমাকে খাওয়ান…

মানুষের ফিতরাহ এমন সে সফলদের অনুসরণ করতে চায়। সফলরা যে পথে চলে সফলতা পেয়েছে সে পথ তাদের টানে দুর্নিবার আকর্ষণে।

পাশ্চাত্যের বস্তুগত উন্নতি দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়া বিশ্ব অন্ধভাবে অনুকরণ, অনুসরণ করেছে পাশ্চাত্যকে। আগপিছ কিছু না ভেবেই ডিরেক্ট কপিপেস্ট করেছে পাশ্চাত্যের জীবনবোধ, দর্শন, রাষ্ট্র সমাজ পরিচালনা পদ্ধতি। পাশ্চাত্য যাই বলেছে যেটা করতে বলেছে আসমানী ওহীর মতো  মাথা পেতে নিয়েছে বাকী বিশ্ব। যারা মেনে নিতে চায়নি, তাদেরকে জোর করে মানতে বাধ্য করা হয়েছে। কখনো পারমানবিক বোমা, কখনো ড্রোন হামলা, কখনো কুটিল ষড়জন্ত্রের মাধ্যমে পাশ্চাত্য তাদের মতবাদ চাপিয়ে দিয়েছে।

নারীদের প্রতি সহিংসতা বিশেষ করে যৌন সহিংসতা, ধর্ষণ কীভাবে বন্ধ করা যায়? এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে পাশ্চাত্য বলল- পুরুষের আধিপত্যশীল মনোভাব দূর করতে হবে, নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে, পুরুষের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে, নারী পুরুষের মধ্যে বন্ধুত্বসুলভ মেলামেশার ব্যবস্থা করতে হবে বেশি বেশি, পতিতালয় খুলতে হবে বেশি বেশি।

সফলদের অন্ধভাবে অনুসরণ করার সহজাত প্রবৃত্তি থেকে বাকী বিশ্ব মেনে নিয়েছে এগুলো। আমল করেছে পাশ্চাত্যের ফর্মুলায়।

.পাশ্চাত্য নারীমুক্তির যে তরীকা বাতলে দিয়েছিল সেটা কোনো দেশেই কোনো স্থানেই নারীদের মুক্তি দিতে পারেনি। বরং যে দেশ যতোবেশি তাদের তরীকায় আমল করেছে সে দেশে নারীরা ততোবেশি নির্যাতিত হয়েছে, ধর্ষণের শিকার হয়েছে।  প্রতি ৯৮ সেকেন্ডে একজন আমেরিকানকে যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়, [http://tinyurl.com/k8ehojc ], প্রতি ৬ জন নারীর মধ্যে ১ জন এবং প্রতি ৩৩ জন পুরুষের মধ্যে একজন তাদের লাইফটাইমে একবার হলেও ধর্ষণের শিকার হয়।[http://tinyurl.com/nm3gp5o ]

.মহান সভ্যতার অনুগামী আরেকদেশ অস্ট্রেলিয়াতে প্রতি ছয় জন মহিলার মধ্যে একজন যৌন নিপীড়নের শিকার হন তাদের সংগী ব্যতীত অন্য ব্যক্তিদের হাতে।সংগীদের দ্বারা যৌন নিপীড়ন বিবেচনায় আনলে যৌন নিপীড়নের হার নেমে আসে প্রতি পাঁচ জনে একজন।
অস্ট্রেলিয়াতে নারীদের যৌন নিপীড়নের হার পৃথিবীর অন্যান্য দেশের এভারেজ যৌন নিপীড়নের হারের দুইগুনেরও বেশী।
http://tinyurl.com/ya7jlwmx, http://tinyurl.com/yafduj5j, http://tinyurl.com/y7kstly5

ইংল্যান্ড এবং ওয়ালেসের প্রতি ১৪ জন প্রাপ্তবয়স্কদের একজন বাল্যকালে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন । গ্রেট ব্রিটেন শিশু নিপীড়কদের স্বর্গরাজ্য।
https://goo.gl/9cckzW, https://goo.gl/ZFfa1E
.
আমেরিকাতে প্রতি ৪ হন নারীর একজন এবং প্রতি ৬ জন পুরুষের একজন ১৮ বছরে পা দেবার পূর্বে একবার হলেও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। তারমানে এখন আমেরিকাতে ৪২ মিলিয়নের বেশী প্রাপ্তবয়স্ক আছেন যারা শৈশবে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন।
https://goo.gl/wmko27https://goo.gl/9FMiuh
.
বিশ্বের যে দেশগুলোতে শিশুরা সর্বাধিক যৌন নিপীড়নের শিকার হয় সেই দেশগুলোর সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও রয়েছে আমেরিকা এবং ইংল্যান্ড এর নাম।
https://goo.gl/b8MgJd
আমেরিকাতে প্রতি পাঁচজন নারীশিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতনের শিকার হন
[https://goo.gl/JKAccc ]
.
অস্ট্রেলিয়ান ইউনিভার্সিটিগুলোতেও প্রতি পাঁচ জনে একজন যৌন নিপীড়নের শিকার হন।প্রশাসন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ।
http://tinyurl.com/ybgly3z9 http://tinyurl.com/yccfsdzd

ব্রিটেনে কর্মক্ষেত্রে অর্ধেক নারীই যৌন হয়রানির শিকার হন। [http://www.bbc.com/bengali/news-41746980 ]
.
শুধু ব্রিটেন নয়,জার্মানি আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া,কানাডা,চীন,জাপান,ভারত,হংকং কোন দেশের কর্মক্ষেত্রে নারীরা নিরাপদ?
পড়ুনঃ
https://goo.gl/CkM5LO  https://goo.gl/LknhGH  https://goo.gl/yDWvur
দেখুনঃ
https://www.youtube.com/watch?v=KvHU5hZSGCA&feature=youtu.be

প্যারিসের পাব্লিক ট্রান্সপোর্টে শতকরা ১০০ জন নারীই যৌন নির্যাতনের শিকার হন।
https://goo.gl/jx1oB4  https://goo.gl/rmozJW  https://goo.gl/fxyhfH
.
ইংল্যান্ড,আমেরিকা, কানাডা,ইন্ডিয়াতেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায়না
পড়ুন,
আমেরিকার রাস্তাঘাটে যৌন হয়রানিঃ
https://goo.gl/cMXq4k  https://goo.gl/zVMKkV
.
ইংল্যান্ডের রাস্তাঘাটে যৌন হয়রানিঃ
https://goo.gl/JWwb52  https://goo.gl/njUwNg
.
কানাডার রাস্তাঘাটে যৌন হয়রানিঃ
https://goo.gl/HphYfF https://goo.gl/b5EvTC
.
ইন্ডিয়ার রাস্তাঘাটে যৌন হয়রানিঃ
https://goo.gl/JnBhVj  https://goo.gl/nRCQ5J  https://goo.gl/pCWaLZ

পাশ্চাত্যের বাতলে দেওয়া সিস্টেম গ্রীসের মেয়েদের বাধ্য করেছে সামান্য একটা স্যান্ডউইচের বিনিময়ে শরীর বিক্রী করতে।
https://goo.gl/24a1hd  https://goo.gl/tiuf5S

পাশ্চাত্যের নারীমুক্তি,নারীস্বাধীনতা আর নারীর ক্ষমতায়নের  মুখোসের আড়ালের চেহারা উন্মোচন করে ছেড়েছে #MeToo মুভমেন্ট। হলিউড বলিউডের প্রভাবশালী অভিনেত্রী, গায়িকা, সংসদসদস্য,  উর্ধতন কর্মকর্তা…কেউই রক্ষা পায়নি যৌন নিপীড়নের হাত থেকে। অথচ পাশ্চাত্য বলেছিল এসব পেশা নারীর ক্ষমতায়নের উৎকৃষ্ট নমুনা। নারীরা এসব পেশার মাধ্যমে নিজেদের ইম্পাওরড (Empowered) করবে।

পাশ্চাত্য শুধু তত্ত্ব কপচিয়ে গিয়েছে কিন্তু সেই তত্ত্ব যে সফল হবে, নারীদের মুক্ত করবে সেই প্রমাণ রাখতে তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এই যে বছরের পর বছর জুড়ে তাদের তরীকায় বিশ্ব আমল করে যাচ্ছে নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন কমেছে?  আমরা কেন তাহলে পাশ্চাত্যের জীবন দর্শন নিয়ে প্রশ্ন তুলবোনা? কেন তাদের এই মাতব্বরি মেনে নিব? কোন দুঃখে আমরা এরকম ফেল্টুস এক সভ্যতার অনুসরণ করব?

কাফিরদের আকাশ ছোঁয়া দালান কোঠা, স্বর্ণ রৌপ্য, সুন্দরী নারী, সুসজ্জিত,চোখ ধাঁধানো শহর দেখে যেন মুসলিমরা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে না পড়ে, যেন তাদের অনুসরণ করা না শুরু করে সেজন্য আল্লাহ্‌ (সুবঃ) সতর্ক করে বলছেন-

“নগরীতে কাফেরদের চাল-চলন তোমাদেরকে যেন ধোঁকা না দেয়। এটা (দুনিয়ার জীবনের প্রাচুর্য) হলো সামান্য ফায়দা, এরপর তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম। আর থাকার জায়গা হিসেবে সেটা অত্যন্ত নিকৃষ্ট”।
সুরা আলে-ইমরান, আয়াত ১৯৬-১৯৭

আল্লাহ্‌ (সুবঃ) কেন এভাবে সতর্ক করে দিচ্ছেন ইসলামের শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ মানুষগুলোকে? যেন কাফিরদের সুরম্য অট্টালিকা, ঝকঝকে রাস্তাঘাট, আলোয় ভেসে যাওয়া মায়াবী রাত, সাদা চামড়া, টেকনোলজি, শক্তিশালী আর্মি দেখে মুসলিমদের মনে হীনমন্যতার জন্ম না হয়। মুসলিমদের মনে যেন ভুলেও এ চিন্তার জন্ম না হয় আমরা ইসলাম অনুসরণ করছি দেখেই আজ আমাদের এই করুণ অবস্থা। ওদের মতো হতে পারলেই ওদের মত ও পথ অনুসরণ করলেই আমরা ওদের মতো সফল হয়ে যাব। আমাদেরও ওদের মতো সুউচ্চ প্রাসাদ হবে, বড় বড় ব্রিজ হবে, ফ্লাইওভার হবে, আমাদের বাড়ি হবে, গাড়ি হবে, আমরা সাদা চামড়ার মতো পটাশ পটাশ করে ইংরেজিতে কথা বলব, বার্গার পিতজা খাব, সুপার শপে ক্রেন ঠেলতে ঠেলতে আলু পটল কিনব। উফ! কী কুল কী অসাম এক লাইফ!

সফলদের অনুসরণ করার সেই চিরায়ত প্রবৃত্তি যেন আমাদের ফিতনাহয় না ফেলে দেয়।

বাইরে থেকে দেখে যতোটাই উন্নত,মহান,সুখী,সমৃদ্ধ মনে হোকনা কেন যে সভ্যতা কুফরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সেটা কখনো সত্যিকার অর্থে সফল হতে পারেনা।  চাকচিক্য আর প্রাচুর্যের চোখ ধাঁধানি সভ্যতার পচনকে আড়াল করতে পারেনা। পারেনা মানুষকে শান্তি দিতে।

আমরা এখানে অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে শুধু যৌন নির্যাতনের ব্যাপারগুলো তুলে ধরেছি। পাশ্চাত্যের সামাজিক,পারিবারিক জীবনের হতাশা বিচ্ছিন্নতা, তরুণ তরুণীদের আত্মহত্যার হার, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ছিনতাই,লুটপাট,ডাকাতি,মানব পাচার, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করলে রাত কাবার হয়ে যাবে তবু আলোচনা শেষ হবেনা।

অনুরোধ থাকবে এই লিখাগুলো পড়ার- স্বর্গের দিন স্বর্গের রাত

https://tinyurl.com/ybx2meqm  https://tinyurl.com/y9wvg9dj  https://tinyurl.com/y7gvpe4w

বাংলাদেশ কি এখন তার নিকট ইতিহাসের মধ্যে সবচাইতে বেশি সেকুল্যার না? সবচাইতে বেশি পাশ্চাত্যের অনুসরণ করছেনা ? চেতনা, ফ্রি মিক্সিং, ফ্রি সেক্স, পতিতা গমনের সুবিধা,লিটনের ফ্ল্যাট নারীর ক্ষমতায়ন, নারী শিক্ষা, পুরুষদের মানসিকতা পরিবর্তনের চেষ্টা, বস্তুগত উন্নয়ন, ফ্লাইওভার,রাস্তাঘাট  স্মরণকালের ইতিহাসের মধ্যে সবচাইতে বেশি হচ্ছে না । কিন্তু তারপরেও কেন এতো ধর্ষণ হচ্ছে। দুই আড়াই বছরের শিশুও ধর্ষণ হচ্ছে? ধর্ষণ হচ্ছে প্রৌঢ়া  বা বৃদ্ধারাও

তাহলে সমাধান কী ? ধর্ষণ কীভাবে কমবে? কোন  তরীকায় আমল করতে হবে?

আরবের সেই সময়টাকে বলা হতো আইয়ামে জাহেলিয়্যা- অন্ধকারের যুগ। নারীরা ছিল কেবলই ভোগের পাত্র, কন্যা শিশুদের জীবন্ত পুঁতে ফেলা হতো। নারীর মান সম্মান বলে কিছু ছিলনা। একটা কুকুরের যে অধিকার ছিল, নারীর সে অধিকারটুকুও ছিলনা বরবর,মদখোর রক্তপিপাসু, যুদ্ধবাজ আরবদের কাছে।

কয়েকবছরের ব্যবধানে এই আরব এমন পালটে গেল যে নারীরা একাকী দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সফর করতে আসত, কিন্তু কেউ একবার চোখ তুলে তাকাতেও সাহস করতোনা। ধর্ষণ করা, যৌন নিপীড়ন করাতো দূরে থাক,চোখ তুলেও কেউ তাকাতোনা।

কিসের পরশে রাতারাতি বদলে গিয়েছিল বর্বর নারীলোভী আরবেরা? ইতিহাসকে প্রশ্ন করুন। ইতিহাস আপনাকে জবাব দিবে-  আরবদের সেই পরশ পাথর ছিল বিশুদ্ধ তাওহীদ, আল ওয়ালা ওয়াল বারাহ, খিলাফাহ, মিল্লাতে ইবরাহীম। কুরআনি আইন।

এগুলো অতীতের রূপকথা  নয়। একদম বাস্তব। পাশ্চাত্যের মতো নারীর নিরাপত্তার জন্য কেবল এই  থিওরি ঐ থিওরি কপচানো নয়, বরং বাস্তবে প্রয়োগ করে দেখানো হয়েছিল যে আসলেই শরীয়া নারীকে নিরাপত্তার চাদরে আবৃত করে রাখে। কোনো লম্পট চোখ তুলে তাকানোর সাহস পর্যন্ত দেখাতে পারেনা।

আদি ইবনে হাতিম তাঈ ছিলেন আরবের তাঈ অঞ্চলের বাদশাহ।  বাধ্য হয়ে আসতে হল মদীনায় এলেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে । মুসলিমদের  ফকিরী হালত দেখে ইসলাম গ্রহণ করতে কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর ঘরের একমাত্র খেজুরের গদিতে বসালেন আদি ইবনে হাতিম তাঈকে। তারপর বললেন এমন কিছু কথা যা আমাদের সময়ের জন্য খুবই খুবই প্রাসঙ্গিক।

‘হে আদিই! নিশ্চয় তুমি মুসলিমজাতির অভাব ও দারিদ্র দেখে এই দ্বীন গ্রহণ করতে ভয় পাচ্ছো। যদি সেটাই হয়ে থাকে, তাহলে তুমি শুনে নাও, আমি  আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, এমন একটি সময় খুব কাছে এসে গেছে যখন তাদের মাঝে ধন- ঐশ্বর্যের এত প্রাচুর্য হবে যে যাকাত ও সাদাকাহ নেওয়ার কোনো মানুষ থাকবেনা।

হে আদিই! মনে হচ্ছে তুমি মুসলিমজাতির সংখ্যা স্বল্পতা এবং বিরোধী ও শত্রুদের অগণিত সংখ্যা দেখে এই দ্বীন ইসলাম গ্রহণে দ্বিধাবোধ করছ। যদি তাই হয় তাহলে মনে রেখো, আমি আল্লাহ্‌র নামে শপথ করে বলছি, খুব শীঘ্রই তুমি শুনতে পাবে সুদূর কাদেসিয়া থেকে উটের পিঠে চড়ে একাকিনী মহিলা আল্লাহ্‌র ঘর যিয়ারতে আসবে। একমাত্র আল্লাহ্‌র ভয় ছাড়া  তার মনে আর কোনো ভীতি থাকবেনা।

সম্ভবত তোমার ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি প্রতিবন্ধকতা এটাও যে তুমি রাষ্ট্র ক্ষমতা ও বাদশাহী দেখতে পাচ্ছ অমুসলিমদের হাতে। আল্লাহর কসম! খুব শিগগির তুমি শুনবে এবং দেখবে যে এ অবস্থার পরিবর্তন  হয়েছে । দেখবে ইরাকের বাবেল নগরীর সাদা মহলগুলো (রাজপ্রসাদা) মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে এসে গেছে। পারস্যসম্রাট কিসরা ইবনে হুরমুজানের ধনভান্ডার তাদেরই কবজায় এসে পড়েছে’।‘

আদি ইবনে হাতিম তাঈ বলেন, ‘আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম অবাক বিস্ময়ে জানতে চাইলাম, কিসরা ইবনে হুরমুজানের সব ধন-ভান্ডার’?

তিনি জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, কিসরা ইবনে হুরমুজানের  সব ধন-ভান্ডার’।

আদিই বলেন, ‘তখন আমি কালিমা-ই শাহাদাত পড়ে ইসলাম গ্রহণ করে নিলাম’।

আদিই ইবনে হাতিম দীর্ঘজীবী হয়েছিলেন। তিনি বলতেন, ‘ প্রিয় নবীর দুইটি ভবিশ্যতবাণী তো দেখেই ফেলেছি। তৃতীয়টি দেখা বাদ রয়েছে। আল্লাহর কসম করে বলছি  সেটাও ঘটবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি নিজের চোখে দেখেছি, সুদূর কাদেসিয়া থেকে উটে চড়ে একাকিনী মহিলা নির্ভয়ে বাইতুল্লাহর উদ্দেশ্যে আসে…

আমি নিজে সেই সেনাদলের অগ্রভাগে থেকে অভিযান শরিক হয়েছিলাম,যারা কিসরার ধনভান্ডার কবজা করেছিল। আমি  আল্লাহ্‌র কসম করে বলছি, তৃতীয় ভবিশ্যত বাণীটিও  ঘটবেই’।

.আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় তাঁর প্রিয় নবীর ঘোষনার বাস্তবায়ন ঘটেছিল, তৃতীয় ঘোষণার বাস্তব  রূপায়ন দেখা গেল পঞ্চম খলীফায়ে রাশেদ উমর ইবনে আবদুল আযীযের শাসনামলে। তাঁর আমলে ইসলামী সাম্রাজ্যে ধন-সম্পদের এত প্রাচুর্য  দেখা দিল যে, তিনি সরকারি লোক মারফত পথে পথে ঘোষণা দিলেন , ‘ যাকার নেবার মতো কে আছো’?

কিন্তু একজন মানুষও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ( সাহাবায়ে কেরামের ঈমানদীপ্ত জীবন প্রথম খনড, রাহনুমা পাবলিকেশন,  পৃষ্ঠা ২২১-২২৩)

মুসলমান কেন পাশ্চাত্যের আলেয়ার পিছনে ঘুরছিস?  দুনিয়ার সুখ সমৃদ্ধি, শান্তি, নিরাপত্তা, ক্ষমতা অর্জনের ম্যানুয়াল তোর চোখের সামনেই। অবহেলায় অযত্নে পড়ে আছে টেবিলের কোণায়। ধুলো মুছে একবার খুলে দেখ। শক্ত করে আঁকড়ে ধর মিল্লাতে ইবরাহীমকে।

#LostModesty #মুক্ত_বাতাসের_খোঁজে #ধর্ষণ #BanPorn

তুমি এক দূরতর দ্বীপ (চতুর্থ কিস্তি)

তুমি এক দূরতর দ্বীপ (চতুর্থ কিস্তি)

তো যা বলছিলাম তুমি যে বিয়ে করার উপযুক্ত হয়েছো, ম্যাচিউরড হয়েছো তার অন্যতম একটি নিদর্শন হলো, তুমি ফেইসবুকে বিয়ে নিয়ে অনর্থক লাফালাফি  কম করবে। যারা এরকম করে তাদের নিয়ে মানুষজন হাসাহাসি করে, ইমম্যাচিউরড ভাবে। আর এই ইমম্যাচিউরড ছেলেদের হাতে কোন বাপ তাঁর মেয়েকে, কোন ভাই তার বোনকে তুলে দিবে, বলো? এভাবে ঘন্টায় ঘন্টায় ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিলে বিয়ে হয়না।

তোমার নিজের এই লড়াইয়ের কথা মনের মধ্যে গেঁথে নাও ভালোভাবে। ভুলে যেওনা কীভাবে সমাজ তোমাকে নির্বাসন দিয়ে রেখেছে, কতোটা কষ্ট,কতোটা দুঃখ বুকে নিয়ে তুমি দিন পার করছো। ভালোকরে গেঁথে নাও। কক্ষনো ভুলে যেওনা। তোমার অনাগত সন্তানদের এই কষ্টে পড়তে দিওনা। তাদের যৌবনের দুঃসময়ে তুমি বন্ধু হয়ে পাশে থেকো। অধিকাংশ বাবা মা, বাবা-মা হবার পরে নিজেদের  কৈশোর, যৌবনের সংগ্রামরত দিনগুলোর কথা ভুলে যান, একান্ত আপন হয়েও মনের অজান্তেই জল্লাদের নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন। তুমি এই ভুল কোরোনা। সযত্নে মনে গেঁথো রাখো। যদি কোনো ডায়েরীতে লিখে রাখতে পারো তাহলে খুব ভালো হয়।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণত বাবা আর আমাদের মাঝে এক অদ্ভূত দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। মিটার কিলোমিটারের হিসেবে খুব বেশি দূরত্ব নেই কিন্তু তারপরেও মনে হয় বাবা ভূমধ্যসাগরের একপাশে আর আমরা অন্যপাশে। জীবনবাবু এই দূরত্বের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন… ‘এতো কাছে তবু কতো দূর…’।

একসময় যে বাবার সঙ্গে ক্রিকেট,রাজনীতি নিয়ে অকালপক্ক্বের মতো আলোচনা চলত, আমার ছোট্ট জীবনের ছোটো ছোটো সুখ,দুঃখ, টুকরো টুকরো অভিমান,আবদার … আমার ভেতর আমার বাহির সবটাই ছিল তাঁর কাছে কাঁচের মতো স্বচ্ছ সেই বাবার কাছে আমি এখন প্রায় অপরিচিত এক মানুষ। স্বল্প পরিচিত প্রতিবেশির বা অন্য সেকশনের ক্লাসমেটদের মতো যাদের সঙ্গে দেখা হলে হাই হ্যালো করে কুশলাদি জানা যায়, কিন্তু বেশিদূর কথা গড়ায় না।চোখের সামনেই  আমি কেমন বদলে গেলাম, কেমন অনাতিক্রম্য ব্যবধান  তৈরি হয়ে গেল… মা, বোন,ছোটোভাই বা অন্য কারো  সাহায্য ছাড়া যে দূরত্ব  অতিক্রম করে বাবার কাছে পৌঁছানো সম্ভব না।

এ বড় শক্ত ম্যাজিক। বাঙালী বাবাদের পুত্রস্নেহ, ভালোবাসা,  তাঁদের গাম্ভীর্য আর ব্যক্তিত্বের কাছে প্রতিনিয়ত হেরে যায়।  খুব কম সৌভাগ্যবান  বাবারাই এই দেয়াল ভাঙতে পারেন। ঘাড়ে করে স্কুলে দিয়ে আসা, গলা জড়িয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া,ভাত তুলে খাওয়ানো বাবারাও ছেলের ব্যর্থতা আর দুঃখের প্রহরে কিছু দ্বিধা,কিছু সঙ্কোচ কিছু গাম্ভীর্য কাটিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে দুঃখ ভোলাতে পারেন না। ঘাড়ে হাত রেখে  সাহস যোগাতে পারেন না।

আমরা ছেলেরাও কি ছেলে হিসেবে হেরে যাইনি?  দুষ্টু ছেলেগুলো যখন আমার দুইটাকার সন্দেশ কেড়ে নিয়ে খেয়ে নিত, ওপরের ক্লাসের শুভ ভাইয়া যখন প্রায়ই আমাকে সারা দুপুর বল করিয়ে নিত কিন্ত এক ওভারও ব্যাট করতে দিতনা তখন আমি কি দৌড়ে গিয়ে বাবার কাছে নালিশ জানাতাম না? আজ যখন ‘জীবন’ আমাদের সাথে শুভ ভাইয়ার মতো বেঈমানি করে যাচ্ছে  আমরা কেন বাবার কাছে নালিশ করতে পারিনা? কেন বাবার কাছে গিয়ে বলতে পারিনা বাবা আমি আর পারছিনা… ? কী আমাদের টেনে ধরে রাখে? কে সেই কালপ্রিট যে আমাদেরকে আমাদের বাবাদের থেকে এক ধাক্কায় অনেক দূরে সরিয়ে ফেলল?

এক প্রজন্মের সঙ্গে আরেক প্রজন্মের জেনারেশন গ্যাপ থাকবেই, থাকবে কিছুটা আড়াল, আড়ালের ফলশ্রুতিতে ভুল বোঝাবুঝি। নিপাতনে সিদ্ধ ব্যাপার এগুলো। কিন্তু বর্তমানে তিন চার বছরের ব্যবধানেই যেভাবে ব্যবধান গড়ে উঠছে সেখানে বাবাদের জেনারেশনের সঙ্গে (মায়েদের জেনারেশনের সঙ্গেও) ছেলেদের জেনারশনের দূরত্ব যেন অনেক আলোক বর্ষের হিসেব।

তাই হুট করে বাবা বা মাকে চমকে দিয়ে বিয়ের কথা  না বলাই উচিত। এই আপাত অস্বস্তিকর  আলোচনা করার টাইমিংটা খুব গুরুত্বপূর্ণ! তোমাকে সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় সঠিক কথা বলতে হবে। সঠিক সময়,সঠিক জায়গা,সঠিক কথা- এই তিনটি বিষয়ের একটি এদিক সেদিক হলে গিট্টু লেগে যাবার সম্ভাবনা আছে। মনে কর, বাবা অফিস থেকে বিদ্ধস্ত হয়ে রাতে ঘরে ফিরেছেন তখন গিয়ে যদি বল, তাহলে দুই একটা লাঠি তোমার পিঠে ভাংলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবেনা। একটু খেয়াল করতে হবে।  তোমাকে এমন এক সময় এই কথাগুলো বলা শুরু করতে হবে যখন তোমারর বাবা-মায়ের মন ভালো থাকবে,  শারীরিক ক্লান্তি বা অন্য কোনো কারণ তোমার হৃদয়ের আকুতি আর তোমার বাবা-মা’র মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে.

.

হুট করে বাসায় বিয়ের কথা না বলে বরং কিছুটা প্ল্যান করে নাও। মনে মনে কথাগুলো সাজিয়ে নাও। বাবা,মা,  বড়ভাইয়া,বড়আপু যার সঙ্গে নির্ভয়ে, সাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারো, তাঁর কাছে যাও সময় এবং অবস্থা বুঝে। দু’রাকাত নামায পড়ে নিতে পারো। কিছু দান সাদকা করতে পারো। ইস্তেগফার করে নাও। (আস্তাগফিরুল্লাহ পড়া) আলাদা বসিয়ে তাঁকে সব কথা খুলে বলো। তুমি বিয়ে করতে চাও,কেন চাও, কেন বিয়ে করা দরকার ইত্যাদি। মাথা ঠান্ডা রাখবে। তর্কে জড়াবেনা, সবচেয়ে বড় কথা লজ্জা পাবেনা। আসলে বাবা মা’কে যেয়ে নিজের বিয়ের কথা বলা বেশ লজ্জাদায়কই। যে করেই হোক এই লজ্জা কাটিয়ে উঠতে হবে। শুরুর ধাপটাই কঠিন। একবার লজ্জা কাটিয়ে শুধু বিয়ে শব্দটা  বলতে পারলে দেখবে বাকী আলোচনা খুব  সহজেই আগাবে। ঢালু জায়গায়  স্থির বলকে একটু ধাক্কা দিলেই বল গড়িয়ে অনেকদূর চলে যায়।

 

যদি নিজের বিয়ের কথা বাসার কাউকে বলতে না পারো, তাহলে খালা,ফুপি,মামা,দুলাভাই (মেয়েদের জন্য ভাবী), নানা,নানী,দাদা দাদীর হেল্প নিতে পারো।  পারিবারিক বন্ধু, পাড়াতো চাচা,বড়ভাই এদেরও সাহায্য নিতে পারো। যদি কারো কাছেই মুখ ফুটে নিজের বিয়ের কথা বলতে না পারো তাহলে মেসেজ দিয়ে বলতে পারো। অনেকেরই বাবা মার সামনে বিয়ের কথা বলতে গেলে হাত পা কাপাকাপি শুরু হয়ে যায়। গুছিয়ে কথা বলতে পারেনা, তাদের জন্য মেসেজিং (চিঠি টাইপ কিছু হতে পারে) খুব ভালো অপশন। মনের কথা সুন্দরভাবে পৌঁছানো যায় বাবা মার কাছে। আবারো বলি, লজ্জা করবেনা।লজ্জা করে আল্টিমেটলি কোন লাভ নেই। দেরি হয়ে যাবে শুভ কাজে। বিয়ের কথা তো একসময় বলতেই হবে বাসায়, বিয়ে তো  করতেই হবে, নাকি?

 

অধিকাংশ মানুষই একটা ভুল করে বসে। বাবা মা বা অন্য কোনো আপনজনকে বিয়ের কথা   বলতে গিয়েও বলেনা । আজ শেয়ার  করবো, কাল শেয়ার  করবো এভাবেই একদিন কাটিয়ে দেয়, দুই দিন কাটিয়ে দেয়। তারপর এক সপ্তাহ, তারপর কয়েক মাস, তারপর  বছর। তুমি যদি এভাবেই আজ বলবো কাল বলবো করতে থাকো তবে আর বলা হবে না, শুধু সময় বাড়তে থাকবে। তাই একটা সুন্দর দিন ঠিক করো,আল্লাহ্‌র নাম নাও। আর  ওইদিনই বাবা-মায়ের সাথে সব শেয়ার  করো।

 

বাসায় বিয়ের কথা বলার পরেই অবধারিতভাবে তোমার দিকে AK-47 এর  বুলেটের বেগে যে প্রশ্নগুলো ধেয়ে আসবে তার সম্মুখভাগেই থাকবে সেই চিরন্তন প্রশ্ন- বিয়ে করে বউকে খাওয়াবি কী?

দেখ, রিযিকের মালিক আল্লাহ এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।  বিয়ে করলে যে আল্লাহ রিযিকে বারাকাহ দেন, সন্দেহ নেই এই ব্যাপারেও। কিন্তু বাবা মা আত্মীয়স্বজনের বিয়ে করে বউকে খাওয়াবি কি প্রশ্নের উত্তরে যদি  তুমি  কুরআনের আয়াত আর উমার (রাঃ) এর উক্তি শুনিয়ে দাও

 

‘আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী।’ {সূরা আন-নূর, আয়াত : ৩২}

উমর ইবন খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহুমা বলতেন, ওই ব্যক্তির ব্যাপার বিস্ময়কর যে বিয়ের মধ্যে প্রাচুর্য খোঁজে না। কারণ স্বয়ং আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন।’

 

তুমি যদি বল- রিযিকের মালিক আল্লাহ, আল্লাহই ব্যবস্থা করে দিবেন তাহলে তাদের রাজি করাতে বেগ পেতে হবে। আমাদের সমাজের বেশিরভাগ বাবা মার ঈমানই এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।  কংক্রিট একটা প্ল্যান অফ একশন তাদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে তোমাকে।

মেয়েরা সাধারণত তাদের বাবা, বা ভাইয়ের বিশেষ আদরের হয়। মেয়েরা আল্লাহর তরফ থেকে এক বিশেষ মূল্যবান উপহার। দুনিয়ার দুঃখ,কষ্ট থেকে সযত্নে আগলিয়ে রাখেন তারা, যেন এতোটুকু কষ্ট তাদের মেয়ে তাদের বোন না পায়, যেন কোনো ক্লেদ কোনো গ্লানি তাদের স্পর্শ না করে। রাজা হতে না পারুক নিজে, কিন্তু প্রত্যেক বাবার কাছেই তার মেয়ে একজন রাজকন্যা। রাজকন্যাকে তারা কীভাবে কোনো বেকার ছেলের হাতে তুলে দিবেন? চাল নেই চুলো নেই এমন ছেলের হাতে তুলে দিলে তাদের রাজকন্যা কেমন থাকবে এই দুশ্চিন্তায় উদ্বিগ্ন হওয়া তাদের জন্য কী খুব অস্বাভাবিক কিছু? বিশেষ করে আল্লাহ্‌কে ভুলে যাওয়া চরম ভোগবাদী এই সমাজে ? তুমি আমার কথা শুনে অভিমানে গাল ফুলিয়ে বলতে পারো রাসূলুল্লাহর (সাঃ) যুগে কি এমন হয়নি? কপর্দক, কুৎসিত ছেলের সঙ্গে কি অভিজাত সুন্দরী মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়নি?

হয়েছে ভাই। হয়েছে। এতোদূরে যেতে হবেনা, উসমানি খিলাফাতের আমলেও খিলাফাহর পক্ষ থেকেই বেকার যুবকদের বিয়ে দেওয়া হতো। আমাদের দাদা,বাবাদের আমলেও তো বেকার ছেলেদের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে এখনকার অভিভাবকদের মতো কেউ অনাগ্রহ পোষণ করতো না।

কিন্তু ভাই দেখ, সমাজ পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে এখন।  ভোগবাদিতা জেঁকে বসেছে, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল, পুত পবিত্রতা, শালীনতাবোধ, আল্লাহর আইন সবকিছুকেই জাদুঘরে পাঠিয়ে ইসলামকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে, মিডিয়া প্রোপাগ্যান্ডার মাধ্যমে   পাশ্চাত্যের  আবর্জনায় মুসলিমদের মস্তিষ্ক ভরে গিয়েছে (এগুলো নিয়ে পরে একসময় বিস্তারিত আলোচনা হবে ইনশা আল্লাহ)। সমাজ আর আগের মতো নেই।

আগেকার বাবারা নিজ উদ্যোগেই তাদের বেকার যুবকদের  বিয়ে দিয়ে দিতেন, ছেলের বউকে খাওয়ানোর দায়িত্ব ছেলের ওপর এভাবে চাপিয়ে দিতেন না, আগেকার মেয়ের বাবারাও ছেলেদের ওপর এতোটা জুলুম করতেননা, শুধু চাকুরী থাকলেই হবেনা, সরকারি চাকুরী হতে হবে, বিসিএস ক্যাডার,পুলিশ হলে আরো ভালো, ঢাকায় ফ্ল্যাট থাকতে হবে, গাড়ি থাকতে হবে এইসব অদ্ভূত অদ্ভূত শর্তজুড়ে দিয়ে বিয়েকে জটিল করে ফেলতেন না। ছেলের এখন চাকুরী নেই,ছেলে এখন পড়াশোনা করছে তো কী হয়েছে, একদিন নিশ্চয়ই চাকুরী হবে, আর মেয়ে তো আমার না খেয়ে থাকবেনা, মারা যাবেনা, বেয়ায় সাহেব দেখে রাখবেন। ( শ্বশুরবাড়িতে নারী নির্যাতন নিয়ে কিছু কথা আছে। সেগুলো নিয়েও পরে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছে আছে ইনশা আল্লাহ)

তুমি নিজের বাবা মা, এবং মেয়েদের বাবা মার দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তোলা বন্ধ করে বরং দেখ কেন বিয়ে কঠিন হয়ে গেল। কীভাবে বিয়েটাকে সহজ করা যায়। যখন তাওহীদ, ঈমানভিত্তিক সমাজ ছিল, যখন আল ওয়ালা ওয়াল বারাহর ওপর আমল জারি ছিল, যখন খিলাফাহ ছিল, যখন মুসলিমদের একজন নেতা ছিলেন, যখন মুসলিমরা পাশ্চাত্যের মিডিয়া প্রোপাগ্যান্ডার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলোনা বা পাশ্চাত্য ঠিক সুবিধে করে উঠতে পারেনি মুসলিমদের সাথে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে, যখন মানুষের বানানো তন্ত্র মন্ত্রের মাদকে মুসলমান বেহুঁশ হয়ে পড়েনি  তখন বিয়ে সহজ ছিল।

ভাই, তুমি গভীরভাবে ভাবো, চিন্তা করো, এগুলো নিয়ে পড়াশোনা করো। কেন তোমার বুকে আজ বর্ষার হাহাকার? কেন অদেখা তার মুখে শ্রাবণের অন্ধকার? কেন তোমাদের মাঝে এই মানুষের দেয়াল ?

মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ‘বিয়ে করে বউকে খাওয়াবি কি’ এই প্রশ্নের একটা কনক্রিট  উত্তর তোমাকে দিতে হবে। সেই সাথে দেন মোহরানার টাকা কোথায় পাবে, কোত্থুকে বিয়ের খরচ জোগাড় করবে সেগুলোর উত্তরও তোমার জানা লাগবে।

 

একারণেই আমরা বলি, তুমি ফেইসবুকে সারাদিন হাহুতাশ না করে টাকা রোজগারের হালাল কোন উপায় খুজে বের করার চেষ্টা কর। ‘বিয়ে করতে হবে’ এটুকু তোমার উদ্দেশ্য। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কী করা যেতে পারে, গন্তব্য পৌছুতে হলে কী করতে হবে তার প্ল্যান শুরু কর। একটু চোখকান খোলা রাখলেই দেখবে ছোটোখাটো ব্যবসা করার অনেক রাস্তা আছে । আর বেকারের কলিজার টুকরা, অন্ধের যষ্ঠী ‘টিউশনি’ তো আছেই। ব্যবসা করো, টিউশনি করো। বিয়ের জন্য টাকা জমাও।  আমার সাথে দুইজন ছেলে পড়তো। ভার্সিটির চার বছরে তারা টিউশনি করে ব্যাংকে প্রায় লাখ পাঁচেক টাকা জমিয়েছিল।

ভাই দেখ, বাচ্চা পোলাপান বিয়ের উপযুক্ত নয়। এদের একমাত্র কাজ মায়ের আঁচল ধরে কোনো কিছুর জন্য জিদ ধরা। ‘আমি বিয়া করমু, আমার বউ আইনা দাও তোমরা’ বাসার লোকদের কাছে এই যদি হয় তোমার এপ্রোচ, তাহলে আমি বলব, তুমি বিয়ের চিন্তা মাথা থেকে দূর করে দাও। বাজার থেকে ফিডার কিনে এনে ফিডার খাও। বউ কি মেলায় কিনতে পাওয়া কোনো খেলনা, যে বাবা মার কাছে জিদ ধরবা আর তা তোমাকে এনে দিবেন? নিজের বউয়ের সব খরচ বাবার কাছ থেকে নিতে তোমার লজ্জা করা উচিত, তোমার পৌরুষে আঘাত লাগা উচিত।

আল্লাহ্‌র ওয়াদা যে কোনো যুবক যদি নিজের চরিত্র রক্ষার জন্য বিয়ে করতে চাই তাহলে তিনি তাঁকে অবশ্যই সাহায্য করবেন। তুমি টাকা রোযগারের আন্তরিক করো, চেষ্টা কর, দেখবে আল্লাহ কীভাবে তোমার রিযিকে বারাকাহ ঢেলে দেন , কীভাবে সবকিছু সহজ করে দেন। আল্লাহ্‌র ওয়াদা সত্য। কিন্তু তোমাকে তো চেষ্টা করতে হবে।

তুমি যদি বাসার মানুষদের সাথে এভাবে শুধু জিদ ধরে থাকো তাহলে ব্যাপক সম্ভাবনা আছে যে তুমি বিয়ে করতে পারবানা। তারা তোমার কথা তারা হেসে উড়িয়ে দিবে, তোমার সাথে রাগারাগি করবে, তোমাকে নিয়ে কৌতুক করবে। ভাববে  এটা বোধহয় পিচ্চি ছেলের নতুন কোনো শখের আবদার। কিছুদিন পরে আবার ভুলে যাবে।

যেই সমাজে চাকুরী বা ব্যবসা আছে এমন ছেলেদেরও বিয়ে করা কঠিন হয়ে গিয়েছে, কণ্যার বাপদের মন কিছুতেই গলছে না,  সেই সমাজে  তোমার মতো একজন বেকার,ছাত্রের হাতে কোন ভরসায় একজন বাবা তার মেয়েকে তুলে দিবেন? শুধু আবদার ধরলেই তো হবেনা,জিদ করলেই তো হবেনা, বাস্তবতাও বুঝতে হবে।

ধরো তুমি বিয়ের জন্য টাকা জমাতে লাগলে, টিউশনি, ব্যবসা শুরু করলে তাহলে কী হবে?

এক.  বিয়ের ফান্ডে টাকা জমবে। পরে এটি বেশ কাজে লাগবে। বিয়ের পর বউয়ের খরচ দিতে পারবে।

দুই. তোমার বাবা মা যখন দেখবে যে তুমি এভাবে কষ্ট করছো, সপ্তাহে দুইদিন রোযা রাখছো তখন তাঁরা বুঝতে পারবেন যে না তুমি আসলেই বিয়ে নিয়ে সিরিয়াস। তুমি বিয়ে করতে চাও, অন্তর থেকেই চাও। বাবা-মা, বড় ভাই-বোনদের কাছে তাদের সন্তান, তাদের ভাই কখনো বড় হয়না, সেই গোলগাল নাদুস নুদুস পিচ্চিই থাকে । তোমার এই টিউশনি করা,ব্যসসা করা দেখে তাদের ভুল ভাংবে। তুমি আর সেই পিচ্চিটি নও, তুমি বড় হয়েছো, ম্যাচিউরড হয়েছো সেটা তাঁরা উপলব্ধি করবেন। দেখবে, তারা তোমার বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠবেন। সবাই না হলে এক দুইজন অন্ততপক্ষে হবেন। এতেই তোমার বিয়ের কাজ অনেকটাই এগিয়ে যাবে ইনশা আল্লাহ।

 

তিন. মেয়ের ফ্যামিলি কিছুটা হলেও তোমার ওপর ভরসা পাবেন। তাঁরাও বুঝতে পারবেন যে তুমি দায়িত্ব নেওয়া শিখেছো, তাদের মেয়ের দায়িত্ব তুমি নিতে পারবে। তোমার সঙ্গে বিয়ে দিলে তাদের মেয়ে অন্তত জলে ভেসে যাবেনা।

 

 

 

চলবে ইনশা আল্লাহ

 

আগের কিস্তিগুলো-

প্রথম কিস্তি

দ্বিতীয় কিস্তি

তৃতীয় কিস্তি

বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ Early Marriage Campaign ফেইসবুক গ্রুপ

 

কোথায় পাবো তারে

বইঃ মুক্ত বাতাসের খোঁজে
প্রকাশনীঃ Ilmhouse Publication
সম্পাদকঃ আসিফ আদনান
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ২৩০
মূল্যঃ ২৩০ টাকা
.
বইটি কী নিয়ে লেখা জানতে- http://bit.ly/2H2DG3i
বই সম্পর্কে পাঠকদের মতামত (review)- http://lostmodesty.com/lmbook1review/
.

যেখানে যেখানে পাবেন ‘মুক্ত বাতাসের খোঁজে’ বইটি-

  • ঢাকাঃ কাটাবন, বাংলাবাজার, মিরপুর, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, নীলক্ষেত (দিশারী লাইব্রেরী) , যাত্রাবাড়ী, সিদ্ধিরগঞ্জ ইসলামী বইয়ের দোকানসমুহে।
  • সাভারঃ আস সুন্নাহ শপ (সাভার ও জাহাঙ্গীরনগর এলাকার জন্য রেকমেন্ডেড।)
  • কুমিল্লাঃ জাহিদ বুক’স কর্নার, ঠাকুরপারা
  • চট্রগ্রাম: আন্দরকিল্লা, চকবাজার, নিউমার্কেট এর ইসলামী বইয়ের দোকানসমূহে, আয়াত, ইসলামি লাইব্রেরি ফর উইমেন, Amanah, বহদ্দারহাট এ- বায়্যিনাহ.কম
  • খুলনা: আদ দ্বীন শপ, মাদরাসা লাইব্রেরি, আস সাহল লাইব্রেরি, Sunnah gallery (ডে নাইট কলেজ রোড, দৌলতপুর)
  • রাজশাহী: তাযকিয়া লাইফ, ওয়াহিদিয়া লাইব্রেরি
  • সিলেট: বইপার্ক, কুরআন মহল, মাকতাবাতুস শামস, কালান্তর প্রকাশনী, মাকতাবাতুশ শারইয়্যাহ
  • নোয়াখালী: ফেমাস লাইব্রেরি, বিপনন
  • ফেনীঃ মাকতাবাতুর রিসালাহ (ফেনী ইউনিভার্সিটির পাশে), আজিজিয়া লাইব্রেরি (কোর্ট মসজিদ সংলগ্ন), Humanity- মনুষ্যত্ব
  • রংপুর: আস সুন্নাহ লাইব্রেরি
  • ময়মনসিংহঃ বড় মসজিদ মার্কেট, ইক্বরা লাইব্রেরী
  • ফরিদপুরঃ আন-নাসিহাহ বুকস
এছাড়া দেশের সব অভিজাত ইসলামী লাইব্রেরি গুলোতে পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ।
.

অনলাইনে কিনতে-

.
* বাংলাবাজারে পাওয়া যাবে- মাকতাবাতুল বায়ান, আর-রিহাব পাবলিকেশন্স, আমাদের বই ডট কম, উমেদ পয়েন্ট, sijdah.com এ ।
* অন্যান্য জেলা/ বিভাগের পাঠকেরা কুরিয়ারের মাধ্যমে বই নিতে পারবেন।
* বাংলাদেশের বাইরে বই নিতে চাইলে, অ্যামাজনে অর্ডার করুন বা রকমারির মাধ্যমে নিন। ভারতে লেখালেখি – পেজের ভাইদের মাধ্যমে বইটা নিতে পারেন।
*যেসব ভাইয়েরা ‘মুক্ত বাতাসের খোঁজে’ বই বিক্রয় করছেন তাঁরা আমাদেরকে আপনাদের ঠিকানা জানাতে পারেন। আমরা এই লিস্টে এড করে দিব ইনশা আল্লাহ্‌ …
.
পাইকারি-খুচরা যেকোন ধরণের প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে পারেন ইনশাআল্লাহঃ দারুল নাহদা, বাংলাবাজার মাদ্রাসা মার্কেট, ২য় তলা ঢাকা। মোবাইল: ০১৭৩৯ ১৫২১৯৭ ৩৪
তুমি এক দূরতর দ্বীপ (তৃতীয় কিস্তি)

তুমি এক দূরতর দ্বীপ (তৃতীয় কিস্তি)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম

ভাই, দেখ দুনিয়ার নারী,ধন সম্পদ, সন্তানসন্ততি এগুলো একধরণের ফিতনাহ। এগুলো দ্বারা দুনিয়াকে সুশোভিত করে রাখা হয়েছে।

‘জেনে রাখ! তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পরীক্ষার বিষয় মাত্র। আল্লাহর কাছে এর চেয়েও মহান প্রতিদান আছে।’ (সূরা আনফাল : ২৮)

‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের প্রতিপত্তি, ধন-সম্পত্তি ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না রাখে। যদি তোমরা গাফেল বা উদাসীন হও তবে অবশ্যই তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (সূরা মুনাফিকুন : ৯)

কতো সৎ মানুষের পদস্খলন হলো নারীর ফিতনায়, দ্বীনের অর্ধেক পূরণ করার জন্য বিয়ে করল, তারপর দ্বীনের বাকি অর্ধেকও হারিয়ে ফেলল, এমন মানুষ সমাজে বহু আছে। আল্লাহ্‌র দ্বীন কায়েমের স্বপ্ন দেখতো যেই যুবকের দু’চোখ, সেই যুবক বউয়ের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে গিয়ে আর ওসব নিয়ে ভাবার সময়ই পায়না।  বিপ্লবের মৃত্যু ঘটে শুরুর আগেই।

বিয়ে মানে শুধু রোমান্টিসিজমই নয়। বিয়ের পরে তোমার ঘাড়ে অনেক দায়িত্ব, কর্তব্য আসবে। তুমি যদি বিয়েকে শুধু রোমান্টিসিজম ভেবে বসে থাকো তাহলে  বিয়ের পরে  খাপ খাওয়াতে ঝামেলা হবে। মধুমাসের পরে  তোমার মোহভঙ্গ হবে। কঠিন,কঠোর  বাস্তবতা আঘাত হানবে। আগে থেকে প্রস্তুতি না থাকলে হয়তো তুমি ভেঙ্গেই পড়বে। কেন যে বিয়ে করলাম, বিয়ের আগেই তো ভালো ছিলাম এই চিন্তাও চলে আসতে পারে মাথাতে।

ভাই দেখ, তোমার এই বয়সে আগুন জ্বলে ওঠে প্রত্যেক শিরা উপশিরায়,সেই উত্তাপে বদলে যায় তোমার দুনিয়া। বদলে যায় দেখার দু’চোখ। নারীকে শুধু আর রক্তমাংসের মানুষ বলে মনে হয়না,নারীর মানবীয় বৈশিষ্ট্যের কথা তুমি ভুলে যাও। নারীকে সৌন্দর্য আর  পরিপূর্ণতার এমন পোষাক তুমি পরিয়ে রাখো যার আড়ালে ঢাকা পড়ে নারীর সকল দোষত্রুটি। নারীর কোনো ভুল, কোনো সীমাবদ্ধতা ধরা পড়েনা।  মূর্তি পুজারীর মতো নারীকে বানিয়ে ফেলো কল্যাণের প্রতিমা। মনে প্রাণে পুজো করো তাকে। যেন শুধু নারীর স্পর্শেই তোমার মুক্তি। নারী যেন পরশ পাথর যার ছোঁয়াতে আপাদমস্তক নিজেকে পালটিয়ে নিবে তুমি। কিন্তু পরে যখন আবিষ্কার করো নারীরও সীমাবদ্ধতা আছে, দোষত্রুটি আছে, সেও রক্ত মাংসের একজন মানুষ তখন মোহভঙ্গ হয়। হতাশ হও।

তোমার এই অপরিপক্ক চিন্তাভাবনার পালে জোর হাওয়া লাগায় নাটক,সিনেমা, গান আর পর্ন । অন্তরে নিঃসঙ্গতার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। তোমাকে রোমান্টিসিজমে ভাসিয়ে নেয়। আর যৌবনের উত্তাপ ছড়িয়ে দেয় শিরা উপাশিরায়, প্রতিটি লোহিত রক্তকণিকায়।

মুভি আইটেমসং পর্ন হস্তমৈথুন, গার্লফ্রেন্ড জাস্ট ফ্রেন্ড, ফ্রি মিক্সিং এগুলো থেকে শতভাগ দূরে থাকতে হবে। কঠোরভাবে চোখের হেফাযত করতে হবে। এগুলোই তো প্রধান কারণ যার কারণে তুমি অন্ধকার কানাগলিতে মাথা কুটে মরছো। যিনা,ব্যভিচার,বেহায়াপনা,লুচ্চামির হাতছানি উপেক্ষা করতে পারছনা।  বাবা মা, আত্মীয়স্বজন, একান্ত আপন মানুষগুলো তোমার প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। তুমি ঠাট্টা,তামাশার পাত্রে পরিণত হয়েছো। বিয়ে পাগলা সহ আরো অনেক উপাধি পেয়ে গিয়েছো।। ভাই এগুলো থেকে দূরে থাকো। দেখবে, তোমার অশান্ত হৃদয় অনেকটাই শান্ত হয়ে গিয়েছে। বিয়ের তীব্র প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে এসেছে। তুমি সবর করতে পারছো।  বালেগ হবার পরে তোমার যে শরীরের ক্ষুধা লাগবে সেটা বিয়ে ছাড়া  পুরোপুরি মিটবেনা, কিন্তু কিছুটা তো মিটবে। পুরো পেট না ভরুক, অর্ধেক পেট ভরবে। ক্ষিদের কথা, তীব্রতা কিছুটা ভুলে থাকতে পারবে। মুক্ত বাতাসের খোঁজে  বইটা ভালোমতো পড়ো। সে অনুসারে আমল করো। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও। আল্লাহ সহজ করে দিবেন।তাই বলে এটা না যে তুমি বিয়ে করতে দেরি করবে বা বিয়ে করার চেষ্টা থামিয়ে দেবে। বিয়ের চেষ্টা চলবে। পাশাপাশি এগুলোর দিকেও নজর দিবে।

মনে করো তুমি রোযা রেখেছো। ইফতারির অনেক দেরি। বারবার ফ্রিজ খুলে সুস্বাদু খাবার দেখতে থাকো, আম্মা রান্না করছে, সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো, তাহলে তোমার ক্ষুধার তীব্রতা,কষ্ট বেড়ে যাবেনা? এখন এটা কী কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হবে  রোযা রেখে সুস্বাদু খাবারের আশেপাশে ঘুরে বেড়ানো? তাদের ঘ্রাণ নেওয়া? বরং যতো বেশি খাবার থেকে দূরে থাকা যায়, যতো বেশি খাবারের কথা ভুলে থাকা যায় ততো ভালো। তোমার জন্য ইফতারি পর্যন্ত অপেক্ষা করা ততোবেশি সহজ হয়ে যাবে।

ভাই তাহলে চিন্তা করো, শরীরের ক্ষুধা নিয়ে( ক্ষুধা পূরণের হালাল উপায়ও নেই) কেন তুমি এমন কিছু করো  যা তোমাকে বারবার ক্ষুধার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়? কেন তুমি মুভি আর নাটকে  ডুবে থাকো যা প্রতিনিয়ত  তোমার  শরীরের ক্ষুধা, তোমার নিঃসঙ্গতা বাড়িয়ে তোলে? কেন ইউটিউবে একটার পর একটা রোমান্টিক মিউজিক ভিডিও দেখে চলছো?  কেন তুমি জাস্টফ্রেন্ডদের সাথে একই রিকশায় ঘোরো, গায়ে হাত দিয়ে কথা বলো? কেন তুমি শপিংমল,রেস্তোরা, গার্লসস্কুল,কলেজ বা এমন জায়গাগুলোতে ঘোরাফেরা করো যেখানে  সুন্দরী, আকর্ষনীয়  মেয়েদের আনাগোনা? কেন রাস্তায় চোখ নামিয়ে চলোনা? কেন ফেসবুক ইন্সটাগ্রামে লাস্যময়ী,রুপবতী নারীদের ছবি জুম করে দেখ? ট্রল পেইজ বা গ্রুপগুলোতে ‘ফান’ করার নামে অশ্লীল, উত্তেজক কথাবার্তা বলো? রাত জেগে  খোল্লামখোল্লা মেয়েদের লাইভে একটিভ থাকো?

ভাই, তুমি তো রোযা রেখেছো, ইফতারির আগে তো খাবার খাবেনা, তাহলে কেন এভাবে নিজের ক্ষুধা বাড়িয়ে তুলছো? ক্ষুধা বাড়তে বাড়তে একসময় এমন অবস্থা হবে তুমি আর ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করতে পারবেনা। হালালের পথ যেহেতু খোলা নেই, তুমি বেছে নিবে হারাম। পর্ন,হস্তমৈথুন, রুম ডেটিং,লিভ টুগেদার, ক্লাসরুমে,পার্কে,বাসে,চিপায় চাপায় বেহায়াপনা। আখিরাত তো নষ্ট হবেই, দুনিয়ার এই জীবনটাও বরবাদ হয়ে যাবে।কখনো  শান্তি পাবেনা। বুক জ্বলে যাবে ভাই, বুক জ্বলে যাবে।  অশান্তি আর অস্থিরতায়। তীব্র হতাশায়।

নারীর সাথে অন্তরংগতার ব্যাপারটিকে তোমরা  অপার্থিব সুখ আর শিহরণের প্যাকেজ ভেবে দিন রাত কল্পনা করো,  তা আসলে খুব সামান্য একটা ব্যাপার। মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কিন্তু স্বাভাবিক, সাধারণ একটা ব্যাপার। তোমরা যেরকম ভাবে একে কল্পনা করো, সেটি এর ধারে কাছেও নেই। ভাত খাওয়া, পানি খাওয়ার মতোই সাধারণ ব্যাপার এটি। সেরকম বিশেষত্ব কিছুই নেই।  অথচ এগুলো ভেবেই দিন রাত অস্থিরতা,অশান্তিতে ভোগো তুমি।

হারাম রিলেশন,লুচ্চামি ছেড়ে দাও। ফিরে আসো রবের পথে। যারা ফিরে এসেছে তারা বলেছে, যারা ফেরেনি তারাও বলেছে- ওপথে শান্তি নেই, সুখ নেই। প্রীতি নেই, ভালোবাসা নেই। ভালোবাসা ওপথে নয় , বরং ভালোবাসা তোমার রবের পথে, হ্যাঁ ভালোবাসা তোমার দ্বীনের পথে রয়েছে। চারপাশে ছড়ানো ছিটানো। অবশ্যই পড়- শান্তি পাবো কোথায় গিয়ে

তো যা বলছিলাম বিয়ে কিন্তু সকল সমস্যার সমাধান না। নারী কোনো ম্যাজিক জানেনা, যে চোখের পলকে তোমার জীবনের সকল সমস্যার সমাধান করে দিবে ম্যাজিলওয়ালারা যেমন টুপির ভেতর থেকে কবুতর বের  করে আনে। নারী তোমাকে হয়তো কিছুটা পাপ পঙ্কিলতা থেকে উদ্ধার করবে, কলুষতাময় নিশ্চিত পতন থেকে রক্ষা করবে, জীবনটাকে আরো একটু গুছিয়ে দিবে, কিন্তু সকল সমস্যার সমাধান করে দেবে না।বিয়ে সকল প্রশান্তির উৎসও না। এটা শতোভাগ সত্য যে আল্লাহ (সুবঃ) স্ত্রীদের মধ্যে চোখের শীতলতা রেখেছেন, স্ত্রীদেরকে প্রশান্তির উৎস বানিয়েছেন। কিন্তু  স্ত্রীরাই একমাত্র চোখের শীতলতার কারণ নয়, প্রশান্তি পাবার আশ্রয় স্থল নয়। তাই যদি হতো, তাহলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলতেন না , সালাতেই দান করা হয়েছে আমার চক্ষুর শীতলতা। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১২২৯৩; সুনানে নাসাঈ, হাদীস ৯৩৪০

অন্য হাদীসে বেলাল রা.-কে সম্বোধন করে বলেছেন,

সালাতের ব্যবস্থা করে আমাকে শান্তি দাও, হে বেলাল!। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৯৮৫

একটি বিষয় বোঝার চেষ্টা করি, যদি স্ত্রীই সর্বোচ্চ প্রশান্তির উৎস হতো, তাহলে সাহাবাগণ স্ত্রীর সাথেই বেশি সময় কাটাতেন। স্ত্রীর উষ্ম স্পর্শ ছেড়ে তাহাজ্জুতে দাঁড়াতেন না; স্ত্রীর মায়াবি আচলের বাধন খুলে দিনের বেলা  জিহাদের ময়দানে নামতেন না।
.

খালিদ বিন ওলীদ (রাঃ) বলতেন না, ‘আমি যেই নারীকে ভালবাসি তার সংগে আমার বিয়েও আমাকে ততটো আনন্দিত করবেনা, আমাকে যদি আমার ঔরসজাত কোন পুত্র সন্তান জন্মের সুসংবাদ দেওয়া হয় তাহলেও আমি ততোটা খুশি হবনা যতোটা খুশি আমি হব কোন এক হাড়কাঁপানো শীতের রাতে মুসলিম সৈন্যবাহিনীর সংগে কাফিরদেরকে আক্রমনের জন্য অপেক্ষা করা’

 

ভাই,আমরা তোমাকে বিয়ে করতে নিরুৎসাহিত করছিনা কোনোমতেই শুধু বাস্তবতাটা বোঝানোর চেষ্টা করছি। তুমি দেরি না করে অবশ্যই বিয়ে করে নিবে। বিয়ে তোমাকে অনেক পাপ পঙ্কিলতা থেকে রক্ষা করবে, অগোছালো জীবনটাকে গুছিয়ে দিবে, রিযিকে বারাকাহ দিবে, চোখ শীতল হবে। তবে তুমি এটা ভেবে বসে থেকোনা যে বিয়ের পর তোমরা রূপকথার রাজকন্যা রাজপুত্রদের   মতো ‘সুখে শান্তিতে চিরকাল বসবাস করিতে থাকবে’। কখনো আকাশে ঝড় উঠবেনা।

দাম্পত্য জীবন মানে এই সুখের তুফান তো, এই ঝগড়াঝাটি, মন কষাকষি । কখনো ঝকঝকে রোদ তো কখনো কালো মেঘ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে পর্যন্ত মনোমালিন্য হতো। এখন তুমি যে পরীক্ষা যে কষ্টগুলোর সম্মুখীন হচ্ছো বিয়ের পরে হয়তো এই কষ্টগুলো আর থাকবেনা, কিন্তু তুমি তখন হয়তো অন্য অনেক পরীক্ষার সম্মুখীন হবে, অন্য দিক থেকে কষ্টের মধ্যে পড়বে। কাজেই এই ব্যাপারগুলো তোমার মাথাতে যেন থাকে, তুমি এগুলোর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে থাকবে।

আবারো বলছি, আমাদেরকে ভুল বুঝোনা। জলদি বিয়ে করে নাও। একটুকু দেরি করোনা। কিন্তু এই ব্যাপারগুলোও মাথাতে রেখো।

চলবে ইনশা আল্লাহ…

আগের কিস্তিগুলো-

প্রথম কিস্তি

দ্বিতীয় কিস্তি 

বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ Early Marriage Campaign ফেইসবুক গ্রুপ

নীল নকশা (চতুর্থ কিস্তি)

নীল নকশা (চতুর্থ কিস্তি)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

IMUN (International Model United Nations) এর সোশ্যাল নাইটের কিছু ভিডিও ভাইরাল হয়েছে যেখানে গানের তালে তালে পার্টিসিপেন্টদের ল্যাপড্যান্স দিতে, কিংবা স্ট্রিপারদের অনুকরণে নাচতে দেখা যাচ্ছে। বেশ সমালোচনা হচ্ছে। অনেক কথা হচ্ছে কিভাবে এগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশে পশ্চিমা কালচার ঢোকানো হচ্ছে, কেন এগুলো বাংলাদেশের সমাজের সাথে যায় না – সেটা নিয়ে । সম্ভবত আজকে দুপুর থেকে এ কাজগুলোকে ডিফেন্ড করে পোস্ট আসতে শুরু করবে। সেগুলোতে বলা হবে, কিভাবে এসব আসলে চিন্তার স্বাধীনতা সংস্কৃতি চর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ। যতোক্ষন না আপনার আনন্দ আরেকজনের কষ্টের কারণ হচ্ছে, ততক্ষণ আপনি যা ইচ্ছে করতে পারেন, সমস্যা কোথায়? এটা জাস্ট এন্টারটেইনমেন্ট, ফান, লিবার্টি। এ অনুষ্ঠানের সাথে যুক্ত কেউ একজন সম্ভবত অলরেডি এমন কিছু বলেছে। অন্যরাও বলবে।
.
তারপর আমরা আরেকদলকে আসতে দেখবো – ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি অমুক অমুক কাজটা সমর্থন করি না, কিন্তু আরেকজনের পছন্দ, সিদ্ধান্ত ও স্বাধীনতাকে সমর্থন করি…’ টাইপ যুক্তি নিয়ে। তৃতীয় আরেকদল আসবে, ‘কাজটা ঠিক হয়নি এবং বন্ধ হওয়া উচিত, তবে মডেল ইউএন এর বিরোধিতার কোন মানে নেই। বাংলাদেশের মতো জায়গায় এটার গুরুত্ব অনেক। হয়তো এর মাধ্যমে তরুণরা সুস্থ রাজনীতির চর্চা শিখবে। এটার অমুক তমুক ভালো দিক আছে…’ ইত্যাদি কথা নিয়ে।
.
নানা দলের কথা আসার আগে কিছু কথা বলে নেই।
.
প্রথমত, ‘বাংলাদেশের সমাজ সংস্কৃতির সাথে যায় না’ যুক্তিটা দয়া করে বাদ দিন। বেইসিকালি এটার অর্থ হল হূমায়ুন আহমেদের গল্পের নায়ক-নায়িকাদের করা যিনা আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির সাথে যায়, কিন্তু সালমান মুক্তাদিরের কাজকর্ম যায় না। তাই সালমান মুক্তাদিরের যিনা ও ফাহিশাহর প্রমোশান খারাপ, হূমায়ুন আহমাদেরটা ভালো। শাড়ী-পাঞ্জাবী পরে মোমবাতি হাতে রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনে ছেলেমেয়ে একসাথে সোশ্যাল নাইট কাটিয়ে দিলে তাতে কোন সমস্যা থাকতো না। এটা একটা ননসেন্সিকাল কনসেপ্ট। সংস্কৃতি-সমাজ কোন অ্যাবসোলিউট মানদন্ড না এবং এগুলো অপরিবর্তনীয় না। ২০ বছর আগে মেয়েদের জিন্সের প্যান্ট আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির সাথে ‘মানাতো না’, এখন সম্ভবত জিন্স- ফতুয়া সাংস্কৃতিক –টাইপদের ইউনিফর্ম হয়ে গেছে। ১০ বছর পর স্কার্ট আর ব্লাউয হয়তো হবে। যা বলতে চাচ্ছি তা হল, সমাজ ও সংস্কৃতির মতো পরিবর্তনশীল মানদন্ডলে ওপর নৈতিকতা, শালীনতা ও আচরণের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। আর দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ড্রয়িং রুমে বসে সবাই মিলে টিভিপর্দায় দেখা কাজগুলো একদিন বাস্তবে উঠে আসতে পারে এ সম্ভাবনা কি একেবারেই আপনার মাথায় আসেনি?
.
দ্বিতীয়ত, যে ব্যাপারটা সামনে এসেছে সেটা বেশ স্থূল উদাহরণ তবে সত্যিকার অর্থে মডেল ইউএন, ইয়ুথ লিডারশীপ, মুভ ফাউন্ডেশানসহ এ জাতীয় বিভিন্ন সংস্থা এবং তাদের ওয়ার্কশপের মূল কাজটার বাস্তব রূপ আসলে এটাই। শুনতে ভালো এমন কিছু কথা, এবং দেখতে ভালো এমন কিছু কাজের আড়ালে সুনির্দিষ্ট কিছু চিন্তা সমাজের কিছু মানুষের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া। এ মানুষগুলো তারপর নিজ থেকেই সমাজে এসব ধারণা ছড়িয়ে দেবে। সেটা হতে পারে নারী অধিকার, মানবতা, ইন্টারফেইথ, স্বাধীনতা, ব্যাক্তি স্বাধীনতা কিংবা মুক্তচিন্তার মতো কনসেপ্ট যেগুলো, ভালো শোনায় এবং যেগুলোর শাব্দিক পোশাক তাদের মূল অর্থকে খুব সুন্দরভাবে আড়াল করে রাখে। যারা এসবে অংশগ্রহণ তাদের বেশিরভাগই এতোকিছু জেনেবুঝে যায় না, এবং নিজের অজান্তেই চেইঞ্জ এজেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভারতীয় ব্র্যান্ডের উগ্র ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া অনেকেই ইসলামকে বদলে দেয়ার অ্যামেরিকান ব্র্যান্ডের এই সূক্ষ এজেন্ডার বিরোধিতা করা তো দূরে থাকুক, বরং সমর্থক কিংবা সক্রিয় অংশগ্রহণকারীতে পরিণত হয়। একারণেই মাদ্রাসার ছাত্ররা মুভ ফাউন্ডেশানের অনুষ্ঠানে গিয়ে দাত বের করে তেলতেলে হাসি দেয়, ‘কিভাবে সমন্বিতভাবে মুভ করা যায়’ সেটা নিয়ে মুভ ফাউন্ডেশানের ওয়ার্কশপে গিয়ে ইসলামী বই প্রকাশকরা ব্রেইনস্টর্মিং করে, অনেক ইসলামিস্ট সেলিব্রিটি মডেল ইউএন টাইপ ব্যাপারগুলোতে অংশগ্রহণ করে কারণ ১) সিভিতে কাজে লাগবে, ২) নেটওয়ার্কিং হবে, ৩) বিতর্কের দক্ষতা আর পাবলিক স্কিলস বাড়বে, ৪) ফ্রি-তে বিদেশ ঘুরে আসা যাবে।
.
তৃতীয়ত, এটা চিন্তা ও কাজের স্বাধীনতা চর্চার সংস্কৃতির বাস্তব প্রতিফলন – একথা পুরোপুরি সত্য। হার্ম প্রিন্সিপাল অনুযায়ী এ কাজে কোন ভুল নেই। ছেলেপেলের মজা লাগছে, শরীর গরম হয়েছে, তাই একটু-আধটু ফান করেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হল তারা অন্য কারো ক্ষতি করেনি, কোন আইন না ভাঙ্গেনি – তাহলে এতে সমস্যা কোথায়? আপনার ভালো না লাগলে আপনি করবেন না। আর এখানে তো ভিডিও করাটাই অপরাধ হয়েছে, কারণ ভিডিও করা হয়েছে অনুমতি না নিয়ে। ওরা যা করেছে সেটা তো রাস্তায় মাইক লাগিয়ে করেনি। একটা ভিআইপি এরিয়াতে বন্ধ রুমের ভেতর করেছে। সমস্যা কোথায়?
.
যে জিনিসটাকে মাড়ির দাত দিয়ে কামড়ে ধরে নিজেদের জাতে টেনে তুলতে ইসলামিস্টদের বিশাল একটা অংশ উদগ্রীব, সেই সেক্যুলার ডিসকোর্স দিয়ে এর বিরোধিতা করা যায় না। করা গেলেও সেটা তেমন যুতসই হয় না। হবার কথাও না। ভালোমন্দের সেক্যুলার সংজ্ঞা দিয়ে এসবের বিরোধিতা করা সম্ভব না। আর ‘সমাজের সাথে যায় না’ যুক্তিও চরমভাবে দুর্বল। এসব কথা দিয়ে কোন লাভ তো হয় না, মাঝখান দিয়ে এসবের উপযুক্ত ও যথাযথ আদর্শিক বিরোধিতা এবং সঠিক অবস্থান মানুষের সামনে তুলে ধরার কাজটাও হয় না। এতোসব জোড়াতালি না দিয়ে, লম্বাচওড়া তাত্ত্বিকতা দিয়ে বুদ্ধিমান সাজার চেষ্টা না করে সরাসরি আত্মবিশ্বাসের সাথে সত্য কথাটা বলুন। এ কাজগুলো খারাপ কারণ আল্লাহ ‘আযযা ওয়া জাল এর কাছে এগুলো খারাপ। এটা হারাম কারণ ইসলামী শারীয়াহ অনুযায়ী এটা হারাম। ব্যাপারটাতো এমন না যে সাধারন মানুষ বুঝছে না যে এগুলো খারাপ। সে বুঝতে পারছে, তার কাছে এগুলো খারাপই লাগছে। কিন্তু ঠিক কী কারণে, ঠিক কোন জায়গা থেকে এর বিরোধিতা করা হচ্ছে সেটা হয়তো সে পিনপয়েন্ট করতে পারছে না। আপনি তাকে সেটা ধরিয়ে দিন। তা না করে অনর্থক অর্থহীন অনুকরণের ব্যর্থ চেষ্টায় তাকে বিভ্রান্ত করবেন না।
.
চতুর্থত, মূল সমস্যা এবং এর মাত্রা নিয়ে চিন্তা করা দরকার। কিছু ছেলেপেলে মদ খেয়ে নাচানাচি করেছে, রাতে একসাথে থেকেছে এর চেয়ে অনেক বেশি দুশ্চিন্তার কারণ হল তাদের মধ্যে যে আইডিওলজি ঢোকানো হচ্ছে এবং তাদের মাধ্যমে সমাজে যেসব ধ্যানধারণা প্রসার পাচ্ছে সেটা। পশ্চিমা ধাঁচের ল্যাপড্যান্সের চেয়ে পশ্চিমের অনুকরণে মানবতা, কল্যাণরাষ্ট্র কিংবা ব্যাক্তি স্বাধীনতার অনুকরণ করাটা অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। শরীরে পাপ লাগে না, কিন্তু অন্তরের ময়লা পৃথিবীর সব সমুদ্রের পানি দিয়ে ধুলেও যায় না।

লিখেছেন- আসিফ আদনান

পড়ুন আগের পর্বগুলো-

নীল নকশা (প্রথম কিস্তি)- https://goo.gl/MLfx9j

নীল নকশা (দ্বিতীয় কিস্তি) http://bit.ly/2D4eOsS

‘নীল নকশা’ (তৃতীয় কিস্তি)