‘দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম’ (শেষ পর্ব)

‘দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম’ (শেষ পর্ব)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

…বৃষ্টি ভালোবাসতাম আমরা দুজন।  কতোদিন বৃষ্টিতে দুজনে হেঁটে বেড়িয়েছি ফাঁকা ফুটপাতে, কাগজের নৌকা বানিয়ে ভাসিয়েছি বৃষ্টির স্ত্রোতধারায়। সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল। সারা বিকেল আমরা ঘুরে বেড়িয়েছিলাম রিকশায়। শেষ বিকেলে ঝুম বৃষ্টির পরের সেই ভীষণ প্রিয় নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল। রিকশার ভেতরের আঁধো অন্ধকারে তুমি আমার গা সেঁটে বসেছিলে। একদম গা সেঁটে। আমার অস্বস্তি হচ্ছিল।

আমি হয়তো তখন শুক্রবারের নামাযও পড়তামনা, হয়তো চেইন স্মোকার ছিলাম, লুকিয়ে লুকিয়ে পর্ন দেখতাম হঠাত হঠাত । তারপরেও তুমি যখন মাঝে মাঝে  এতো কাছাকাছি আসতে তখন আমার  অস্বস্তি হতো। কেমন জানি হয়ে যেতে তুমি সেই সময়টুকুতে। চোখের ভাষায় কী জানি বলতে চাইতে!

সেদিন আমি ছোট্ট রিকশার একপাশে যতোটুকু সরে বসা সম্ভব ততোটুকু সরে বসছিলাম। তুমি মুখে রহস্যময় হাসি হেসে আবার আমার গা সেঁটে বসছিলে বারবার। রিকশা থেকে নেমে যাবার আগমুহূর্তে  আমার কানের কাছে ঠোঁট এনে উত্তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলেছিলে, ‘ কাল বাসা খালি। ভাইয়া,ভাবী বেড়াতে যাবে। একা একা আমি বাসায় থাকতে পারিনা। আমার ভীষণ ভয় লাগে…’।

কী ভুলের মধ্যেই না আমি ডুবে ছিলাম। আলেয়াকে আলো ভেবে নষ্ট করেছিলাম জীবনের সবচেয়ে সজীব সময়গুলো। এখনো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি  নামলে  ঘর থেকে বের হয়ে আসি।  বৃষ্টিতে ভিজি। খালি পায়ে একা হেঁটে বেড়াই সবুজ ঘাসের ওপর।  রাসূলুল্লাহর সুন্নাহ। দু’আ করি মন ভরে ,বৃষ্টির সময় দু’আ কবুল হয়।   হলের  লেকের ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি বৃষ্টির ফোটা পানিতে পড়ে বৃত্তাকার ঢেউ তৈরি করছে, দূরের শালবনের ভেতর কাকের দল বৃষ্টিতে জবুথবু হয়ে গিয়েছে। বৃষ্টির ঠাণ্ডা ফোটা ভিজিয়ে দেয় আমার সর্বাঙ্গ,আড়াল করে ফেলে চোখের তপ্ত তপ্ত অশ্রু।  কতো ভুল করে ফেলেছি এই ছোট্ট জীবনে। কতো গুনাহ করে ফেলেছি। ইয়া আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। তুমি ছাড়া তো আমার যাবার জায়গা নেই।

বালিকা, তোমার সম্মোহনী আমন্ত্রণে আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন। তড়িতাহতের মতো কেপে উঠেছিলাম নিদারুণ বেদনায়। ঘৃণায় সারা শরীর রি রি করে উঠেছিল। নিজেকে ধোঁয়া তুলসি পাতা হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছিনা।টগবগে তরুণ আমি। নারীদেহের ব্যাকুল শুশ্রুষা পাবার ইচ্ছে আমারো হতো।  কিন্তু বালিকা বিশ্বাস করো, কখনো তোমাকে নিয়ে এসব ভাবিনি। পাপ আর পঙ্কিলতা সযত্নে দূরে সরিয়ে বুকের বেশ বড়সড়ো একটা জায়গা ফাঁকা করে,পবিত্রতা আর স্নিগ্ধ ভালোলাগায় মুড়ে রেখেছিলাম তোমাকে। সেই তুমি এমন একটা কথা বলতে পারলে!

তুমি বোধহয় পড়ে ফেলেছিলে আমার অনুভূতি। সেই রাতে লম্বা একটা মেসেজ পাঠিয়ে  সরি বলেছিলে। দুইদিন পরে মাফ চাইতে আমার হলের নিচে এসেছিলে সশরীরে। তোমার চোখের পানি দেখে  ক্ষমা করে দিয়েছিলাম তখনই। কিন্তু তোমার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে গিয়েছিল অনেকখানি।

ক্লাস নাইনের এ সেকশনের বালিকা, তুমি ছিলে আমার কৈশোরের প্রথম ভালোলাগা, ভালোবাসা। হাইস্কুল সুইটহার্ট। কোনো কালিমা না ছুঁয়ে নিখাদ ভালোবাসা আর শুভ্রতায় কতোবার তোমাকে ছুঁয়েছি কল্পনায়, তোমার রেশমের মতো চুলে আনমনে বিলুনি কেটেছি সে সবের তুমি কতোটা জেনেছো?

পোকাদের হাতে তুলে দিয়েছো নিজেকে, পোকারা খুবলে খুবলে ক্ষতবিক্ষত করেছে দিবানিশি,, কেউ একজন তোমার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে পার করে দিবে দীর্ঘ সুখের প্রহর… এই সৌভাগ্য তোমার কখনো হবে?

এই পৃথিবীতে কতোদিন তোমাকে পেতাম বলো? কতোটাই বা নিখুঁত তুমি? অপরূপা ? পরিপূর্ণা? চুলে তেল না দিলে, চিরুনি না করলে তোমাকে পাগলি পাগলি লাগে। দাঁত না বাজলে দুর্গন্ধ বের হয়,বগল থেকে বিশ্রী গন্ধ আসে, চোখে পেচুক জমে, সাবান না দিলে ময়লার আস্তরণ পরে। টয়লেটে যেতে হয়, তোমার নাকে সর্দি আসে। ৩০-৩৫ বছর বয়স হলেই মেদ জমে হিপোপটোম্যাস হয়ে যাবে, একদিনতো  চুল পেকে যাবে,চামড়া ঝুলে যাবে, ফোঁকলা দাঁতের দাদী নানী হবে।

তোমার মায়াজালে বিভ্রান্ত হয়ে ভুলতে বসেছিলাম তুমি সসীম, তুমি নশ্বর। ভুলতে বসেছিলাম এই আকাশের ওপারেও আকাশ রয়েছে। তারওপর স্বর্ণ,মনিমুক্তো আর হীরার একটা প্রাসাদ রয়েছে আমার।

সেখানে যাবার রাস্তা দুনিয়াতে নিজের বাড়ি যাবার পথের চাইতেও ভালোভাবে চিনব। প্রাসাদের কাছাকাছি যাবার পরে  অসাধারণ একটি দৃশ্য দেখে আমি থমকে যাব। আমার হার্টবিট মিস হবে।  পা ভারী হয়ে যাবে, নড়াচড়া করতে পারব না।

কী সেই  দৃশ্য?

জান্নাতী স্ত্রী আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন- অপরূপ এই দৃশ্যে আমি মুগ্ধ হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকব বছরের পর বছর। ৪০ বছর পলকহীন চোখে তাকিয়ে উপভোগ করব  জান্নাতী স্ত্রীর সৌন্দর্য। এমন সৌন্দর্য, এমন রূপ যা দুনিয়ার কোনো কিছুর সাথে তুলনা করা যায়না। কোনো মানবহৃদয় তা কখনো কল্পনাও করতে পারেনা।

আল্লাহ (সুবঃ) বলছেন, ‘ আমি তাঁদেরকে বানিয়েছি বানানোর মতো করেই। তাঁদেরকে করেছি চিরকুমারী। তাঁরা হবে সমবয়সের প্রেম সোহাগিনী’। (সূরা ওয়াকিয়াঃআয়াত ৩৫-৩৮)

আয়তনয়না হুরদের   সৌন্দর্যের কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ (সুবঃ) বলছেন, তাঁরা যেন লুকিয়ে রাখা মুক্তো’ (সূরা ওয়াকিয়াঃ আয়াত ২৩)

‘ এরা যেন এক একটি প্রবাল ও পদ্মরাগ’ (সূরা আররহমানঃআয়াত ৫৮)

‘তাঁরা যেন সযত্নে লুকিয়ে রাখা ডিমের কুসুমের মতো উজ্জ্বল গৌর বর্ণের সুন্দরী’ ( সূরা আছছাফফাতঃ আয়াত ৪৯ )

জান্নাতীর স্ত্রীগণ  এ কারণেই সুন্দরী নয় যে তাঁরা কোনো সুন্দরী প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে এসেছে। বরং স্বয়ং আল্লাহ (সুবঃ) এদের সৌনদ্রযের সার্টিফিকেট দিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জান্নাতের স্ত্রীদের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- একজন জান্নাতের হুর যদি পৃথিবীর প্রতি একবার দৃষ্টিপাত করে তবে মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত সমগ্র স্থান এমনভাবে আলোকিত, উদ্ভাসিত হয়ে যেতো যে তাতে চন্দ্র,সূর্যয়ের আলো পর্যন্ত নিষ্প্রভ হয়ে যেতো। সমগ্র পৃথিবী সুগন্ধিতে ভরে যেত। এমনকি যদি কোনো  হুর, হাতের তালু  পৃথিবীর দিকে মেলে ধরে তাহলে সমস্ত জগতবাসী তাঁর নূরের আভায় সম্বিৎ হারিয়ে ফেলত’। ( বুখারী)

হুর আল আইনরা এতোটাই রূপবতী যে জিব্রাইল (আঃ) এদের একজনকে একপলক দেখেই অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। [১] জান্নাতের স্ত্রীদের তোমার মতো শারীরিক সীমাবদ্ধতা নেই। তাদের টয়লেটে যেতে হয়না, গা দিয়ে গন্ধ বের হয়না, মুখের দুর্গন্ধ হয়না। তাঁদেরকে তো মাটি দিয়েই তৈরি করা হয়নি। বরং আল্লাহ (সুবঃ) তাঁদের তৈরি করেছেন বিশেষভাবে- কস্তুরী, কর্পূর এবং জাফরান দ্বারা।  এদের থুতুও মেশকের সুগন্ধ ছড়াবে। মাথার ওড়না দুনিয়া এবং এই পৃথিবীর মধ্যে যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম।

তোমার মতো তাঁরা কখনো বুড়িয়ে যাবেনা। কখনো তাঁদের সৌন্দর্য  ম্লান হবেনা। বরং দিন দিন তাঁরা আরো বেশি রূপবতী, মায়াবতী হয়ে উঠবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘জান্নাতে একটি বাজার থাকবে। প্রত্যেক জুমুআবারে জান্নাতী লোকেরা সেখানে একত্রিত হবে। তারপর উত্তরের হাওয়ায় সেখানকার ধুলা-বালি তাঁদের চেহারা ও কাপড়ের ওপর পড়বে। তাতে তাঁদের সৌন্দর্য বেড়ে যাবে। স্ত্রীদের নিকট ফিরে যাবার পরে তাঁদের স্ত্রীরা বলবেন, আপনারা তো বেশি  সুন্দর হয়ে গিয়েছেন’। জান্নাতী লোকেরাও স্ত্রীদের  বলবেন , ‘ তোমরাও আগের চাইতে অনেক সুন্দর হয়ে গিয়েছো’। (মুসলিম)

জীবন বাবু হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথে হেঁটে মালয় সাগর, বিদর্ভ নগর ঘুরে  শেষমেষ ববলতা সেনের কাছে যে শান্তি পেয়েছিলেল, আমি তোমার কাছে ঠিক সেই শান্তি পেতে চেয়েছিলাম। দিনরাত তুমি তুমি করেও অস্থিরতা,অশান্তি, নির্ঘুমরাতই কপালে জুটেছে বেশি । সবসময় সন্দেহ,ঝাড়ি,জেরা,পুলিশগিরি… এসবে শান্তি পাওয়া যায়?

জান্নাতের স্ত্রী কখনোই আমাকে  তোমার মতো বকাবকি করবেনা, ঝাড়ির ওপর রাখবেনা, এটা কিনে দাও, ওইটা কিনে দাও, রেস্টুরেন্টে খেতে নিয়ে যাও, সিনেমা দেখতে নিয়ে যাও ইত্যাদি আবদার করবেনা। কখনোই কটু কথা বলবেনা আমাকে। আমাকে সন্দেহ করবেনা।

‘তাঁদের সাথে থাকবে লজ্জাবতী,নম্র ও আয়তলোচনা তরুণীরা’ (সূরা আছ ছাফফাতঃআয়াত ৪৮ )

‘সেখানে তাঁরা কোনো অর্থহীন প্রলাপ শুনতে পাবেনা।বরং বলা হবে শুধু শান্তি! নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি।’ (সূরা ওয়াকিয়াঃআয়াত ২৫-২৬)

বালিকা, তুমি যেমন আমার মৌলিক ভালোবাসা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চলে গিয়েছো জান্নাতের স্ত্রীরা কখনোই এমন করবে না। কখনোই ধোঁকা দিবেনা। আমাকে কোনো টেনশন করতে হবেনা- না জানি আমাকে ছেঁড়ে চলে যায় না জানি আমাকে ধোঁকা দেয়, না জানি আমার সাথে প্রতারণা করে। হুর আল আঈনকে তো কেবল আমার জন্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে। না কোনো মানুষ বা জীন এদের দেখেছে আর না তাঁদের কেউ স্পর্শ করেছে।

‘সেখানে থাকবে আয়তনয়না স্ত্রীগণ। এদের কোনো জ্বীন বা মানুষ স্পর্শ করেনি’। (সূরা রহমানঃ আয়াত ৫৬)

.জান্নাতের স্ত্রী কখনোই আমাকে ছেড়ে চলে যাবেনা। অন্য পুরুষের দিকে চোখ তুলেও তাকাবেনা। মিষ্টি সুরে আমাকে বলবে, ‘ তোমার চাইতে হ্যান্ডসাম পুরুষ আর কেউ নেই। সমস্ত প্রশংসা তো সেই আল্লাহর যিনি তোমাকে আমার স্বামী আর আমাকে তোমার স্ত্রী বানিয়েছেন’। ( ইবনে জাওযী রহ, কারা জান্নাতের কুমারীদের ভালোবাসে প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা ২৩)

.আহহা! আমার কোনো টেনশন নেই। কোনো ভাবনা নেই। জান্নাতের স্ত্রী অসীম সময় জুড়ে আমাকেই শুধু আমাকেই ভালোবাসবে, প্রতিটা মুহূর্তে আমাকে আগের মুহূর্তের চেয়েও বেশী ভালোবাসবে, আমার বুকের মুখ লুকোবে, আমাকে জড়িয়ে ধরেই সুখের গল্প লিখবে।

.জান্নাততো হলো সেই রূপকথার রাজ্য যেখানে দুঃখ,কষ্ট নেই, গ্লানি,অবসাদ,বিষণ্ণতা কিছুই নেই। শুধু সুখ আর সুখ। অবিরাম বৃষ্টির মতো সুখ। যার শুরু আছে শেষ নেই। জান্নাতের নেয়ামতের কথা কল্পনা করারও ক্ষমতা নেই মাটির মানুষের। এমনই এক রাজ্য সেটি। রূপকথার মতো যেখানে- অতঃপর তাহারা চিরকাল সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে থাকিল’।

‘কেউই জানেনা  চোখ জুড়ানো কি কি নেয়ামত লুকিয়ে রাখা হয়েছে জান্নাতে ’ (সূরা সাজদাঃআয়াত ১৭)

মাঝে মাঝে উত্থাল পাথাল জোস্ন্যায় ভেসে যায় চারিদিক। চাঁদের আলো যেন হেসে হেসে গলে পড়ে যায়। রাতজাগা বাতাস বকুলমালার তীব্র গন্ধ ভাসিয়ে নিয়ে আসে। এমন রাতে ঘুমানো অপরাধ। এই অপরাধ আমি করিনা। বাইরের বারন্দায়, দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে থাকি। শত সহস্র বছরের পুরোনো নক্ষত্ররা মিটিমিটি তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। আমিও কী  তাদের দিকে তাকিয়ে  থাকিনা?  তোমায় ভেবে কল্পনায় আনমনে লিখতে থাকিনা এক উপাখ্যান? এক অদ্ভূত,কাল্পনিক কিন্তু সত্য প্রেমের উপাখ্যান…

‘তুমিও কি সহস্র বার আমার কথা ভেবেছো? নাকি তার চেয়েও বেশি; লক্ষ কোটি বার? ধূলো মলিন মিথ্যে কথার এই পৃথিবীতে বসে আমি কতো অযুত কোটিবার তোমার কথা ভেবেছি। পুকুর ধারে জলের গন্ধে চোখ ভিজিয়েছি। আর মস্তিষ্কের প্রত্যেকটি কোষ ব্যবহার করে কল্পনা করার চেষ্টা করেছি এমন এক সুখের যা কখনো কোন মানুষ অনুভব করেনি…

তুমি এলে… পাশে বসলে আমার, সবুজ ঘাসের ওপর। একটু দূরেই টলটলে স্বচ্ছ পানির বিশাল দীঘি। আকাশ থেকে একরাশ নীল ঝরে ঝরে পড়ে একটু নীলাভ দেখাচ্ছে দীঘিটাকে।  তোমার কোলে আমি মাথা রেখে শুয়ে আছি। তুমি আলতো করে চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছ। দুটো প্রজাপতি সেই কখন থেকে উড়ছে। তুমি তাদের দিকে তাকিয়ে খুশিতে হেসে দিলে। আমি দুশো একান্ন বারের মতো তোমার প্রেমে পড়লাম। আমার চোখ দেখেই তুমি বুঝে ফেললে সেটা, তাইনা?

খাম খেয়ালী মস্তান বাতাস এসে এলোমেলো করে দিল তোমার চুল। একগোছা চুল এসে পড়লো তোমার মুখের ডানপাশে। আমি ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিলাম।তুমি আমার দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটলে। দুশো বায়ান্ন বারের মতো আমি তোমার প্রেমে পড়লাম।

তোমার দুষ্টুমি ভরা চোখের তারায় নীল আকাশ তির তির করে কাঁপছিল। তুমি কি জানো, তোমার সেই সবুজাভ চোখ আমার ভেতরের কতো কিছুর মৃত্যু ঘটালো আর কতো কিছুর জীবন দিল?  আড় চোখে তোমার দিকে তাকাতেই ধরা পড়ে গেলাম আবার। তোমার চোখেমুখে সবজান্তার হাসি। আমার কী দোষ বল? তোমাকে আল্লাহ যে বানিয়েছেন বানানোর মতো করেই।

বিকেলের এক নরম মুহূর্ত। তুমি আবদার ধরলে, কাউসার দেখতে যাবে।  বেরিয়ে পড়লাম আমরা । নৌকায় দাঁড়িয়ে আগুন্তক বাতাসে তুমি মেলে দিলে দুই হাত। পাখির মতো। যেন এক্ষুনি গা ভাসাবে  এই আগুন্তক বাতাসে।  ঘোরলাগা এক আলো এসে পড়লো তোমার স্নিগ্ধ মুখটাতে। মুহূর্তেই তুমি যেন আমার থেকে অনেক দূরে চলে গেলে। ছুঁতে ইচ্ছে করেনা, কথা বলতে ইচ্ছে করেনা,কাছে যেতেও ইচ্ছে করেনা। শুধু দূর থেকে দেখতে ইচ্ছে করে।

বছরের পর বছর ধরে।

দুশো তিপ্পানবারের মতো প্রেমে পড়লাম ঠিক তখনই।

.জানি তুমি আমার কল্পনার চাইতেও সুন্দর। আমার কল্পনা ধারে কাছেও যেতে পারেনা তোমার সৌন্দর্যের । তবু আমি তোমার কথা ভাবি।  কল্পনায় তোমাকে ছুঁই হরদম।

হে হুর আল আঈন, হে আমার জান্নাতি স্ত্রী, তুমিও কি আমার কথা ভাবো অষ্টপ্রহর? তুমি কি কখনো প্রেমে পড়েছো আমার? জানিনা, জানতে চাইওনা। শুধু জেনে রাখো, অসীম গুণোত্তর ধারার মতো আমি তোমার প্রেমে পড়ে চলেছি, প্রেমে পড়তেই আছি।

…মাতাল হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দেয়  গগণ শিরীষ গাছটা। ওর ডালপালার ছায়া বারন্দার জমীনে অদ্ভূত নকশা তৈরি করে। জ্যোৎস্না দুলে ওঠে। দূর থেকে ভেসে আসে পানকৌড়ির ডাক। ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায় আমার কল্পনার সুতো।ঠেস দিয়ে বসে থাকি আমি বারন্দায়। চোখের কোণে কী অশ্রুবিন্দু জমে? নাকি আমার মনের ভুল? কল্পনা? কি জানি!

অপেক্ষার প্রহরগুলো বড় কষ্টের। সবকিছুরই তো শেষ আছে — তিক্ততার, শান্তির, অস্থিরতার, জীবনোপন্যাসের। দীর্ঘ অপেক্ষার তো বটেই।

তাইনা?

(শেষ)

(সত্য কাহিনী অবলম্বনে লস্টমডেস্টি টিম কর্তৃক অনুলিখিত,কিছুটা পরিবর্ধিত)

পড়ুন আগের দুটি পর্বঃ

দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম (প্রথম পর্ব)

দুশো তিপ্পান্নতমপ্রেম (দ্বিতীয় পর্ব) 

সব পর্ব একসঙ্গে পিডিএফঃ

রেফারেন্স-

[১] https://hearthis.at/raindropsmedia/18-bn-some-actions-that-lead-to-hellfire/ 

কৃতজ্ঞতাঃ

শেষের দুটি লাইন, একটি কবিতা থেকে নেওয়া। কবির প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম (দ্বিতীয় পর্ব)

দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম (দ্বিতীয় পর্ব)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

….একবার তোমার এক আচরণে (এটা নিয়ে পরে কথা বলব) আমি বেশ কষ্ট পেয়েছিলাম। প্রথম বারের মতো তুমি আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলে। চোখ ফুলিয়ে কেঁদেছিলে। আমি ক্ষমা করে দিয়েছিলাম।আমাদের সম্পর্কের সুতো আলগা হয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনার পর তা আবার জোড়া লাগলো। সেই শুরুর দিনগুলোর মতো।  প্রেম পেকে টসটসে হয়ে গেল, তুমি আমার হাতে হাত রেখে ১০৮ বারেরও বেশি  জিজ্ঞেস করে ফেললে আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছো তো? আমাকে কখনো ছেড়ে চলে যাবে নাতো? বেশ চলছিল এরপর।পাগলামি, কফিশপ,সিনেপ্লেক্স, কথায় কথায় রাতভোর হয়ে যাওয়া, স্বপ্ন,কল্পনা…

হঠাত একদিন কানাডা থেকে এলো এক দমকা হাওয়া । সেই দমকা হাওয়ায় অচিন দেশের রাজকুমার তোমাকে নিয়ে উড়াল দিল । বিদায় নিতে তুমি এসেছিলে রবীন্দ্র সরোবরে । কেঁদে কেঁদে বলেছিলে,“আমাকে ক্ষমা করে দিও”।  আমি হেসেছিলাম। তোমার চোখের পানি মুছে দিয়ে  দুগালে নিজের দুহাত  রেখে বলেছিলাম, “পাগলি মেয়ে একটা”।

তারপর কত দিন, কত রাত চলে গিয়েছে চলে গেছে। কতো নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটেছে।  কতো রাত  আমি নির্ঘুম কাটিয়ে দিয়েছি বিছানায় এপাশ ওপাশ  করে করে । একটার পর একটা সিগারেট ধ্বংস করেছি। গভীর রাতে সাউন্ড সিস্টেম অন করেছি । মান্না দে কেঁদে কেঁদে জানিয়েছে সে অনেকদিন দেখেনি তার প্রিয়াকে ,তাহসান বলেছে চাঁদের আলো কখনো তার হবে না । মাঝে মাঝে গিটার নিয়ে হলের সিড়িতে বসতাম। গাঁজায়  দুটো দম দিয়ে গান ধরতাম ‘গিভ মি সাম সানশাইন , গিম মি সাম রেইন ……’

খাওয়া দাওয়া করতাম না, ক্লাসে যেতামনা, ক্লাস টেস্টগুলোও মিস করতাম।  বাসা থেকে ফোনের পর ফোন দিত। ধরতাম না। পরে ফোন করে আম্মুকে ঝাড়ি দিতাম। রুমমেট, বন্ধু বান্ধব, স্যার, অনেকেই চেষ্টা করেছে  বোঝানোর । বুঝিনি আমি।

বন্ধুরা সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছিল । এমন সময় একটা ঘটনা ঘটলো যেটা আমার জীবনের মোড় ঘুরে ঘুরিয়ে দিল ১৮০ ডিগ্রী ।

গাঁজা আর সিগারেটের গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে  গোলগাল,ভালোছেলে দুই রুমমেট অন্য রুমে পালিয়ে বাঁচলো। । বেডদুইটা ফাঁকা পড়েছিল এক দিন। দরজা বন্ধ করে সারাদিন গাঁজা টেনেছিলাম । পরের দিন বেডদুটো আবার দখল হয়ে গেল। একজন আমার চাইতে দুই বছরের সিনিয়র। হুজুর। মুখে একগাল দাঁড়ি, চোখে চশমা , ইয়েমেনি এক শায়খের মতো দেখতে অনেকটা (পরে চিনেছিলাম)। মুখে সব সময় স্মিত হাসি । প্রথম দেখাতেই মানুষটাকে খুব ভালো লেগে গিয়েছিল । আমার বেহাল অবস্থায় খুব কষ্ট পেয়েছিলেন উনি।

ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে আমাকে বুঝিয়েছিলেন উনি । আমি তর্ক করেছি , মেজাজ হারিয়ে  একদিন  চিৎকার করে বলেছিলাম , ‘আমাকে আমার মতোই থাকতে দিন না ভাই। আপনারা হুজুর মানুষ ,ভালোবাসার কী বোঝেন’? সব মেয়েরা মিথ্যেবাদী,প্রতারক’।

ভালোবাসার কী বুঝি!  ভাই স্মিত হেসে আমাকে শুনিয়েছিলেন ভালোবাসার এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান । শুনিয়েছিলেন মুহাম্মাদ (সাঃ) ,খাদীজার (রাঃ) প্রেমের কথা, শত বাঁধা বিপত্তির মুখেও দ্বীন প্রচারে মুহাম্মাদের (সাঃ) দৃঢ়তা আর খাদীজার (রাঃ) পাশে থাকার কথা । শুনিয়েছেন স্ত্রীর সঙ্গে মুহাম্মাদের (সাঃ) দৌড় প্রতিযোগিতার গল্প, , স্ত্রীর এঁটো  পাত্রে ঠোঁট লাগিয়ে পানি পান করার গল্প,সওয়ারীর পিঠে উঠতে স্ত্রীকে সাহায্য করার জন্য হাঁটু গেড়ে বসে পড়ার গল্প ।

কুরআনের আয়াত নাযিল হলো, ‘ হে নবী, আপনার স্ত্রীগণকে বলুন, তোমরা যদি পার্থিব জীবন অ তার বিলাসিতা কামনা কর,তবে আস, আমি তোমাদের ভোগের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থ্যায় তোমাদের বিদায় দেই’। (সূরা আহযাবঃ আয়াত ২৮)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সব স্ত্রীদের জানিয়ে নিলেন। তাঁদেরকে বেছে নেবার সুযোগ দিলেন হয় আমাকে পাবে অথবা এই দুনিয়ার ভোগবিলাস,চাকচিক্য। তাঁর সব স্ত্রীরা একবাক্যে জানিয়ে দিলেন, ‘ আমরা আপনাকেই চাই ইয়া রাসূলুল্লাহ’।

এমন এক সংসার তাঁরা বেছে নিলেন যেখানে, মাসের পর মাস চুলায় আগুন জ্বলেনা, খেজুর খেয়ে দিনাতিপাত করতে হয়, নবীর স্ত্রী হয়েও মোটা কাপড় পরিধান করতে হয়, সংসারের কাজ করতে গিয়ে কালিঝুলি মাখতে হয়, জরাজীর্ণ কুটিরে  খেজুরপাতার বিছানায় শুতে হয়।

.আমি শুনেছি আর মুগ্ধ হয়েছি ।

এমনটাও হয়!

রূপকথার ভালোবাসাও যে হেরে যায় এর কাছে।

যদি আমাদের ঘর বাঁধা হতো, যদি আমাদের এরকম দারিদ্রতার মুখোমুখি হতে হতো, তুমি কী এভাবেই আমাকে ভালোবাসতে? কক্ষনো নয়। এই অবস্থায় পড়লে প্রথম সুযোগেই ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালিয়ে যেতো। সিনেমা বা ডেটিং এ না নিয়ে গেলে, তুমি যেরকম করতে আমার সাথে, মাসের পর মাস আধপেটে  থাকা, জীর্ণ পোষাক পরিধান করা… উফ! সম্ভবই না।

ভাই আমাকে বুঝিয়েছেন। ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে…

তুমি তো হেরেই গেলে। লুজার হয়েই রইলে আজীবন!
বালিকা তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। এক পলক দেখেই তুমি যাকে ভালোবেসেছিলে, ক্যারিয়ার, পড়াশোনা, শ্বাসত নিয়ম কানুন ভেঙ্গেচুরে কাঙ্গালের মতো ছুটে বেড়িয়েছিলে যার পিছু পিছু, সেই বালিকা তোমাকে ভুলে গিয়েছে।

একসময় তোমার কবিতা শোনার জন্য যেই বালিকা একটু পর পর ফোন করে জ্বালাতো, তোমার নামের পাশে সবুজ বাতি জ্বলতে দেখলেই নক করতো, সেই মেয়ে শব্দেরও অধিক দ্রুত গতিতে ভুলে গিয়েছে তোমাকে, তোমার সেই সব নিশাচরী কবিতাগুলোকে। ভুলে গিয়েছে বাদলা দিনের প্রথম কদমফুল আর বৃষ্টিতে ভেজার সব প্রহরগুলোকে। পাগলামি, খুনশুটি, ফুচকার দোকান,বুড়ো অশত্থ গাছের নিচের বেঞ্চি, ফুটপাত,কফিশপ, ভালোবাসার রেণু লেগে থাকা প্রিয় সবকিছুকেই। ভুলে গিয়েছে সুপারসনিক গতিতে। একপলকেই ভুলে গিয়েছে সবকিছু,ঠিক যেমন এক পলক দেখেই তুমি প্রেমে পড়েছিলে। ভুলে গিয়েছে খুব দ্রুত।

বড়লোক, এস্টাব্লিশড স্বামীর সাথে রোজ রোজ ছবি দেয়, রেস্টুরেন্ট, শপিং মল, সিনেমাহলে। হানিমুনের ছবি, বিদেশ ঘোরাঘুরির ছবি। দামী ক্যামেরায় তোলা ঝকঝকে হাস্যোজ্জ্বল সব ছবি।সুখ, ভালোবাসা উপচে পড়ছে যেন।

তুমি এসব দেখে দেখে, অতীতের কথা ভেবে, পুরনো স্মৃতি মনে করে নিজেকে পোড়াও। তামাক পাতার ধোঁয়ায়। পুড়িয়ে কালো করে ফেলো তোমার তরুণ ফুসফুস। পুড়ে যায় তোমার কলিজা, হৃৎপিণ্ড। বেঈমানি করে বসে দুচোখ। নামে অশ্রুর অঝোর ধারা।

বালিকার ছলনা নারীজাতির ওপর থেকে তোমার সব বিশ্বাস নষ্ট করে দিয়েছে। প্রতিশোধ নেবার জন্য তুমি হানা দাও পর্নসাইটগুলোতে। ঘন্টার পর ঘন্টা নীল উদ্দামতা চলতে থাকে পর্দায়। তুমিও সমানে হাত চালাও।প্রতিশোধ নিতে হবে, মস্ত বড় প্রতিশোধ,ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ।

এই প্রতিশোধের শেষ কোথায় ? আর কতোরাত গাঁজা খেয়ে টাল হয়ে পড়ে থাকলে, আর কতো ক্লাস ফাঁকি দিলে, আর কতো মেয়েকে ধরে খেয়ে ছেড়ে দিলে, আর কতো জিবি পর্ন দেখলে, আর কতোবার হস্তমৈথুন করলে, মায়ের আর কতো চোখের জল দেখলে, বাবার আর কতো অপমান দেখলে তোমার প্রতিশোধ নেওয়া শেষ হবে? তুমি ঐ মেয়েকে পরাজিত করতে পারবে? বলো, আর কতোকাল তোমার এই অদ্ভূত প্রতিশোধ চলবে? কবে তুমি বিজয়ী হয়ে? কবে বালিকা হেরে যাবে?

বোকা ছেলে, তুমি তো শুরুতেই হেরে গিয়েছো। প্রতিশোধ নেবার নামে গাঁজা খাচ্ছো, সিগারেট খাচ্ছো, খাওয়া দাওয়া, ঘুমের অনিয়ম করছো এতে কার ক্ষতিটা হচ্ছে শুনি? ঐ মেয়ের, না তোমার নিজের, নিজের শরীরের। পর্ন আর হস্তমৈথুনে তুমি তিলে তিলে শেষ করে ফেলছো পৌরুষের সব শক্তি, কার ক্ষতি হচ্ছে? কার মা কষ্ট পাচ্ছে, আত্মীয়,প্রতিবেশী,পাশের বাসার আংকেল,আন্টিদের কাছে কার মা,কার বাবা অপমানিত হচ্ছেন?

সে তো সুখেই আছে। খাচ্ছে,দাচ্ছে,ঘুমোচ্ছে,শপিং করছে, ট্যুর দিচ্ছে। স্বামীর সাথের রং ঢঙের ছবি শেয়ার করছে। তোমার কোনো দুঃখ,কষ্ট,প্রতিশোধের অভিমান,আগুন কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করেনি, করবেওনা, এরকম অবস্থায় সাধারণত করেওনা।

আর তুমি?

নিজের জীবনটাকে নরক বানিয়ে ছেড়েছো!  নর্দমার শুয়োর আর রাস্তার কুকুরেরা যেভাবে জীবন যাপন করে, তুমি বেছে নিয়েছো ঠিক সেই জীবন। নিজের শরীর শেষ করছো, স্বপ্নগুলোকে নিজের হাতে গলা টিপে মারছো।

বোকা ভাই আমার!   এটা কোনো জীবন হলো?

ফিরে এসো ভাই।
বোকা ভাই আমার, প্লিজ ফিরে আসো।
বাবার কাছে ক্ষমা চাও, মায়ের চোখের জল মুছে দাও। জায়নামাযে দাঁড়াও। চোখের জলে জ্বালিয়ে দাও অতীতের সব ভুল, সব পাপ। আবার শুরু থেকে সব শুরু করো। লম্বা একটা জীবন পড়ে আছে।
ফিরে আসো ভাই!
ফিরে আসো জীবনে।
প্লিজ!

আস্তে আস্তে আমার মধ্যে পরিবর্তন আসা শুরু হল।  ঝাঁকড়া চুলে তেল চিরুনী পড়লো,সিগারেট খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিলাম ,গাঁজা ছেড়ে দিলাম একেবারেই, শুক্রবার ছাড়াও মাঝে মাঝে মসজিদে যাওয়া শুরু করলাম। বালিকা, তোমার বিরহের মাত্রা হ্রাস পেতে শুরু করলো ।কী ঋতু চলছিল তখন? শরত না হেমন্ত? হেমন্ত বোধহয়। আহা কী ভীষণ দামি ছিল সেই হেমন্ত!

ইউটিউব ব্রাউজিং করতে করতে একদিন পেয়ে গেলাম পরকালের পথে যাত্রা নামের এক লেকচার সিরিজ।  গমগমে কন্ঠস্বরের বক্তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে গেলেন। আমি কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে শুয়ে শুনে গেলাম। কী দরদ মাখা তাঁর কণ্ঠ,কী গভীরতা তাঁর কথায়!

সেই লেকচারেই শুনলাম আশ্চর্য একদল তরুণীদের কথা ,আয়তনয়না যাদের চোখ, কোনো মানুষ ও জ্বীন কখনো যাদের স্পর্শ করেনি । প্রবাল ও পদ্মরাগের মতো এই সব তরুণীদেরকে আল্লাহ্‌ (সুবঃ) নাম দিয়েছে হূর আল আঈন। আল্লাহ্‌ (সুবঃ) এদেরকে নাকি এতো সুন্দর করে বানিয়েছেন যে এদের দিকে তাকিয়েই মানুষ  বছরের পর বছর কাটিয়ে দিবে । তবু চোখ ফেরাতে পারবে না ।

সেই লেকচারে আরো শুনলাম আকাশের ওপারের লাল নীল হারী আর মুক্তোর প্রাসাদের কথা, আদিগন্ত বিস্তৃত রেশমের গালিচা, সারি সারি আসন, সালসাবিল আর কাউসারের কথা, সিদরাতুল মুনতাহার কথা…।

.বালিকা তোমার প্রতি যে  ভালোবাসাটুকু অবশিষ্ট ছিল তার এক কানাকড়িও আর থাকলো না এই লেকচার শোনার পর। কঠোর প্রতিজ্ঞা করলাম, জান্নাতের সেই মুহূর্তগুলো কিছুতেই মিস করা যাবে না । বদলে গেলাম আমি ।

আমূল বদলে গেলাম।

চলবে ইনশা আল্লাহ…

পড়ুন- প্রথম পর্ব

(সত্য কাহিনী অবলম্বনে লস্টমডেস্টি টিম কর্তৃক অনুলিখিত,কিছুটা পরিবর্ধিত)

 

‘দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম’ (প্রথম পর্ব)

‘দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম’ (প্রথম পর্ব)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

সবাই ফেরে না।  

ফিরতে যে হবে এই বোধটাই কাজ করেনা অনেকের মনে।  

কেউ  কেউ ফেরে।  

প্রত্যাবর্তনের পথে কিছু কিছু কস্টলি অতীত তো থেকেই যায়। সিগারেটের ধোঁয়ার আড়ালে স্বযত্নে লুকিয়ে রাখা দীর্ঘশ্বাস,  এক পৃথিবী হাহাকার, অশ্রু,ঘাম,রক্ত,বুকের ভেতরের প্রতিনিয়ত লাল নীল ক্ষরণ।

প্রিয়তমার গভীর কালো চোখ,কালো চোখে মুক্তোর মতো জল, টুকরো টুকরো স্মৃতি, প্রিয় কিছু গান,কিছু কবিতা প্রত্যাবর্তনের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। সব হারানোর ভয়, সমাজ,সংস্কৃতি অদৃশ্য এক শিকলে আটকে রাখে, ফিরতে দেয়না।

তারপরেও কেউ কেউ ফিরে আসে জীবনে, ফিরে আসে মিল্লাতে ইবরাহীমে।

জাহেলিয়্যাতকে লাথি মেরে, মিথ্যে উপাস্যদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, বিমূর্ত মূর্তিকে ছুঁড়ে ফেলে,  সমাজ সংস্কৃতির কারাগারের দেয়াল মিশিয়ে দেয় ধূলোয়।

সব হারানোর ভয় হারিয়ে   বজ্র কন্ঠে ঘোষণা করে, ‘ আশহাদু আল লাইলাহা ইল্লাল্লাহ…… ‘

প্রত্যাবর্তনের পথে ফেরার ইচ্ছেটাই গুরুত্বপূর্ণ। ফিরে আসার আন্তরিক  ইচ্ছে থাকলে আল্লাহ (সুবঃ) ফেরার পথে অবশ্যই পরিচালিত করবেন। এটাই আল্লাহর চিরন্তন সুন্নাহ।  দিল চলে যায়, শতাব্দীর পর শতাব্দী পার হয়ে যায়, এক জাতির উত্থান ঘটে, অন্য জাতির পতন হয়, নদী তার গতিপথ বদলে ফেলে, কিন্তু  আল্লাহর এই সুন্নাহর কোন পরিবরতন হয়না। আসহাবে কাহফের যুবক থেকে শুরু করে সালমান আল ফার্সি (রাঃ)….. কখনো হয়নি।

আমরা আজ এক যুবকের গল্প শুনব।  জীবনের সবকটি অন্ধকার গলিতে বিচরণ করে যে প্রত্যক্ষ করেছে  সকালের সোনালী সূর্যোদয় । অন্ধকারে মাথা কুটে মরেছে বহুকাল, তাই তীব্রভাবে বুঝেছে আলোর মূল্য, আলোর দেখা পাওয়া মাত্রই গ্রহণ করে নিয়েছে দ্বিধাহীন চিত্তে।

জীবনের বিশাল ক্যানভাসে সুনিপুণভাবে এঁকেছে প্রত্যাবর্তনের গল্প…

.…প্রথম কখন কোন মুহূর্তে আমি তোমাকে দেখেছিলাম  ঠিক মনে নেই। বুকের হার্টবিট মিস হয়নি, বুকের বাম পাশটা খাঁচা ছেড়ে বের হয়ে যেতেও চায়নি। স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ছেদ পড়লে কান গরম হয়ে যায়। বালিকা বিশ্বাস করো, সেই মুহূর্তে আমার কিছুই হয়নি। হাত দুটো মুঠো পাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে   শুধু একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম- যে করেই হোক তোমাকে পেতে হবে, যে করেই হোক। ষোলোতে পা দেওয়া আমি হঠাত করেই সেদিন যেন অনেক বড় হয়ে গেলাম। বুঝে ফেললাম এক নিমিষে, ক্যারিয়ারে মনোযোগী না হলে নিম্নমধ্যবিত্ত এই আমার তোমাকে পাওয়া হবেনা কখনোই।

পড়াশোনায় সিরিয়াস হলাম। রাত জেগে জেগে পড়তাম। যখন ঘুমে দুচোখ ভারী হয়ে আসতো, তখন তোমার কথা ভাবতাম,তোমাকে কল্পনা করতাম। বেতের ফলের মতো নীরব ব্যথিত তোমার দুচোখ, পুরো মুখ জুড়ে নীরব বিষাদ ছড়িয়ে রয়েছে , চোখ থেকে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায়।  ঘুম পালিয়ে যেত। অদ্ভূত এক শক্তি অনুভব করতাম। ভাগ্যের সন্ধানে নড়বড়ে পালতোলা জাহাজ নিয়ে সমুদ্রে ভেসে পড়া যুবকদের স্বপ্নের মতো শক্তি পেতাম। হাতমুঠো করে প্রতিজ্ঞা নবায়ণ করতাম। তোমাকে পেতেই হবে। একদিন, কোনো একদিন থুতনি ধরে সবুজ ঘোমটার আড়াল থেকে তোমাকে বের করব। জিজ্ঞাসা করব, ‘ মেয়ে, কিসের এতো দুঃখ তোমার’?

একবছরের জুনিয়র তুমি, জানলেও না আমার রেসাল্ট এরপর থেকে কতো ভালো হতে শুরু করলো। অংকের মামুন স্যারের হাতে  বরাবরই বেইজ্জতি হতাম, সেই মামুন স্যার পর্যন্ত আমাকে ক্লাসের সবার সামনে ডেকে পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন!

বিতর্কের ডায়াসে দাঁড়িয়ে ক্ষুরধার যুক্তি দিয়ে একের পর এক আক্রমণ শানাতাম, করতালিতে  ফেটে পড়তো হলরুম। এককোণায় চুপটি করে বসে থাকতে তুমি, স্নিগ্ধ,সৌম্য মূর্তি হয়ে, আমি আরো প্রাণশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তাম প্রতিপক্ষের ওপর!

টিফিনের ব্রেকে তুমি ফুচকা খেতে যেতে স্কুল গেটে। দূর থেকে তোমাকে দেখতাম আর মুগ্ধ হতাম ক্ষণে ক্ষণে। একটা মেয়ে গোগ্রাসে ফুচকা গিলছে একের পর এক, এই অদ্ভূত দৃশ্যও আমার কাছে অপূর্ব মনে হতো। প্রেমে পড়লে সত্যিই বোধহয় মানুষের মস্তিষ্ক ওলট পালট আচরণ করে।  

প্রথম কখন আমাদের  কথা হয়েছিল, মনে আছে তোমার?

ফিজিক্সের প্রাইভেট পড়তে গিয়েছিলে তুমি মফিজ স্যারের বাসায়। আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নেমেছিলবাসায় ফেরার মাঝপথে আটকা পড়েছিলে  আমাদের পাশের গলিতে, নাবিলদের বাসার নিচে। বৃষ্টিতে ফুটবল খেলে, কাদামাখা ভূত হয়ে  বাসায় ফিরছিলাম। ভর সন্ধ্যায় তোমাকে ঐখানে দেখে চমকে গেলাম। তুমি আমার দিকে একপলক চাইলে। ঘরে ফেরার দুশ্চিন্তায় ছেয়ে গিয়েছে তোমার মুখ। যা বোঝার বুঝে গেলাম। এক দৌড়ে বাসায় গিয়ে ছাতা নিয়ে আসলাম। একটা রিকশা ডেকে দিলামএকেবারে সিনেমার  নায়কদের মতো।

পুরোটা সময় তুমি মুখ গোমড়া করে রেখেছিলে, হাইপাওয়ায়ের চশমা পড়া হাইস্কুলের হেড মাস্টারনীর মতো। ভাগ্যিস , তখন ফেইসবুক, মোবাইলের এতো সহজলভ্যতা ছিলনা, তাহলে তুমি খুব সহজেই বাসায় যোগাযোগ করতে আর আমারও  কপালে জুটতোনা হিরোগিরি করা। রিকশায় ওঠার আগে হাফপ্যান্ট, ম্যাগি টিশার্ট পড়া আপাদমস্তক কাদামাখা আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিলে। আস্তে করে বলেছিলে, থ্যাংকস।

বুকে কাঁপন উঠেছিল আমার।

এরপর মাঝে মাঝেই তুমি আমার সঙ্গে কথা বলতে। কখনো টিফিনের ব্রেকে ম্যাথ বুঝতে আসতে, কখনোবা ফিজিক্স। আমি খুব নার্ভাস হয়ে যেতাম। তুমি কঠিন মুখে পড়া বুঝতে। নাকি বোঝার ভান করতে, আর মনে মনে আমার দুরাবস্থা দেখে হাসতে?

একবার পরীক্ষাতে তোমার সিট পড়েছিল একদম আমার পাশে। আমি পরীক্ষা  আর কী দিব! এতো নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম, হৃদপিণ্ডটা এতো জোরে ধুকধুঁক করছিল ভয় হচ্ছিল সবাই না শুনে ফেলে।

আমি স্কুল শেষ করে বের হয়ে আসলাম। তুমি এক বছরের জুনিয়র, স্কুলেই থেকে গেলে। আমি চলে গেলাম অন্য শহরে। কলেজের ক্লাস টেস্ট, ল্যাবের ভয়াবহ অত্যাচার, নতুন পরিবেশ, তারওপর  তোমার সাথে আর যোগাযোগ হয়না। আমার তখন কী যে ভাংচুর অবস্থা! ছুটিতে বাড়ি এসে তোমার বাসার সামনের গলিতে হেঁটে বেড়াতাম, যদি একটিবার তোমার দেখা পাওয়া যায়, যদি একটিবার তুমি  ব্যালকনিতে আসো।  কী যে কষ্টের ছিল সেই দিনগুলা। ফেইসবুকে একাউন্ট খুলেছিলাম। তোমাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়িয়েছিলাম। অনেক বন্ধুবান্ধবকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম পাইনি। দুইবছর এভাবে চলে গেল। তোমার দেখা পেলাম না। তুমিও আমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করলে না। ভীষণ দুঃসময় চলছিল আমার তখন।

ভার্সিটিতে ওঠার পর ভাবলাম এবার তোমাকে বোধহয় মনের কথা বলা যায়। কতো কাহিনী করে তোমার ফোন নম্বর ম্যানেজ করেছিলাম। উইকএন্ড ছিল। পুরো হল ফাঁকা। সারাদিন মনের সাথে যুদ্ধ করলাম। সাহস সঞ্চয় করলাম। আগুনঝরা চৈত্রের শেষ প্রহরে দুরু দুরু বুকে তোমাকে ফোন দিয়েছিলাম। আড়াই বছর পরে তোমার কথা শুনলাম। নার্ভাস হয়ে সব ভজঘট পাকিয়ে ফেলেছিলাম। কথা জড়িয়ে আসছিল। একটুপর ধাতস্ত হয়ে কতো কথা বলে গিয়েছিলাম কিন্তু সেই কথাটি আর বলা হলোনাতুমি ঠিকই ধরে ফেলেছিলে। হেসেছিলে প্রাণভরে। কপট রাগের স্বরে বলেছিলে-   সামনে আমার এইচএসসি পরীক্ষা’।

আমি আর তোমাকে ফোন দেইনি। এর মাঝে একদিন তুমি  ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালে। আমি দিনে অন্তত দশবার তোমার ওয়ালে ঘুরে বেড়াতাম আর বুক ভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। নক করার সাহসও হয়নি। কেন যে এতো ভীরু হয়ে যেতাম তোমার কাছে!

প্রেমের মাতাল হাওয়া বইতে শুরু করেছিল সেই প্রথম দেখা থেকেই। যদিওবা তখন তা ছিল একপাক্ষীক হাওয়া। হৃদয় আকাশে যে অল্প অল্প করে ভালোবাসার মেঘ জমছিল সেটা তুমিও বুঝতে আমিও বুঝতাম। শুধু বৃষ্টিটা কেন জানি নামছিল না!

এইচএসসির পর আমার শহরে  চলে আসলে মেডিকেলে চান্স পেয়ে। উঠলে তোমার ভাইয়ের বাসায়। ভাইয়াকে বলে দিয়েছিলে এডমিশানের সব কাজ  একাই পারবে। ফোন করে ডেকে নিলে আমাকে।

তারপর এডমিশনের কাজে এ বিল্ডিং ও বিল্ডিং এ ছোটাছুটি,রাস্তা পার হতে গিয়ে ভয় পেয়ে তোমার আমার বামবাহু আঁকড়ে ধরা, রিকশায় ঘোরাঘুরি… কখন যে বিস্ময়কর রুদ্ধশ্বাস ভালোবাসার মেঘ গলে গেলো, কখন অঝোরে বৃষ্টি নামলো, কখন ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে নেমে আসলাম আমরা দুজন, টের পাইনি একদম!

এরপরের কাহিনীটা পুরনোই। পৃথিবীর বুকে অনেকবার অভিনীত হয়েছে। অবিমিশ্র ভালোবাসায় মাতাল হয়ে গেলাম আমরা দুজন।

নিঃসঙ্গতায়, নির্জনতায় কেটেছে আমার সারাবেলা,কত ভয়ঙ্কর দিন গেছে, কত গভীর গোপন কথা লুকোনো আছে আমার হৃদয়ে… এখন আমার খুব কাছে সমস্ত উষ্ণতা, নিশ্চয়তা  আর স্বপ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অবিশ্বাস্য সুন্দরী এক মেয়ে। এ যেন এক রূপকথা! এক স্বপ্নের ভালোবাসা!

.রং বদলে ধূসর হয়ে গেল জীবন কয়েক মাসের মাথাতে। আসলে প্রেমে পড়ার সময় থেকে প্রেম হয়ে যাবার পরের কিছুটা সময় স্বপ্নের মতো কাটে। তারপর স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ।

তুচ্ছ তুচ্ছ কারণে আমাদের ঝগড়া হতো… এইটা কেন করলাম, কেন ওইটা করলাম না, কেন ওর সঙ্গে কথা বললাম, কেন ফোন রিসিভ করলাম না, কেন মেসেজের রিপ্লাই দিলামনা…। প্রত্যকে ঝগড়া শেষে আমাকেই সরি বলতে হতো। মালির চোখ এড়িয়ে হলের বাগান থেকে গোলাপ চুরি করে, মনের বিরুদ্ধে কবিতা লিখে (বেশিরভাগ সমইয় জীবনানন্দ বা সুনীলের কবিতা কপি পেস্ট করতাম। তুমি বইটই পড়তেনা। ধরতেই পারতেনা  আমার কারচুপি!) বা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে তোমার মান-অভিমানের বরফ গলাতে হত।

আমাকে কতো সন্দেহ করতে তুমি!  কিছুক্ষণ পর পর ফোন করতে । ফোন একটু বিজি দেখালেই  চিল্লাচিল্লি করতে। মায়ের সঙ্গেও যে আমি ফোনে কথা বলতে পারি এটা  বুঝতে চাইতেনা। ঝগড়া করতে। অথচ অন্য ছেলেদের সাথে তুমি খুব হেসে হেসে কথা বলতে, রিকশায় এখানে সেখানে যেতে।আমার গা জ্বলে যেতো ঈর্ষায়। তোমাকে জিজ্ঞাসা করলে, হেসে উড়িয়ে দিতে। বলতে ওরা তো আমার ক্লাসমেট বা জাস্ট ফ্রেন্ড। একবার এক ব্যাচেলর স্যারের স্কেচ এঁকে ফেইসবুকে আপলোড দিলে তুমি। এটা নিয়ে কথা বলা শুরু করতেই ক্ষেপে ব্যোম হয়ে গেলে, আমার সাথে কথা বললেনা ঝাড়া দু’সপ্তাহ।   

একেতো ছিলে ডানাকাটা পরীদের মতো রূপবতী, তার ওপর খুব মিশুক। সহজেই ক্যাম্পাসে পপুলার হয়ে গেলে। ডিএলএসআরওয়ালা অনেক  জাস্টফ্রেন্ড ছিল তোমার। তাদের দিয়ে নানা ভঙ্গিমায় ছবি তুলতে। আমার পছন্দ হতনা। নিষেধ করলে শুনতে না। ঘষামাজা করে প্রায় প্রত্যেকদিন ফেইসবুকে ছবি আপলোড করতে, ছেলেরা সমানে লাভ রিএক্ট দিত, কমেন্টে তোমার রূপের প্রশংসা করত। তুমি খুব খুশি হতে। আর এদিকে আমি ঈর্ষার আগুনে জ্বলে পুড়ে কয়লা হয়ে যেতাম।  

অনেকবার তোমাকে বুঝিয়েছিলাম, ফেইসবুকে এভাবে ছবি দিওনা। যে ছেলেগুলো তোমার রূপের প্রশংসা করছে, সেই ছেলেগুলোর অনেকেই তোমাকে নিয়ে সেক্স ফ্যান্টাসিতে ভোগে, রসালো আলোচনা করে বন্ধুদের সাথেআমার অনেক বন্ধুদের দেখেছি সামনা সামনি বা ফেইসবুকে কোনো মেয়ের অনেক প্রশংসা করতে, কিন্তু আড়ালে ঐ মেয়ের কথা উঠলেই বাজারের মেয়ে টাইপ গালি দিয়ে সম্বোধন করে। ডিএলএসআর ওয়ালা বন্ধুদের দেখেছি তাদের জাস্টফ্রেন্ড বন্ধুদের ছবি এডিট করার সময় জুম করে করে দেখতে আর বাজে বাজে কথা বলতে।

তুমি আমার কথা শুনে রেগে ফায়ার হয়ে যেতে। আমি খুব পযেসিব, তুমি তোমার ব্যক্তি স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলছো, স্বাধীনভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারছোনা,আমার মানসিকতা খুব নোংরা, আমার পাশে তুমি ইনসিকিউরড ফিল করো, গা ঘিন ঘিন করে…… কতো কিছু শুনিয়েছিলে তুমি।

রাত জেগে ফোনে কথা বলার কারণে সকালের ক্লাসগুলো মিস হতো। পড়াশোনায়ও মন দিতে পারতাম না। পড়ার টেবিলে বসলে শুধু ‘তুমিই’ মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করতে। তাছাড়া একটু পর পর মেসেজের রিপ্লাই দিতে হতো, কথা বলতে হতো। খুব খারাপ রেসাল্ট হয়েছিল সেই সেমিস্টারগুলোতে।

ভালোছাত্র,ভালোমানুষ রুমমেট  অনেক বুঝিয়েছিলো। পাত্তা দেইনি । বাবা মাঝে মাঝে পড়াশোনা কেমন চলছে জিজ্ঞাসা করতেন। আমি বাবার কাছে আজীবন সত্যি বলে এসেছি। আমাকে নিয়ে তিনি একদম নিশ্চিন্ত ছিলেন। মিথ্যে কথা বলতে গিয়ে আমার বুক ভেঙ্গে যেত। খুব খারাপ লাগতো। কিন্তু মিথ্যে বলতেই হতো।ঐদিনগুলোতে প্রবল এক পাপবোধ তাড়া করে বেড়াতো।শান্তি পেতাম না।রাতে ঘুমুতে পারতাম না।

পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছিল । একবার টার্ম ব্রেকের সময় বাসাতেও যেতে পারলাম না টিউশনির কারণেডেটিং এর খরচ জোগাড়ের জন্য বাসায় মিথ্যে কথা বলে টাকা নিতাম। একই বই তিনচারবার করে কিনতাম। টিউশনিও করাতে হতো কয়েকটা। টায়ার্ড হয়ে রুমে ফিরতাম রাতে। পড়তে বসার মনমানসিকতা বা এনার্জি কোনোটাই থাকতো না। রেসাল্ট খারাপ হতো আগেই বলেছি। আমার কি যে খারাপ লাগতো! আমার গাধা গাধা বন্ধুগুলা আমার চেয়ে অনেক ভালো করতো।     

তোমাকে স্বপ্নভেবে ছুঁয়ে দিতে চেয়েছিলাম। বড়ো সাধ ছিল আকাশে সাত লক্ষ সুখের ফানুশ ওড়ানোর, অথচ আমার মৃত আকাশ জুড়ে উড়েছিল শুধুই যন্ত্রনার বেলুন। বিষম ভার হয়ে তুমি চেপে বসেছিলে আমার বুকের ভেতর। তবু তোমার হাসি,আড়চোখের চাহনি,পাগলামি, ঘন্টার পর ঘন্টা ছেলেমানুষি কথাবার্তা, আলো-আধারি,রহস্যময়তা,উদাসীনতা,গালে হাত দিয়ে চুপচাপ বসে থাকা সবকিছু মিলিয়ে তুমি আমার কাছে ছিলে এক মাদকের মতো। মিশে গিয়েছিলে আমার রক্তের প্রতিটি অনুচক্রিকায়। জানি তুমি আমাকে পোড়াবে, কিন্তু আমি পুড়তেই যে ভালোবাসতাম…

চলবে ইনশা আল্লাহ…

(সত্য কাহিনী অবলম্বনে লস্টমডেস্টি টিম কর্তৃক অনুলিখিত,কিছুটা পরিবর্ধিত)

 

তুমি এক দূরতর দ্বীপ (দ্বিতীয় কিস্তি)

তুমি এক দূরতর দ্বীপ (দ্বিতীয় কিস্তি)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।
.
মাঝে মাঝেই তোমার মন খারাপ হবে। ছুটির দুপুরগুলো কাটতে চাইবেনা কিছুতেই। ঈদের দিনগুলোতে ভীষণ একা একা লাগবে। খুব স্বাভাবিক ভাই। সবারই এমন হয়। কিন্তু এই মন খারাপ লাগা ফেসবুকে শেয়ার না করাই ভালো।
.
ফেসবুকে তোমার মন খারাপের অনুভূতি ছড়িয়ে দিয়ে তুমি কখনো শান্তি পাবেনা ভাই, জেনে রেখো। জানি ভাই তোমার বুকে অনেক কষ্ট। লাল কষ্ট নীল কষ্ট। মাল্টিকালারের কষ্ট। বুকভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাসে ভরা কষ্টগুলোর কথা ফেইসবুকে শেয়ার করে তুমি হয়তো নিজেকে কিছুটা হালকা করতে চাচ্ছো। কিন্তু ভাই এভাবে শান্তি পাওয়া যায়না। আমি পাইনি, কেউ কখনো পাইনি, তুমিও পাবেনা।
.
এরচেয়ে বরং তুমি সবর করো। ব্যথিত হৃদয়ে আল্লাহকে স্মরণ করো। মনের কথাগুলো, কষ্টগুলোর কথা তাঁকে বল যিনি এ অবস্থা বদলাতে পারবেন। যিনি এ সবরের বিনিময়ে তোমাকে পুরস্কৃত করবেন। যাদের হৃদয় ভেংগে যায়, তাদের সাথে আল্লাহ থাকেন। তোমার সৃষ্টিকর্তাকে খুলে খুলে দেখাও তোমার মনের সব দুঃখ গুলো। একাকীত্বে, নির্জনতায় কুরআনকে তোমার সংগী বানাও। কান পেতে শোনো তোমার রব তোমাকে কী বলছেন।
.
দেখ ভাই, আল্লাহ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বান্দাদের সবচেয়ে বেশি কষ্টের, সবচেয়ে বেশি ফিতনাহর মধ্যে ফেলেন। ইউসুফ (আঃ) এর কথা ধরো, দাদা নবী ছিলেন, বাবা নবী, নিজেও নবী হবেন। নবীরা নিষ্পাপ। কোনো দোষ ছিলনা তাঁর। হিংসুক ভাইয়েরা খেলতে যাবার নাম করে ছোট্ট ইউসুফকে ফেলে দিল জংগলের ধারে নির্জন অন্ধকূপে। নিজের ভাইদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে সেই অন্ধকার কূয়ার তাঁকে পড়ে থাকতে হলো অনেক সময়। তখন তাঁর মানসিক অবস্থার কথা চিন্তা করো। আপন লোকদের হাতে প্রতারিত হলে কেমন কষ্ট লাগে!
.
তারপর দাস হিসেবে তাঁকে বিক্রী করে দেওয়া হল মিশরের আযিযের কাছে। আযিযের স্ত্রী ইউসুফের (আঃ) রূপে মুগ্ধ হয়ে গেল। অভিজাত,সুন্দরী সবচেয়ে বড় কথা, কৃতদাস ইউসুফের (আঃ) মালিকের স্ত্রী, ইউসুফকে (আঃ) জিনার আহ্বান করল। নির্জন কক্ষে ইউসুফকে (আঃ) সাথে নিয়ে প্রবেশ করে দরজা লাগিয়ে দিল।
.
আযিযের স্ত্রী জুলায়খা-রূপবতী,লাস্যময়ী,অভিজাত। নির্জন কক্ষ। হাতছানি দিয়ে একজন সুন্দরী নারী, যুবক ইউসুফ (আঃ) কে এমন এক কাজের জন্য আহ্বান করছে যা যেকোনো পুরুষের স্বপ্ন। পরম আরাধ্য বিষয়। ভাই, তুমি আমি কী এই ফিতনাহর মাঝে পড়েছি? তখন ইউসুফের (আঃ) মানসিক অবস্থার কথা চিন্তা করো একবার। কী ঝড় চলছিল তাঁর মনে!
.
সবাই জানতো জুলেয়খা যা বলছে তা মিথ্যে। ইউসুফ (আঃ) নিষ্পাপ, নিরাপরাধ। যিনার হাত থেকে বাঁচার জন্য তিনি বন্ধ দরজার দিকে ছুটে গিয়েছিলেন, জুলায়খা পেছন থেকে তাঁর (আঃ) জামা টেনে ছিঁড়ে ফেলেছিল তারপরেও ইউসুফ (আঃ) কে দিয়ে জিনা করাতে পারেনি। কিন্তু তারপরেও জিনার অপবাদ মাথায় নিয়ে তাঁকে কারাগারে কাটাতে হলো সুদীর্ঘ সময়। তুমি কি ইউসুফের (আঃ) চাইতেও বেশি ফিতনাহ, বেশি কষ্টের মধ্যে পড়েছো?
.
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কথা চিন্তা করো। তাঁর চেয়ে আল্লাহর নিকট আর প্রিয় ব্যক্তি কে ছিলেন? অথচ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কেও কতো কষ্ট করতে হয়েছে। বাবাকে জীবনে চোখেও দেখেননি, মমতাময়ী মাকে হারিয়েছেন ছয় বছর বয়সেই। পাথরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন, নিজের লোকেরা এলাকা থেকে উচ্ছেদ করেছে, মাসের পর মাস চলে গিয়েছে চুলায় আগুন জ্বলেনি, খেজুর খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে, নিজ হাতে একে একে কবরে শুইয়েছেন প্রিয়তম সন্তানদের, বন্ধু আর প্রিয়মানুষদের। কাফির মুশরিকদের ব্যঙ্গ বিদ্রুপতো আছেই।
.
আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয়মানুষ, সবচেয়ে শুদ্ধ আত্মাকে যদি এতোটা কষ্ট করতে হয়, তাহলে তুমি আমি কেন একটু কষ্ট সহ্য করতে পারবনা?
.
ভাই, আল্লাহর শোকর আদায় করো। আল্লাহ তোমাকে দ্বীনের বুঝ দিয়েছেন। হাত বাড়ালেই তুমি হারাম রিলেশনের নাগাল পেয়ে যেতে, লিটনের ফ্ল্যাটে গিয়ে নিজেকে শান্ত করতে পারতে। ফিতনায় ভরপুর এই জমানায়ও আল্লাহ তোমাকে কলুষতা থেকে দূরে সরিয়ে পবিত্র রেখেছেন, বা কলুষতার জীবন ছুঁড়ে ফেলে ফিরে যেতে হবে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে – এই বোধ তোমার মধ্যে রেখেছেন। এটি এক বিশাল নিয়ামত! কতো ছেলে অন্ধকার কানা গলিতে সদর্পে হেঁটে বেড়াচ্ছে, মদ, গাজা,ইয়াবা, উদ্দাম যৌনতায় ডুবে আছে আপাদমস্তক। ভুলেও বুঝতে পারছেনা বা চাইছেনা কী ভুল তারা করছে। তুমি তো অন্তত তাদের চাইতে ভালো আছো। নিজের চাহিদা হালাল উপায়ে পূরণ করতে চাচ্ছো।
.
আল্লাহ (সুবঃ) তো এই কষ্টের মধ্যে ফেলে তোমাকে সম্মানিত করছেন। মুসলিমের জীবন যদি সুখ আর স্বাচ্ছ্যন্দ্যে পার হয়, যদি কোনো দুঃখ কষ্ট না আসে, কোনো পরীক্ষা না আসে তাহলে অন্তরের ঈমান, অনুসৃত পথ নিয়ে সন্দিহান হবার সময় চলে আসে। দুনিয়ার জীবনতো মুমীনের জন্য এক কারাগারের জীবন। কারাগারের জীবনে কী দুঃখ কষ্ট পরীক্ষা থাকবেনা, বলো?
.
এ পথ তো সেই পথ! যে পথে চলতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন আদম। ক্রন্দন করেছিলেন নূহ। আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ। যবেহ্ করার জন্য শোয়ানো হয়েছে ইসমাইলকে। খুব স্বল্প মূল্যে বিক্রি করা হয়েছিল ইউসুফকে, কারাগারে কাটাতে হয়েছিল জীবনের দীর্ঘ কয়েকটি বছর। যবেহ্ করা হয়েছে নারী সংশ্রব থেকে মুক্ত ইয়াহইয়াকে। রোগে ভুগেছেন আইয়ূব। দাউদের ক্রন্দন, সীমা অতিক্রম করেছে। নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করেছেন ঈসা। আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম। নানা দুঃখ-দুর্দশা, কষ্ট-ক্লেশ ভোগ করেছেন শেষ নবী মুহাম্মাদ ﷺ। আর তুমি এখনও খেল-তামাশায় মত্ত?! [১]
.
আর তুমি সেই পথে হেসেখেলে চলবে, ক্ষতবিক্ষত হবেনা তোমার হৃদয়, রক্তাক্ত হবেনা তোমার পা, তা কী করে হয়?
.
তুমি কি ভাবছো, আল্লাহ (সুবঃ) তোমাকে ভুলে গিয়েছেন? তুমি যে এতো দুঃখ,কষ্ট ভোগ করছো, তা আল্লাহ দেখছেননা? ভাই কাবার রবের কসম। আল্লাহ তোমাদের এই কষ্টের উত্তম প্রতিদান দিবেন। এমন উত্তম প্রতিদান যা তুমি কল্পনাও করতে পারবেনা।
.
‘ সেই মুমিনরাই সফল, যারা তাঁদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে’ (সূরা মুমিনুন,আয়াত ১ও ৪)
.
নিশ্চয় আমি তাদের ধৈর্যের কারণে আজ তাদেরকে পুরস্কৃত করলাম, নিশ্চয় তারাই হল সফলকাম। ( সূর মুমিনূন : ১১১)
.
আল্লাহর কাছে সফলতার মানে কী?
.
সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলতা পাবে। ( সূরা আলে ইমরান : ১৮৫)
.
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তো তোমাকে জান্নাতের গ্যারান্টি দিয়েছেন। বলেছেন- ‘‘যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মাঝের বস্তু (জিহবা) এবং দু’ পায়ের মধ্যখানের (লজ্জাস্থান) হেফাযতের গ্যারান্টি দিবে, আমি তার জান্নাতের ব্যাপারে গ্যারান্টি দেব’’। [বুখারী]
.
ভাই, এগুলো আল্লাহর চিরন্তন ওয়াদা – আল্লাহর চেয়ে আর কে বেশি ওয়াদা রক্ষাকারী।
.
যারা সবর করে, যারা পরীক্ষার মাঝ দিয়ে যায়, নির্জন মুহূর্তে আল্লাহ্কে ভয় করে, যারা যৌবনের হেফাযত করে, আল্লাহর ইবাদাতে নিজেদের যৌবন পার করে দেয় আল্লাহ তাঁদের ওপর ভোরের শিশিরের মতো রহমত বর্ষণ করেন।
.
ইউসুফ (আঃ) এর কথায় ধরো। ভাইদের কাছ থেকে প্রতারণার শিকার হওয়া, কূয়াতে নিক্ষেপ, নারীদের ফিতনা, বন্দীত্ব এতোসব ফিতনাহর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে।সবর করেছেন।আল্লাহর ওপর আস্থা হারাননি। এরপর আল্লাহ তায়ালা তাকে মিসরের রাজত্ব দান করেন। অথচ তিনি মিসরে প্রবেশ করেছিলেন একজন ক্রীতদাস হিসেবে।আল্লাহ (সুবঃ) এই দাসকেই দিলেন সুবিশাল রাজত্ব। ক্রীতদাসের মাথায় পরিয়ে দিলেন সম্মানের মুকুট। [২]
.
মুসা (আঃ) ফিরাউনের ভয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। ক্ষুধার্ত, সহায় সম্বল, আশ্রয়হীন। একদিন কুয়োর ধারে এক গাছের নিচে বসেছিলেন। খেয়াল করলেন, সেখানে দুইজন মেয়ে পুরুষদের ভীড়ের কারণে তাদের পশুদের পানি পান করাতে পারছেনা। মুসা (আঃ) তাদের সাথে অত্যন্ত সম্মান দিয়ে কথা বললেন। অত্যন্ত শালীনতার সাথে তাঁদের সাহায্য করলেন। এই শালীনতাবোধ, এই লজ্জাবোধের পুরষ্কার হিসেবে তিনি কি কি পেলেন?
.
সহায় সম্বলহীন, ক্ষুধার্ত মুসা (আঃ) আল্লাহর নবী শোয়াইব (আঃ) এর মেয়েকে পেলেন নিজের স্ত্রী হিসেবে। কাজ জুটলো। জুটলো নিরাপদ আশ্রয়।
.
৫০ হাজার বছর ধরে বিচার চলবে হাশরের ময়দানে। সূর্য থাকবে মানুষের অতি নিকটে। মাথার আড়াই হাত ওপরে। সূর্য আমাদের থেকে কতো কোটি কিলোমিটার দূরে। তারপরেও তার তাপে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে যাই। হাশরের সেই ভয়ঙ্কর দিনের কথা চিন্তা করো। সূর্য থাকবে মানুষের মাথার খুব কাছে। সেদিন কী দুরাবস্থায় পড়তে হবে মানুষদের। ঘামের সাগরে মানুষ হাবুডুবু খাবে, তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাবে, ছায়া মিলবেনা। আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবেনা। আল্লাহ (সুবঃ) সেই আরশের ছায়ায় দয়া করে যাদের আশ্রয় দিবেন তাদের একজন হলো সেই যুবক যার যৌবন কেটেছে আল্লাহ্র ইবাদাতে, যাকে পরমাসুন্দরী অভিজাত মহিলার জিনার আহ্বান ফিরিয়ে দিয়ে বলে আমি আল্লাহ্কে ভয় করি।
.
ভাই, হতাশ হয়োনা। যুগে যুগে যারা নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করেছে, আল্লাহ তাঁদের এই দুনিয়াতে দু’হাত ভরে দিয়েছেন। আর ওপারের ঐ জীবনটার পুরষ্কারের কথা তো বলায় বাহুল্য। তুমি কি মনে করছো, যেই আল্লাহ ইউসুফকে (আঃ), মূসাকে (আঃ) তাঁদের শালীনতাবোধ, পবিত্রতার জন্য এতো এতো নিয়ামত দিয়েছেন সেই একই আল্লাহ কি তোমাকে বঞ্চিত করবেন ? তোমাকে চিরকাল দুঃখ,কষ্ট ভোগ করাবেন? কক্ষনোই নয়। ভাই, কক্ষনোই নয়।
.
আল্লাহ (সুবঃ) অচিরেই তোমাকে সুসংবাদ দান করবেন। এমন একজন মানুষের সঙ্গে তোমার জোড়া বেঁধে দিবেন যাকে দেখে তোমার চোখ শীতল হবে এবং তোমাকে দেখেও যার চোখ শীতল হবে। তোমাকে সকল ফিতনাহ থেকে রক্ষা করবেন। এই দুনিয়ায় তোমার ঘরেই নামিয়ে আনবেন জান্নাত। তোমাকে সম্মানিত করবেন। দাঁতে দাঁত চেপে আর কয়েকটা দিন লড়ে যাও ভাই। আমাদের জান্নাত ভাই, এই সামনেই।
আর মাত্র কয়েকটা দিনের দূরত্ব।
.
“কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে”। (সূরা ৯৪:আয়াত ৫-৬)
.
“অচিরেই তোমার রব্ব তোমাকে এমন অনুগ্রহ দান করবেন যাতে তুমি সন্তুষ্ট হবে”। (সূরা দুহাঃআয়াত ৫)
.
চলবে ইনশা আল্লাহ …..
.
পড়ুনঃ প্রথম কিস্তি- https://tinyurl.com/yaeyoyjs
.
ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে চলছে আমাদের সেমিনার প্রতিযোগিতা। সেমিনার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে জিতে নেবার সুযোগ থাকছে সর্বমোট ১০ হাজার টাকার ক্যাশ। সেমিনার প্রতিযোগিতার লিংক-https://tinyurl.com/ycsbly2m

রেফারেন্সঃ
[১]আল-ফাওয়ায়িদ, ইবনুল কাইয়্যিম
[২]https:/www.raindropsmedia.org/nobider-jibon/

 

তুমি এক দূরতর দ্বীপ (প্রথম কিস্তি)

তুমি এক দূরতর দ্বীপ (প্রথম কিস্তি)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

ভার্সিটির লাইফ, বিশেষ করে হল লাইফটা মন্দ ছিলনা নাবিলের । ফেসবুকিং করার ফাঁকে ফাঁকে ক্লাস করা, ক্লাসে বসে ঝিমানো, শর্টপিচ ক্রিকেটে চিতার ক্ষিপ্রতায় ফিল্ডিং করা, মসজিদের বারন্দায় বসে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দেওয়া। কোন চিন্তা নেই কোন ভাবনা নেই, দুনিয়া উলটে যাক তাতে নাবিলের কী… শুধু চিল আর চিল।
.
বাবা-মার নজরদারি যেহেতু ছিলনা কাজেই ছোটবেলা থেকে মেনে আসা সান্ধ্য আইনের থোড়াই কেয়ার করে ইচ্ছেমতো রাত বিরাতে ঘুরে বেড়ানো যেত। কতো গভীর হাওয়ার রাত পামগাছের তলায় বসে কাটিয়ে দিয়েছে সে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো রূপালী চাঁদের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। সবুজ ঘাসের বুকে শুয়ে পার করে দিয়েছে অজস্র বৈশাখী বিকেল।
.
সবকিছুরই শেষ আছে। একদিন রূপকথা শেষ হয়ে গেল। স্বপ্নভঙ্গ হল। বের হতে হল পৃথিবীর নির্দয় পথে। সময়ের কাছে মানুষ বড় অসহায়।
.
পৃথিবীর রূঢ় রৌদ্রে প্রতিনিয়ত দগ্ধ হতে হতে, নানা সাইজের নানা গুতো খেতে খেতে নাবিল ঠিক বুঝে গেল কতো ধানে কতো চাল- হাউ ম্যানি রাইস ইন হাউ ম্যানি প্যাডি। রৌদ্রাহত, গুতো খাওয়া,টালমাটাল হৃদয় শান্তি খুঁজে বেড়ায়। শান্তি … দুদন্ড শান্তি।
.
চৈত্রের বিকেলে অশত্থ গাছের পাতায় বাতাসের দাপাদাপি আর কাকের চোখের মতো টলটলে স্বচ্ছ দিঘীর পানির মতো শান্তি। ভাদ্রের ভ্যাঁপসা গরম, শহর পঁচে গেছে। রাজপথে জট লেগেছে লোকাল বাস, সিএনজি, রিকশা। ঘড়ির কাটা দুর্বল হয়ে গিয়েছে। দরদর করে ঘামছে মানুষ। তারপর হঠাৎ করেই একে একে আসলো অতিথিরা। প্রথমে সুসংবাদবাহী বাতাস, তারপর কালো মেঘ, তারপর বৃষ্টি। অঝোর বৃষ্টি। কান্নার মতো বৃষ্টি। শান্তির বৃষ্টি।
.
বাংলাদেশের জাতীয় রোগে আক্রান্ত হয়ে গেল নাবিল। কিছুই ভালো লাগেনা। কিছুই না। সবকিছু ভাংচুর করতে ইচ্ছে করে।
.
কলিংবেল টিপে অপেক্ষা করা বড় কষ্টের। দরজা খুলেই দুষ্টু ছোটভাইয়ের ওরাংওটাঙের মতো চেহারা দেখা আরো কষ্টের। নাবিলের একজোড়া কালো চোখ দরকার, দরজা খুললেই যেটা নাবিলকে প্রশান্তি দিবে। একজোড়া লতানো হাত দরকার। দুঃখের প্রহরে যে জড়িয়ে ধরে উষ্ণতা জোগাবে। তেলাপোকা দেখে ভয় পেয়ে কেউ একজন দৌড়ে আশ্রয় খুঁজুক নাবিলের কাছে, রাস্তা পার হবার সময় নাবিলের বাম বাহুটা আঁকড়ে ধরুক পরম নির্ভরতা আর নিশ্চিন্ততায়।
.
খুব বেশি কিছুনা, দুআঙ্গুলের ডগায় যতোটুকু লবন আটকে নাবিল ঠিক ততোটুকু ভালোবাসা চায়। বন্ড সই করে হলেও সামান্য হৃদয়ের ঋণ চায়।
.
চারপাশে ভালোবাসার জোয়ারে ভেসে যাওয়া মানুষদের দেখে নাবিলের বড় মন খারাপ হয়। কতো কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে রাখে। কায়মনোবাক্যে দু’আ করে আল্লাহ্‌র কাছে।
.
দু’আ আর অষ্টপ্রহরের মাঝে অচেনা তুমি এক দূরতরো দ্বীপ হয়েই রইলে । আমার দুরু দুরু বুক, ছেঁড়া পাল, গোলমেলে ক্যাম্পাস। ছোঁয়া হলোনা তোমাকে’- সে ভাবে।
.
আল্লাহ (সুবঃ) মানুষকে বানিয়েছেনই এভাবে যে যখন সে বালেগ হবে তখন একজন সঙ্গী বা সঙ্গিনীর জন্য তার মন আঁকুপাঁকু করবে। সংগীহীনতায়, একাকীত্বে অন্তরে হাহাকার করে উঠবে। যদি এই হাহাকার দূর করার ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তাহলে তা একসময় ধ্বংস আর পতনের আহ্বানে পরিণত হবে। এই একাকীত্ব, এই অভাববোধ, শরীরের ক্ষুধা মেটানোর এই সমস্যার সহজ সমাধান দিয়ে দিয়েছেন আল্লাহ (সুবঃ) – বিয়ে। বাবা-মা’দের আদেশ করেছেন যখন ছেলেমেয়েরা বালেগ হয়ে যাবে তখন তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করে দিতে। বিয়েকে সহজ করতে বলা হয়েছে। যতো বেশি সহজ করা যায়। যেন সমাজের ভারসাম্য বজায় থাকে। উন্নতি আর প্রগতির কক্ষপথ থেকে সমাজ বিচ্যুত না হয়ে পড়ে।
.
মদীনা সনদে চলা দেশে (!), ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের (!) এই সমাজ এই সহজ সমীকরণ বোঝেনা। এই সভ্যতা, এই সমাজ কতোকিছু বুঝে ফেললো নিমিষেই,বুঝে ফেললো রকেট সায়েন্স, নিউট্রণ বোমা। বুঝলোনা শুধু মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোকে। বুঝলোনা একজন তরুণ কী চায়। মানুষের সহজাত ফিতরাতকে চোখ বুঝে জোর করে অস্বীকার করে ফেলল এই সমাজ। আগাগোড়া পুরো সংজ্ঞাটাই বদলে দিল।
.
যতোবেশিভাবে করা সম্ভব বিয়েকে কঠিন করে দেওয়া হল। অদ্ভূত অদ্ভূত হাস্যকর কিন্তু কঠিন সব শর্ত জুড়ে দেওয়া হল। বিয়ে করতে হলে আগে বড় হতে হবে। কতো বড়? তার কোনো লিমিট নেই। শুধু চাকুরী থাকলেই হবে না সরকারী চাকুরী থাকতে হবে, যেন মানুষকে বড় মুখে বলা যায়, ৪০-৫০ হাজার স্যালারি পেতে হবে মাস মাস, বাড়ি থাকতে হবে গাড়ি থাকতে হবে, লাখ লাখ টাকা দেনমোহর দিতে হবে- মেয়ে গাংগের জলে ভেসে এসেছে নাকি?
.
মেরুদন্ড ভাংগা শিক্ষাব্যবস্থা ২৭-২৮ বছর ধরে ছেলেমেয়েদের ক্লাসরুমে আটকিয়ে রাখে। বের হলেও নিস্তার নেই। চাকুরী সোনার হরিণ। মামা খালু চাচা থাকা ,সঠিক দলের লোক হওয়া আর বস্তা ভর্তি টাকা না থাকলে জীবন যৌবন ব্যায় করে অর্জন করা সার্টিফিকেটের কোনো দামই নেই। বয়স ৩০ এর কোঠা পার হয়ে যায়, মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়ে যায় কিন্তু বিয়ের যোগ্যতা অর্জন করা আর হয়ে ওঠেনা।
কোটি কোটি বেকার ছেলেমেয়ে চরম হতাশায় দিন কাটায়। মাদকে ডুবে নিজের দুঃখ কষ্ট ভুলতে চায়। কেউ কেউ বেছে নেয় আত্মহননের পথ।
.
সমাজ না বুঝুক, চোখ বুজে অস্বীকার করুক, এই ছেলেমেয়েদের শরীরে তো যৌবনের ফাগুন আসেই। হালাল উপায়ে ক্ষুধা মেটানোর তো কোনো ব্যবস্থায় নেই। অন্যদিকে হারামের পথ অত্যন্ত সহজ। এই ছেলেমেয়েগুলো কী করবে? কেউই এদের কথা ভাবেনা। এদেরকে আমরা কেন নির্বাসন দিয়ে রেখেছি? এদের কেন ভুলে গিয়েছি?
.
ক্ষুধার্ত ছেলেমেয়েদের সামনে থেকে সমাজ যদি খাবার সরিয়ে রাখতো,বা আড়াল করে রাখতো তাহলে ছেলেমেয়েদের কষ্ট কিছুটা কম হতো। নিজেকে সংবরণ করে রাখতে কিছুটা কষ্ট কম হতো। কিন্তু সর্বগ্রাসী বিষাক্ত অশ্লীল বাতাসে প্রকম্পিত এই সভ্যতা। বড় বেশি লোভ,বড় বেশি বিজ্ঞাপন, বড় বেশি চাহিদা- কাম আর লালসার। চতুর্দিকে ভালোবাসার বড্ডো আকাল। নারী স্বাধীনতার নামে নারীকে এখানে শুধু পণ্যে (আইটেম) পরিণত করা। নারী যেন শুধু আমোদ ফুর্তি করার জমাট একটা মাংসপিন্ড।
.
প্রথম আলো অশ্লীল ছবির অভিনেতা অভিনেত্রীদের ঘরের মানুষ বানিয়ে ছাড়লো, নকশা, অধুনা শিখিয়ে দিল কীভাবে পোশাক পরলে যৌবন জ্বালায় অস্থির ছেলেদের হাতের আংগুলে খেলানো যাবে। ক্লোজআপ কাছে আসার গল্প শেখালো, সারোয়ার ফারুকী ভাই বেরাদর মিলে লিটনের ফ্ল্যাট চেনালো। আইটেম সং, বিজ্ঞাপন, মুভি সিরিয়াল, নাটক, ইউটিউবের মিউজিক ভিডিও,সালমান মুক্তাদির গং, ট্রল পেইজ-গ্রুপ, ফেইসবুক লাইভ, বিলবোর্ড, বিপিএল সব কিছু, সব কিছু তরুণদের উস্কানি দেয়। অবদমিত যৌবনকে ছারখার করে দেয় কামের আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে।
.
এই জেনারেশনের কষ্ট,টানপোড়েন বোধহয় আগের জেনারেশন কখনোই বুঝতে পারবেনা। আসলে ওদের কোনো দোষ নেই। কষ্টগুলো এতোটাই তীব্র, পরীক্ষাগুলো এতোটাই কঠিন যারা এগুলোর মুখোমুখি হননি তাদের পক্ষে কষ্টের তীব্রতা অনুভব করা অত্যন্ত কঠিন।
.
কয়জন শখ করে রিকশায় লুইচ্চামি করে? লিটনের ফ্ল্যাটে যায়? যারা যায় সব দোষ কী একা তাদেরই? সমাজের কোনো দোষ নেই? এই ছেলেমেয়েগুলোর দিকে আংগুল তোলার আগে আমাদের নিজেদের দশবার চিন্তা করা উচিত। আমরা তরুণ তরুণীদের দিনের পর দিন ক্ষুধার্ত রেখেছি, ক্ষুধার্তদের সামনে আকর্ষনীয়ভাবে লোভনীয় লোভনীয় সব খাবার উপস্থাপন করেছি আর হালাল উপায়ে সে খাবার খাবার সব উপায় দুর্গম গিরি কান্তারের মতো করে রেখেছি। হারামকে করে রেখেছি একদম সহজ। এখন তরুণ তরুনীরা যদি পাপে জড়ায়, জিনা ব্যাভিচার করে তার দোষ যেমন তাদের ঠিক তেমনি এই সমাজের মানুষগুলোরও।
.
এস্টাব্লিশডমেন্ট, সোস্যাল স্ট্যাটাস, লাখ লাখ টাকার দেনমোহর, লৌকিকতা, ওয়েডিং ফটোগ্রাফি, সঙ্গীত সন্ধ্যা, হলদি নাইটসের বেড়াজাল ডিংগিয়ে তরুণ-তরূনীদের প্রতি ভালোবাসা আবার কবে ফিরে আসবে মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে? কবে ভালোবাসা পাবে ভালো রেসাল্ট করেও সিস্টেমের দোষে বেকার বসে থাকা লাখ লাখ যুবক? কবে ভালোবাসা পাবে নিজের চরিত্র রক্ষায় ছাত্র থাকা অবস্থাতেই বিয়ে করতে চাওয়া তরুণ?
.
পুরোনো রঙিন সেই শৈশবের দিনগুলোতে হা হুতাশ করত নাবিল- কবে বড় হবে, কবে স্বাধীনতা পাবে! ভাবতো জীবনের সব সুখ, সব আনন্দ,সব স্বাধীনতা সবই বোধহয় সুদূরের এই বয়সটাতে। বহু আকাঙ্ক্ষিত এই বয়সটাতে এসে অবাক হয়ে আবিষ্কার করলো সব সুখ,সব আনন্দ শৈশবে ফিরে গিয়ে ভেংচি কাটছে।
.
আবার শিশু হতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে পরাধীন হতে, টেনিস বলে টেপ পেঁচিয়ে অদ্ভূত অদ্ভূত সব আইন বানিয়ে শর্ট পিচ খেলতে , মাগরিবের আযান শোনামাত্র খেলা ফেলে তড়িঘড়ি করে বাসায় ফিরে যেতে। এক টাকার নারিকেল দেওয়া বরফ খেতে।
.
আবার বাবা হাত বাড়িয়ে দেবেন। নাবিল তাঁর কনিষ্ঠ আঙ্গুল শক্ত করে ধরে রাখবে। মানুষের ভীড়ে নাবিল আর হারিয়ে যেতে চায়না।
.
ঈশ! আবার যদি ফিরে পেতাম শৈশবের সেই পবিত্র দিনগুলো। যখন বুনো হলুদ ফুলের মতো নরম স্নিগ্ধ ছিল হৃদয়, এখনকার মতো দাউ দাউ আগুন জ্বলতোনা অষ্টপ্রহর- নাবিল আফসোস করে।
.
ব্যালকনির আলোর দীর্ঘ ছায়া এসে পড়ে অন্ধকার ঘরে। নারিকেলের পাতায় আছড়ে পড়ে ভেজা বাতাস। মাঝে মাঝে পথ ভুলে ঢুকে পড়ে ঘরে। ছুঁয়ে যায় আলো আর অন্ধকার, আশা আর নিরাশা।
নাবিল এক নব্য প্রাচীন যুবক। বিছানায় শুয়ে ছটফট করে।
.
সমীকরণ ধীরে ধীরে জটিল হতে থাকে। যোগ হতে থাকে একের পর এক নতুন ভ্যারিয়েবল। সমাধান করবে কে? আদৌ কি সমাধান আছে না সমাধান অনির্ণীত?
.
আল্লাহ্‌ সুবহানু তা’আলা কোন সমস্যা সৃষ্টি করেছেন আর তার সমাধান দেননি এমনতো হতে পারেনা । তিনি কখনোই মানুষের ওপর জুলুম করেননা ।
মানুষের প্রতি দয়া করাকে তিনি নিজের কর্তব্য হিসেবে স্থির করেছেন। মানুষের প্রতি তিনি অত্যন্ত দয়াশীল।
তিনিই তালা সৃষ্টি করেছেন আবার সেই তিনিই তো চাবি সৃষ্টি করেছেন।
আধার যতোই ঘনকালো হোকনা কেন আলোর দেখাতো এক সময় মেলেই।

এই সিরিজে আমরা ইনশা আল্লাহ চেষ্টা করব বিয়ে নিয়ে তরুণদের মধ্যে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করার। কীভাবে বাবা মাকে বোঝাতে হবে, কীভাবেই বা বিয়ের জন্য আর্থিক সামর্থ্য অর্জন করতে হবে সেই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে আমাদের আলোচনা।
ইনশা আল্লাহ।