নীড়ে ফেরার গল্প (তৃতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (তৃতীয় কিস্তি)

 

চার.
আমি ১জন হতভাগ্য পর্ন আসক্ত ব্যাক্তি, আপনাদের পেইজটা পেয়ে ভাল লাগছে, তাই কিছু কথা শেয়ার করতে চাই এবং উপদেশ/সাহায্য চাই।
.
আমি ক্লাস এইট থেকে পর্ন দেখি এবং হস্তমৈথুন করি, প্রথম দিকে তেমন দেখতাম না বা করতাম না।। মাসে ২/৩ বার।। ইন্টারে ওঠার পর কিছুটা বেরেছে, ইন্টার কমপ্লিট করার পর প্রচুর পর্ন এবং হস্তমৈথুনে আসক্ত হয়ে পড়ি।
.
আমি এখন অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে, বয়স ২২।
আমি অনেকবার আল্লাহর কাছে ওয়াদা করেছি যে আর এসব দেখবোনা আজকেই শেষ, আর হস্তমৈথুন করবনা আজকেই শেষ, কিন্তু আমি শয়তানের প্ররোচনায় বারবার ওয়াদা ভঙ্গ করেছি।
.
এসব বাদ দিয়ে নামাজও শুরু করতাম কিন্তু ১সপ্তাহ বড়জোর যেতে না যেতেই আবার আসক্ত হয়ে যেতাম।গত ২বছরে প্রচুর পর্ন দেখেছি এবং হস্থমৈথুন করেছি, বুজতাম এগুলা ভালোনা, নিজের জন্য ক্ষতি কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও বের হতে পারছিলাম না।
.
আমি চাইলে অনেক শারীরিক সম্পর্ক করতে পারতাম, যেমন ধরুন আমার ১ দুঃসম্পর্কের ভাবি। সে আমাকে ডিরেক্ট জিনা করার প্রস্তাব দিয়েছিল কিছুদিন আগে। কিন্তু আমি ডিরেক্টলি না করে দিয়েছি, তাছাড়া আমার গার্লফ্রেন্ড ছিল। চাইলে ওর সাথেও জিনা করতে পারতাম কিন্তু আমি তা করিনি, অনেক ইচ্ছা হতো কিন্তু জিনা করিনি। অনেক সুযোগও ছিলো কিন্তু করিনি। কারণ আমি জানি জিনা খুব খারাপ গুনাহ, এসব থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে পারলেও পর্ন আর হস্তমৈথুনের মত গুনাহ থেকে নিজেকে কিছুতেই রক্ষা করতে পারছিলাম না।
.
পর্ন দেখলে সেক্স করার অনেক ইচ্ছা হতো কিন্তু তা কখনোই করিনি। সবসময় হস্তমৈথুনর মাধ্যমেই নিজেকে তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছি।

অবশেষে আপনাদের পেইজটি পেলাম এবং ‘মুক্ত বাতাসের খোঁজে’ বইটি সংগ্রহ করলাম, বইটি প্রায় অর্ধেকের মত পড়েছি, কালকের মধ্যে শেষ হবে ইনশাআল্লাহ।। বইটি পড়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছি।।
.
আল্লাহর অশেষ রহমতে এই মাসের ৮তারিখ শেষ বার পর্ন দেখেছি এবং হস্তমৈথুন করেছি, ৯তারিখ থেকে আজকে পর্যন্ত ৫ওয়াক্ত সালাত আদায় করতেছি।। ঐসব থেকেও বিরত থাকতে পারছি যা গত ২বছরে সর্বোচ্চ।আল্লাহর কাছে ওয়াদা করেছি এসব আর দেখবোনা ও করবোনা।
.
আপনাদের বইটি পড়ে খুব ভালো লাগছে।কিন্তু ভয় হয় আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন তো!! আমার আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস আছে তিনি অনেক মহান দয়ালু, আমি ভাল হলে তিনি হয়তো ক্ষমা করতেও পারেন।।

পাঁচ.

আমি এই পাপ কাজটার সাথে প্রথম জড়িয়ে পড়ি ১৫ কিংবা ১৬ বছর বয়সে বা তার কম বেশি হবে। সঠিক বয়সটা ঠিক মনে পড়তেছেনা।প্রথম প্রথম খুব একটা করতাম না,দুবার একবার করতাম।তারপর আস্তে আস্তে এটা আমার নেশায় পরিণত হয়ে গেল।সিগারেট যেমন মানুষ একটু সুযোগ পেলেই খেত আমিও সুযোগ পেলেই এই নিকৃষ্ট কাজটায় জড়িয়ে যেতাম।এটা ধীরে ধীরে আমাকে পরিবার,সমাজ,বন্ধুবান্ধব থেকে আলাদা করে দিতে লাগল।
.
সবসময় একা একা থাকতে ভালবাসতাম।কারও সাথে মিশতাম না,কোথাও যেতেও ভাল লাগতনা,বন্ধুরা যখন বিভিন্ন জায়গায় দলবেঁধে ঘুরতো আর আমাকেও নিয়ে যেতে চাইতো তখন আমি বিভিন্ন অজুহাতে তাদের নিকট থেকে এক রকম পালিয়ে আসতাম।কোন কিছুতেই মন বসাতে পারতাম না,না পড়া না খেলাধুলা।প্রতিবারই করার পর প্রতিজ্ঞা করতাম যে এইবারই শেষ বার আর কখনও করবনা,আর কখনও পর্ন দেখবনা,কিন্তু কোন লাভ হয়নি,আবার পর্ন দেখেছি আবার সেইম কাজ করেছি।নিজের কাছে খারাপ লাগতে শুরু করল,কোনভাবেই এই পাপ থেকে সরে আসতে পারছিলাম না।নামাজ পড়তাম কিন্তু কোনভাবেই নামাজে মনোযোগ বসাতে পারতাম না,যোহর পড়লে আসর পড়তাম না,আর ফজর সে তো আমার কাছে ছিল সোনার হরিণ।নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে অপরাধী মনে হত।এইভাবে কয়েক বছর কেটে গেল।

এর মাঝেও হয়তো আমি কোন ভাল কাজ করেছিলাম,যার ফলে ২০১৩ সালে আমি আল্লাহর রহমতে ভাল একটা চাকরিতে জয়েন করলাম।কিন্তু এখানে এসে আমার আরও পর্নের প্রতি আসক্তি বেড়ে গেল।কারণ একটাই, চাকরিতে জয়েন করার পর টাকা পয়সার তেমন অভাব ছিল না,জিবি জিবি এম্বি কিনে পর্ন দেখতাম আর নিকৃষ্ট কাজটা করতাম।এভাবেও কয়েক বছর কেটে গেল।লাস্ট কয়েক মাস আগে ফেসবুকে দ্বীনি পরামর্শ (https://www.facebook.com/groups/naseehah/) নামে একটা গ্রুপের দেখা পাই।
.
এই গ্রুপের সাথে যারা জড়িত আছেন সবাইকে আল্লাহ তায়ালা দীর্ঘজীবী করুক।
এই গ্রপটা হয়তো আল্লাহর পক্ষে থেকে আমার জন্য ছিল বিশেষ নিয়ামত।এই গ্রুপের প্রতিটা পোস্ট আমি খুব গুরুত্ব সহকারে পড়তে লাগলাম।
আমার দিল নরম হতে লাগল,আমি কি করেছি এতদিন এইসব?নিজের খুব খারাপ লাগতে লাগল,প্রতিজ্ঞা করলাম আর জীবনে এই খারাপ কাজ করব না, করব না, করব না,এবার হয়তো আমি প্রতিজ্ঞাটা একদম মন থেকে করেছিলাম তাই হয়ত আল্লাহ তায়ালা আমাকে হেদায়েত দান করেছেন।এর ফাঁকে পেয়ে গেলাম “মুক্ত বাতাসের খোজে” গ্রুপটার (https://www.facebook.com/groups/lostmodesty.volunteers/)।
এই গ্রুপের সাথে যারা জড়িত আছে,আল্লাহ তায়ালা তাদেরকও দীর্ঘজীবী করুক।
.
এই গ্রুপের মাধ্যমে পেয়ে গেলাম মুক্ত”বাতাসের খোজে” বইটা,মাশা আল্লাহ অনেক সুন্দর একটা বই।
বইটা পড়ার পর আরও কঠিন প্রতিজ্ঞা করলাম।নামাজ শুরু করে দিলাম,৫ ওয়াক্ত জামাতের সাথে,হয় তো কাজের জন্য ২/১ ওয়াক্ত নামাজ জামাত মিস হয়ে যায়,কিন্তু সর্ব্বোচ চেষ্টা করেছি।তাহাজ্জুদ প্রতি রাতেই পড়ার চেষ্টা করলাম,তাহাজ্জুদ পড়ে প্রতি রাতেই আল্লাহর কাছে কাঁদলাম,সাহায্য চাইলাম, নিজের নজরকে কন্ট্রোল করতে শুরু করলাম,ফোন মেমরি থেকে সকল ভিডিও ডিলিট করে দিলাম,ইউটিঊবে সব ইসলামিক চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করে নিলাম,কাজের ফাঁকে ফাঁকে আল্লাহর কাছে তওবা করলাম, হাঁটাহাঁটির সময়েও আল্লাহর কাছে আস্তাগফিরুল্লাহ বলে ক্ষমা চাইতে থাকলাম,শুয়ে আছি তখনও,সবসময় আল্লাহ যিকির করতেই থাকলাম।
.
যার ফলে আল্লাহ হয়তো আমাকে হেদায়েত দান করেছেন।আর প্রায় ৪ মাস হয়ে গেল আমি এইসব থেকে দূরে আছি।আর এখন নামাজে অনেক মজা পাই,এক ওয়াক্ত নামাজ মিস হয়ে গেলে বুক ফেটে কান্না চলে আসে।এখন নিজেকে ছোট বাচ্চাদের মত মনে হয়,ছোট বাচ্চারা যেমন সব সময় হাসিখুশি থাকে আমিও তেমনই থাকি,কাজের ভিতর মজা পাই,সবার সাথে মিশে গল্প গুজব করে সময় কাটাই,আল্লাহকে ডাকি,সময়মত নামাজ পড়ি।
.
জানিনা আমি কতটুকু পেরেছি,আর এইভাবে কতদিন থাকতে পারব,তবে আমি মনে করি আমি পেরেছি আল্লাহর বিশেষ রহমতে।
.
তাই ভাই আসুন, আমরা যারা এখনও এই খারাপ কাজের সাথে জড়িত আছি আজকে এই মুহুর্ত থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে এই খারাপ কাজ থেকে ফিরে আসি।বেশি বেশি আল্লাহকে ডাকি,দৈনিক ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি,সম্ভব হলে তাহাজ্জুদ পরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই কান্নাকাটি করি।জান্নাত,জাহান্নাম,সম্পর্কে বেশি বেশি জানার চেষ্টা করি।দিনে অত্যন্ত কয়েকবার মৃত্যুকে স্মরণ করি।বিভিন্ন ইসলামিক আলোচনা শুনি।
.
আল্লাহ নিশ্চয় আমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন,কারণ আমরা আল্লাহ কে যত ভালবাসি আল্লাহু তার চেয়েও অনেক বেশি আমাদের কে ভালবাসেন।আল্লাহ নিজেও চান না তার বান্দারা জাহান্নামে যাক।
ভাই আমাদের হাতে কত সময় আছে আমরা কেউ জানিনা,তাই যতটুকু সময় পাই কাজে লাগাই,আল্লাহর পথে ফিরে আসি সকল প্রকার পাপ কাজ থেকে।আমি পেরেছি ভাই,আপনিও পারবেন আমরা সবাই পারব ইনশা আল্লাহ।
.
ভাই, আমরা সবাই একদিন মৃত্যু বরণ করব আগে আর পরে,তাই মৃত্যু আসার আগেই নিজেই প্রস্তুত করে নেই পরকালে শান্তির আশায়।
পরকালে প্রতিটা কাজের জন্যই আমাদেরকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে,তখন ফাকি দেয়ার কোন সুযোগ নাই,লুকোচুরির কোন সুযোগ নাই ভাই,তাই আসুন আমরা দুনিয়াতে এমন কোন কাজ করব না যাতে আল্লাহর কাছে লজ্জিত হই।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করুক(আমিন)।
.
চলবে ইনশা আল্লাহ …
আগের পর্বগুলো-

নীড়ে ফেরার গল্প (প্রথম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)

মুক্ত বাতাসের খোঁজে বইয়ের লিংক-

‘স্বর্গের দিন! স্বর্গের রাত!'(দ্বিতীয় পর্ব)

‘স্বর্গের দিন! স্বর্গের রাত!'(দ্বিতীয় পর্ব)

কাতাদা সান বেশ আবেগের সাথে কথা বলেন। কথা বলেন আনিমেশান নিয়ে। বলেন তাঁর ভালো লাগার আনিমেশানের কথা, তাঁর এনিমেশানের কর্ম জীবনের দীর্ঘ ৩০ বছরের কথা। জাপানের আনিমেশানের সাফল্যের পাশাপাশি জাপানের অর্থনৈতিক অবনতির কথা। জাপানের উন্নত জীবনের অন্তরালের ভয়াবহ দঃস্বপ্নময় জীবনের কথা।
.
একদিন তিনি বলছিলেন, “টোকিওতে ‘ইয়ামানোতে সেন’ (একটি ট্রেন লাইন) এ চড়লে প্রায়ই একটা ঘোষণা আমরা শুনতে পায়। অমুক সময়ের অমুক ট্রেন অত মিনিট দেরি করে ফেলেছে। অত্যন্ত দুঃখিত। দেরি হওয়ার পিছনে বিশেষ কোন কারণ নেই। …….” তিনি জিজ্ঞেস করলেন “বলুনতো, দেরি হওয়ার পিছনে বিশেষ কোন কারণ নেই এর মানে কী?”
.
আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। বললাম হয়তো কোনো ছোটখাটো সমস্যাজনিত কারণে ট্রেন লেট করে ফেলেছে তাই এটা বলছে। তিনি বললেন, “না। কারণটা আসলে অনেক বড় এবং কারণটা প্রতিদিন ই ঘটছে এবং দিনে কয়েকবারও ঘটছে, কিন্তু সেটা আবার যন্ত্রের ত্রুটি বা রেল কতৃপক্ষের ত্রুটি জনিত কারণও নয়। আসলে কারণটা ঘটায় সাধারণ মানুষ। বলতে পারবেন কারা?”
আমি বলতে পারলাম না।
তিনি বললেন, “আত্মহত্যাকারীরা”। (জাপানে আত্মহত্যাকারীরা চলন্ত ট্রেনের নীচে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।) বলে গানের সুরে সুরে ট্রেনের ঘোষনাটা আবার আওড়াতে থাকলেন। তাকে একটু হতাশ মনে হল।
.
আমি একটু সমবেদনা দেখাবার জন্যে বলতে থাকলাম “সত্যিই। জাপানে এত আত্মহত্যা করে সবাই; আমার খুব খারাপ লাগে।” আমার এক গায়িকা বান্ধবীও যে গত বছর আত্মহত্যা করেছে সে কথাও তাকে বললাম। এছাড়া ওইখানের স্কুল জীবনের কতগুলো হতাশাগ্রস্ত বন্ধু ও বান্ধবীদেরকে নিয়েও যে আমি একটু শঙ্কিত তাও তাকে বললাম। বললাম আসলে টাকা না থাকলে জাপানের জীবন অনেক কঠিন, তাই না? তিনি বললেন, “ঠিক তাই, শিপু ভাই। আপনার যদি টাকা না থাকে তাহলে জাপান হয়ে যাবে আপনার জন্যে দোযখ। না পারবেন ঘুমিয়ে থাকতে, না পারবেন জেগে থাকতে। ২৪ ঘন্টা আপনাকে দৌড়াতে হবে টাকা রোজগারের পিছনে”।

.
তিনি বলতে থাকলেন… “আজকে আপনারা মনে করছেন যে, জাপানীরা না জানি কত বড়লোক, কত সুখী। কিন্তু না। না। আপনাদের ধারণা সম্পূর্ণভাবে ভুল। সাধারণ জাপানীদের হাতে কোন টাকা নেই, আছে শুধু লোনের বোঝা আর পরিশোধের চাপ। সুখী থাকবে কিভাবে। আপনাদের তো এখনও লোনের বোঝা সেভাবে হয়ে ওঠেনি। আপনারা তো এখনো আমাদের মত তথাকথিত উন্নত জীবন-কারাগারে বন্দী হননি। তাই আপনাদের এখনও প্রতিদিন, এবং মাসের শেষে বিভিন্ন ধরণের বিল পরিশোধের টাকা গুনতে হয়না। আপানারা এখনও স্বাধীন। তাই আপনারা চাইলে মাঠে ঘুমিয়েও ২/৩ বেলা খেয়ে না খেয়েও জীবনটা পার করে দিতে পারবেন। কিন্তু আমরা জাপানীরা পারবোনা। আমাদের সে সামাজিক স্বাধীনতা নেই। না চাইলেও আমাদের ইমারতের মধ্যেই বসবাস করতে হয় এবং তার জন্য ভাড়া দিতেই হয়। ফ্লাট ভাড়া করতে গিয়ে ইন্স্যুরেন্স, গ্যারান্টি ইত্যাদি বিষয়ক অনেক কাগজ জোগাড় করতে হয়। ভাড়া জোগাড় করতে গিয়ে কাজ করতে হয়। কাজ করতে হলে খেতে হয়। ৩ বেলা না চাইলেও অন্তত ২ বেলা অবশ্যই খেতে হয় এবং তার জন্য টাকাও গুনতে হয়। কারণ না খেলে কাজ করতে পারবো না। এর পরে আছে সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে প্রয়োজনের পাহাড়। পোশাক আশাক আরও কত কি। তাল মিলিয়ে না চলতে পারলে আপনি সবার চোখে হয়ে যেতে থাকবেন একজন এলিয়েন। যা জাপানে বসবাসের জন্য ভয়াবহ। কারণ জাপানীরা এলিয়েন পছন্দ করেনা। তারা সবাইকে একই রকম দেখতে চায়। এবং আপনি সেভাবে সমাজের সাথে মেলাতে গিয়ে দেখবেন এক সময় আর পেরে উঠছেন না। আপনি রোজগারের জন্যে দৌড়াতে দৌড়াতে এক সময় শারীরিকভাবে এবং মানসিক ভাবে ক্লান্ত হতে থাকবেন। আপনি আবিষ্কার করবেন যে, আপনি সামাজিক ভাবে চলতে গিয়ে বিভিন্ন রকম বিল (অধিকাংশ জিনিষই আপনি সেখানে কিস্তিতে কিনতে পারবেন) পরিশোধ করতে গিয়ে আপনার কাজের সময়ের পরিমাণ আরো বাড়াতে হচ্ছে প্রতিদিন। একসময়ে আবিষ্কার করবেন যে, সারাদিন আপনি দাসের মত খাটছেন এবং রোজগারের জন্য যে কাজ করছেন তা আপনার পছন্দের কাজ নয়; এবং আপনি সে কজে আনন্দ তো পাচ্ছেনই না বরং কষ্ট পাচ্ছেন।
.
এরপর যা হবে তা এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মত। আপনার আর কাজে যেতে ইচ্ছে করবেনা, তারপরও বাধ্য হয়ে আপনি যাবেন। কাজে গিয়ে কর্মস্থলের মানুষদেরকে আপনার খারাপ লাগতে শুরু হবে। দোকানদার, পাওনাদারদেরকে আপনার খারাপ লাগতে থাকবে, কিন্তু আপনি এসব কিছুই প্রকাশ করার সুযোগ পাবেন না বা সে সুযোগও আপনাকে দেয়া হবে না। আপনি হতাশার অতলতায় ক্রমশ ডুবতে থাকবেন। এক সময় হয়ত এমন কিছু ঘটনা আপনার সামনে এসে দাড়াতে থাকবে যে আপনি আর মোকাবেলা করার শক্তিও পাবেন না। আপনি হতাশার ঘোরের মধ্যে আরো তলিয়ে যেতে থাকবেন। নিজের জীবনকে অদৃশ্য করে পালিয়ে বাঁচতে চাইবেন। লাফিয়ে পড়বেন ইয়ামানোতে সেনের ট্রেনের নীচে। তারপর ট্রেনে আরো একটা ঘোষনা হবে…
.
< ...... সময়ের ...... ট্রেন ...... মিনিট দেরি করে ফেলেছে। অত্যন্ত দুঃক্ষিত। দেরি হওয়ার পিছনে বিশেষ কোন কারণ নেই। >…….” কথা গুলো বলতে বলতে জাপানের টেলিভিশান এবং সিনেমা হলের জন্য নির্মিত অসংখ্য হৃদয়স্পর্শী গল্পের আনিমেটর কাতাদার চোখ দুটো চিক চিক করে উঠল।
.
আমি বললাম, ‘তাহলে আমরা কী ভালো আছি? আমাদেরও তো এখন ঢাকা শহরে বসবাস করতে অনেক খরচের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। আমদেরও তো আনেক কাজ করতে হচ্ছে’।
.
তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ,আপনাদেরও অনেক খরচের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, তবে আমাদের ধারে কাছেও এখনও পৌঁছাতে পারেননি আপনারা। ঢাকা শহরেও আপনারা চাইলে স্বাধীনভাবে অথবা খরচ না করেও জীবন যাপন করতে পারবেন এখনও। আর গ্রামে গেলে তো আরো চাহিদা কম। আপনি চাইলে অল্প কাজ করে, অল্প খেয়ে পরে, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করেও আপনার জীবনটাকে পার করে দিতে পারবেন। কিন্তু আপনাদের সমস্যা হচ্ছে, আপনারাও আমাদের মত ভুল করতে শুরু করেছেন। আপনারাও চাইছেন আমাদের মত ব্যায়বহুল জীবনযাপন করতে। আপনারা আমাদের মত দেশের (যেমন জাপান, আমেরিকা, ইউরোপ, ইত্যাদি দেশকে) অনুকরণ করে ঢাকা শহরকে একটা ব্যায়বহুল শহরে পরিণত করে সুখী হতে চাচ্ছেন।
.
কিন্তু আপনারা আসলে আমাদের মতই ভুল করছেন। এখন ঢাকা শহরে অনেক গুলো শপিং মল হয়েছে। ভিতরে ঢুকলে তথাকথিত উন্নত দেশের সাথে এগুলোর তেমন বিশেষ পার্থক্য দেখা যায়না। এর কিছু দিন পরে দেখবেন আপনাদের দেশে Kiosk, Jusco ইত্যাদি আরও সব বড় বড় শপিং মল ঢুকে পড়বে এবং তারা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। শুধু তাই নয়। এরা আপনাদের সব ছোট ছোট দোকান পাট, ব্যাবসা ইত্যাদিকে খেয়ে ফেলে দিবে। ফলাফল, আস্তে আস্তে আপনাদের সাধারণ মানুষের হাতে আর ব্যবসা থাকবে না। আপনারা ক্রমান্বয়ে হতে থাকবেন শুধু তাদের ব্যবসার জ্বালানির মসলা। আপনারা তাদেরকে মাথায় তুলে রাখার জন্য তথা কথিত উন্নত জীবন যাপনের নামে শুধু তাদের ব্যবহারের বস্তু হয়ে পড়বেন। আপনারা তাদের দ্রব্য তৈরী ও ক্রয় দুটোই করবেন।
.
তবে এখনই আপনাদেরকে ঐ ভয়াবহতার মধ্যে পড়তে হবেনা। এখন বরং আপনারা অনেক সুখী আছেন। কারণ এখন সেই সমাজ গড়ার প্রক্রিয়ার মধে আছেন আপনারা। প্রতিদিন আপনাদের একটু একটু করে রোজগারের টাকার অঙ্ক বাড়ছে, একটু একটু করে একেকটা যন্ত্রের অধিকারী হচ্ছেন। একটা ফ্রিজের, একটা ইলেক্ট্রিক ওভেনের মালিক হচ্ছেন, একটা সুন্দর শপিং মলে তথাকথিত আধুনিক পদ্ধতিতে কেনাকাটা করার সুযোগ পাচ্ছেন, কিছুদিন পরে গাড়ী বাড়ী, রাস্তা ঘাট সব কিছুরই অধিকারী হবেন তাও একটু একটু বুঝতে পারছেন। ফলে আপনাদের স্বপ্ন আছে। এবং সেই স্বপ্নই আপনাদেরকে এখন সুখে রেখেছে।
.
কিন্তু তারপর আসবে সেই সময়, হয়ত আপনাদের পরবর্তী প্রজন্ম অপেক্ষা করছে আপনাদের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে। তাদের আর কোন কিছু পাওয়ার স্বপ্ন থাকবেনা, থাকবে শুধু দুঃস্বপ্ন। সবই তারা পেয়ে যাবে। আপনারা যেমন চেয়েছিলেন ঠিক তেমন দেশই তারা পাবে। তাদের গাড়ী, বাড়ী, ওয়াশিং ম্যাশিন, রাস্তা ঘাট সবই থাকবে। গলায় বিদেশীদের মত টাইও থাকবে। কিন্তু সেই টাই হয়ে যাবে তাদের গলার ফাঁস। আপনারা যে জীবনটা পাওয়ার জন্য একসময় স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাদেরকে সেই জীবনে বসবাস করতে বাধ্য করা হবে। তাদেরকে বাধ্য করা হবে তথাকতিথ আধুনিক ইমারতে বসবাস করতে, তাদেরকে বাধ্য করা হবে তথাকতিথ শপিং মলে কেনাকাটা করতে, এবং সর্বপরি তাদেরকে বাধ্য করা হবে ঐ সবের সমস্ত ব্যায়ভারও বহন করতে। এবং তারপর যা হবে তা ঠিক এখন যেমন হচ্ছে আমাদের মত দেশ গুলোতে…
.
…তাদের আর কাজে যেতে ইচ্ছে করবেনা, তারপরও বাধ্য হয়ে তারা যাবে। কাজে গিয়ে কর্মস্থলের মানুষদেরকে তার খারাপ লাগতে শুরু হবে। দোকানদার, পাওনাদার দেরকে তার খারাপ লাগতে থাকবে, কিন্তু সে এসব কিছুই প্রকাশ করার সুযোগ পাবেনা বা সে সুযোগও তাকে দেয়া হবে না। সে হতাশার অতলতায় ক্রমশ ডুবতে থাকবে। এক সময় হয়ত এমন কিছু ঘটনা তার সামনে এসে দাড়াতে থাকবে যে সে আর মোকাবেলা করার শক্তিও পাবেনা। সে হতাশার ঘোরের মধ্যে আরো তলিয়ে যেতে থাকবে। নিজের জীবনকে অদৃশ্য করে পালিয়ে বাঁচতে চাইবে। লাফিয়ে পড়বে ইয়ামানোতে সেনের মত কোন এক ট্রেনের নীচে। তারপর ট্রেনে একটা ঘোষনা হবে। .
.
< ...... সময়ের ...... ট্রেন ...... মিনিট দেরি করে ফেলেছে। অত্যন্ত দুঃক্ষিত। দেরি হওয়ার পিছনে বিশেষ কোন কারণ নেই। >…….”
.
(ট্রেনের নীচে আত্মহত্যা করলে কোন কষ্ট ছাড়া মৃত্যু হবে এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। গবেষকদের মতে ট্রেনের নীচে শরীর কেটে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেও সত্যিকারের মৃত্যু হতে কমপক্ষে ২ ঘন্টা সময় লাগে এবং ঐ ২ ঘন্টা কল্পনাতীত যন্ত্রনা ঐ আত্মহত্যাকারীকে সহ্য করতে হয়।)
.
বেশ কিছুক্ষন নীরব হয়ে বসে থাকলেন আনিমেটর কাতাদা। একসময় আবার ছবি আঁকতে শুরু করলেন।

.
আমি ভাবতে থাকলাম; জীবনের উন্নতি, সমাজের উন্নতি, দেশ, নদী নালা, রঙ্গীন ধান ক্ষেত, হলুদ সর্ষের ক্ষেত, ঢাকা শহরের মিশে যাওয়া খাল বিল, শিমুল ফুলের গাছ, রাতের শিয়ালের ডাক, ভর দুপুরের পাখির গান, টিনের চালে ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ, মুড়ি, সর্ষের তেল আর দেশি পিঁয়াজের ঝাঁঝ, …
.
…আর বাবার কলমের কালি এবং মায়ের সেলাইয়ের সুঁতা দিয়ে স্কুলের খাতার মধ্যে হরেক রকম ডিজাইন তৈরী করে ছোট বোনকে আনন্দ দেয়ার কথা।
.
হঠাৎ করে জানালার ওপাশ থেকে মটর সাইকেলের বিকট শব্দে আমার স্বপ্নের ঘোর কেটে গেল। জানালা খুলতেই দেখলাম অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য গাড়ী। একে অপরকে সরে যেতে বলছে, রিক্সাওয়ালাকে ট্রাফিক পেটাচ্ছে, গাড়ীর ড্রাইভার গাড়ী থেকে নেমে পথচারীর কলার চেপে ধরেছে, ফুটপাথে এক মটর সাইকেল পথচারীদেরকে ধমক দিতে দিতে সামনে এগিয়ে চলেছে। ……
.
…একটি ছোট্ট ছেলে মুখে হাত দিয়ে ফুটপাথে বসে কি যেন ভাবছে ……… …
.
চলবে ইনশা আল্লাহ্‌…
(সংগৃহীত)
.
‘স্বর্গের দিন! স্বর্গের রাত!’প্রথম পর্ব
.
অবশ্যই পড়ুন-
প্রতিযোগিতার দর্শন যেভাবে আত্মহত্যা ডেকে আনে
.
পড়ুন-
কেন জাপানিরা এত আত্মহত্যাপ্রবণ?
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনঃজাপান কেন আত্মহত্যাপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত?

কাজের চাপে মৃত্যু: জাপানের এক অস্বাভাবিক সমস্যা

আরো পড়ুন-
Japan’s youth suicide rate highest in 30 years
Why is Depression So Prevalent in Japan?

আমার প্রিয় মা!

আমার প্রিয় মা!

এই চিঠিটা তোমাকে উদ্দেশ করে লিখিনি। লিখেছি মূলত বাবার জন্যে। বাবার চিঠি তোমায় লিখছি বলে অবাক হচ্ছো? অবশ্যি অবাক হওয়ার মতোই বিষয়। কী করবো বলো? ছোটোবেলা থেকেই তো সব আবদার তোমার কাছেই পেশ করেছি। রাগ বলো আর অভিমান বলো, সবই তোমাকে দেখিয়েছি। বাবাকে কোনোদিনই সাহস করে কিছু বলতে পারিনি। আসলে বাবাকে একটু ভয় পাই কি না, তাই। বাবার কাছে এবার কী আবদার করবো, সেটা জানতে চাচ্ছো? উত্তরটা একটু পরে দেবো৷ আগে তোমায় কিছু কথা বলবো। তুমি মন দিয়ে সেগুলো পড়বে। আমি জানি, কথাগুলো পড়লেই তুমি উত্তরটা পেয়ে যাবে।
.
তোমার হয়তো মনে আছে, আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন আমার গলার স্বর বদলাতে শুরু করলো। আমার মধ্যে অন্যরকম পরিবর্তন দেখা দিলো। আমি বুঝতে পারলাম, আমি বড়ো হচ্ছি। শৈশব পেরিয়ে কৌশরের দিকে এগোচ্ছি। জীবনের এক ধাপ পেরিয়ে অন্যধাপে পদার্পণ করছি। তখন থেকেই মাঝেমধ্যে মনে হতো, কী যেন নেই আমার! তুমি আছো, বাবা আছে, ছোটো বোন আছে, তবুও কী যেন নেই। কোথাও যেন একটু ফাঁকা রয়েছে। শূন্যতা রয়েছে। বিশ্বাস করো মা, এই সমস্যাটা কেবল তোমার ছেলের নয়। প্রতিটি ছেলেই এমন একাকিত্ব বোধ করে। তুমি বাবাকে জিজ্ঞেস করে দেখো, তিনিও আমার মতোই বলবেন।
.
আমাদের আদিপিতা আদম আ.-এর জান্নাতে কাটানো সময়গুলোর কথা মনে আছে? আদম আ.-কে বানানোর পর জান্নাতে রাখা হলো৷ জান্নাতের চোখ জুড়ানো নিআমত প্রদান করা হলো। তবুও কোথায় যেন একটা শূন্যতা অনুভব করতে লাগলেন তিনি। তাঁর শূন্যতা কাটানোর জন্যে হাওয়া আ.-কে সৃষ্টি করা হলো। হাওয়া আ.-কে বানানোর পর আল্লাহ তাআলা কিন্তু বলেননি, “হে আদম! হাওয়া তোমার মায়ের মতো। উনার হক আদায় কোরো।” পরন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁকে আদম আ.-এর অর্ধাঙ্গিনী বানিয়েছিলেন। নিঃসঙ্গ জীবনের সঙ্গী বানিয়েছিলেন। দুঃখ-কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার মতো একজন মানবী হিসেবে সৃষ্টি করেছিলেন।
.
আল্লাহর রাসূল স.-এর নবুয়্যতি জীবনের প্রথম দিকের কথাটা চিন্তা করো। সে কঠিন সময়গুলোতে খাদিজা রা.-এর প্রভাব ছিলো অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি। প্রথম যেদিন ওহি নাযিল হলো, সেদিন রাসূল স. অত্যন্ত ভয় পেলেন। হেরা গুহা থেকে সরাসরি খাদিজা রা.-এর কাছে এলেন। কাঁপতে কাঁপতে খাদিজা রা.-কে সব খুলে বললেন৷ খাদিজা রা. তাঁকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে নিলেন। এরপর কপালে হাত বুলিয়ে বললেন, “আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনাকে কক্ষনো অপমানিত করবেন না। আপনি তো আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করেন। অসহায় দুর্বলের দায়িত্ব বহন করেন। নিঃস্বকে সাহায্য করেন। মেহমানের মেহমানদারী করেন এবং দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন।” (বুখারি : ১/৩) খাদিজা রা.-এর কথা শুনে রাসূল স.-এর ভয় দূর হলো। তিনি দাওয়ার কাজে মনোযোগ দিলেন।
.
মা, তোমার মনে আছে? আমি যখন ক্লাস টেনে পড়ি, বাবা তখন একটু আর্থিক সমস্যায় পড়েছিলেন। সে সময় আমি পড়ার ফাঁকে যখন বেলকোনিতে তাকাতাম, তখন বাবাকে পায়চারি করতে দেখতাম। বাবা যখন পায়চারি করতেন, তখন তুমি চা হাতে বাবার পাশে বসতে। তাকে সান্ত্বনা দিতে। বাবা চুপটি করে চা খেতেন আর তোমার কথা শুনতেন। তোমার কথায় সাহস সঞ্চার করে ঘুমোতে যেতেন। অবশ্যি বাবার মা-ও বেঁচে ছিলেন। কিন্তু কেন জানি তোমার কথা শোনার পরই বাবার মুখে খানিকটা হাসি ফুটতো। মনে পড়ে মা? আসলে এটা আমাদের ফিতরাত৷ সেই আদম আ. থেকে নিয়ে এই পর্যন্ত সকল পুরুষকেই এই ফিতরাত দেওয়া হয়েছে। পুরুষরা নিজের দুঃখ-কষ্টগুলো জীবনসঙ্গিনীর সাথে ভাগ করে নিতে চায়। তারা জীবনসঙ্গিনীর সাথে পথ চলায় আনন্দ পায়।
.
তুমি যেদিন সূরা রুমের ২১ নাম্বার আয়াতটি পড়ছিলে, সেদিন ভেবেছিলাম তোমার সাথে একটু কথা বলবো। কিন্তু লজ্জা সরমের মাথা খেয়ে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারিনি। এখন তো তুমি সামনে নেই, তাই বলছি। ওই আয়াতে আল্লাহ তাআলা কী বলেছেন, জানো? আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
❝আর তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্যে বহু নিদর্শন রয়েছে।❞ (সূরা রুম : ২১)
.
জীবনসঙ্গিনী পুরুষের জন্যে প্রশান্তিকর। কিন্তু সমাজ যখন এই প্রশান্তি পাওয়ার বৈধ পথ রুদ্ধ করে দেয়, তখন মানুষ অবৈধ পথ বেছে নেয়। আমার অনেক সহপাঠীই প্রেম করছে। প্রেমিকাকে নিয়ে ডেটিং করছে, ঘুরতে যাচ্ছে, যিনা করছে। কেন জানো? সেক্যুলার পরিবেশ নারী-পুরুষকে কাছে এনে দিয়েছে। তোমাদের সময়ে নারী-পুরুষের মধ্যে যে দূরত্ব ছিলো, সেটা ঘুচিয়ে দিয়েছে। যার কারণে একে অন্যকে কাছে পেয়ে উদ্দীপ্ত হচ্ছে। কিন্তু ওদের বাবা-মা যখন বৈধ পন্থায় উদ্দীপনা কমানোর পথকে রুদ্ধ করছে, তখন তারা অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছে। এমনসব হারাম কাছে লিপ্ত হচ্ছে, যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।
.
আসলে খিদে তো সবারই লাগে, তাই না? খিদে লাগার সাথে বুজুর্গির তো কোনো সম্পর্ক নেই। হোক সে বুজুর্গ কিম্বা পাপী, পেটে খাবার না ঢুকলে খিদে তো লাগবেই—এটাই স্বাভাবিক। খিদে লাগাটা যেমন স্বভাবজাত বিষয়, তেমনই রমণীর আকর্ষণটাও স্বভাবজাত বিষয়। আল্লাহ তাআলা এই আকর্ষণ দিয়েই মানুষকে সৃষ্টি করেছে। তাই তো ললনারা পুরুষের সংস্পর্শে এসে তৃপ্তি পায়, আর পুরুষরা ললনাদের। উভয়েই একে অপরকে আপন করে নিতে চায়। যত বড়ো আমলদার কিংবা মুত্তাকিই হোক না কেন, সব মানুষের মধ্যেই এই প্রবণতা আছে। সব মানুই বিপরীত লিঙ্গের সংস্পর্শ চায়। বিপরীত লিঙ্গকে আপন করে পেতে চায়। পরস্পরের কাছে আসতে চায়।
.
সমাজ যখন তাদের কাছে আসার বৈধ পথকে অবরুদ্ধ করে, তখন মানুষ অবৈধ পথেই অগ্রসর হয়। আসলে মৌলিক প্রয়োজগুলো এমনই মা। এগুলো পুরো না হওয়া পর্যন্ত মানুষ নিশ্চুপ বসে থাকে না। প্রয়োজনের তাগিদে সে অবৈধ পথেই অগ্রসর হয়। তুমি শুনোনি সেই বিখ্যাত লাইন দুটো—ভাত দে হারামজাদা! নইলে মানচিত্র খাবো! তাই তো ছেলেমেয়েরা আজ তৃষ্ণা মেটানোর জন্যে খারাপ পথে অগ্রসর হচ্ছে। লুত আ.-এর কওমের আমলকে জীবিত করছে। ওদেরকে যদি বৈধ পথে তৃষ্ণা নিবারণের সুযোগ দেওয়া হতো, তবে কি ওরা ওসব করতো? করতো না। কাউকে জোর করেও প্রস্রাব খাওয়ানো যায় না। কিন্তু মরুভূমিতে তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে পানি না থাকলে সে ব্যক্তি প্রস্রাব খেতেও দ্বিধা বোধ করে না। তৃষ্ণা বলে কথা। মেটাতে তো হবেই। আচ্ছা মা, তোমার ছেলেও যদি অবৈধ পথে অগ্রসর হয়, তবে কেমন হবে? তোমার ছেলেও যদি অন্যদের মতো ফাঁকি দিয়ে টাকা এনে গার্লফ্রেন্ডের পেছনে খরচ করে, তখন তোমার কেমন লাগবে?
.
আমি জানি তুমি কষ্ট পাবে। তাই তো তোমার ছেলে ও-পথে যায়নি। অনেক কষ্ট করে নিজেকে ওসব থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু এভাবে কত বছর পার করা যায় বলো? তুমি কি এখনও আমাকে ছোট্ট বাবু মনে করো? সেই কবেই তো তোমার ছেলে যৌবনে পদার্পণ করেছে। ১৭ বছরের মুহাম্মাদ বিন কাসিম যখন বিয়ে করে ভারত জয় করে ফেলেছে, তখনও তুমি তোমার ১৮+ ছেলেকে ছোট্ট বাবু ভেবে বসে আছো। বাহ, খুব চমৎকার! তোমার ছেলে তো যে-কোনো সময় ফিতনাগ্রস্ত হতে পারে। সে তো সেক্যুলার পরিবেশে পড়ালেখা করে, তাই না? তুমি হয়তো জানো না, মেয়েলি ফিতনা এখানে কতটা স্বাভাবিক ব্যাপার। চোখের যিনা থেকে দূরে থাকা কতটা কষ্টের ব্যাপার। অন্তরের যিনা থেকে মুক্ত থাকাটা কত সাধনার ব্যাপার। আচ্ছা মা, তোমার ছেলেকে কি এই অবস্থা থেকে বাঁচাতে চাও না? সত্যি করে বলো তো—চাও কি না?
.
একটি পোশাক আছে, যেটি আপন করে নিলেই তোমার ছেলে এসব থেকে বেঁচে যাবে। তোমার ছেলের নজর হিফাজত হবে। সে অন্তরের যিনা থেকে মুক্ত থাকবে। ললনাদের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে। আল্লাহ তাআলা সে পোশাকটির কী নাম দিয়েছে জানো?
.
❝তারা (নারীরা) তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ।❞ (সূরা বাকারাহ : ১৮৭)
.
আমি এসব থেকে বাঁচতে চাই মা। এমন পোশাক চাই, যে আমার আবরণ হবে। আমাকে যিনা থেকে দূরে রাখবে। গোপন গুনাহ থেকে বিরত রাখবে। হ্যাঁ মা, কেবল সে পোশাকটিই পারে তোমার ছেলেকে পবিত্র রাখতে। সেই পোশাকটিই পারে তোমার ছেলেকে ফিতনামুক্ত রাখতে। রাসূল স. বলেছেন,
❝হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা, বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং যৌনতাকে সংযমী করে।❞ (বুখারি : ৮/৪৬৯৬)
.
যখন আকারে ইঙ্গিতে তোমায় সে পোশাকটি এনে দিতে বলি, তখন তুমি টাকার কথা বলো। আচ্ছা মা, আমাদের নবী স. যখন বিয়ে করেছেন, তখন তাঁর কাছে কী পরিমাণ টাকা ছিলো? উনার তো উল্লেখ করার মতো কিছুই ছিলো না। উনার চেয়ে খাদিজা রা.-এর ঢের বেশি অর্থ-সম্পদ ছিলো। খাদিজা রা. মারা যাওয়ার পর তিনি যখন একাধিক বিয়ে করেন, তখন তাঁর কাছে কী ছিলো? তখন তো অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপ ছিলো। আমাদের নবীজি স.-এর মেয়েকে যখন আলী রা.-এর সাথে বিয়ে দেওয়া হলো, তখন আলী রা.-এর হাতে কী পরিমাণ টাকা ছিলো? কতটা ব্যাংকে উনার অ্যাকাউন্ট ছিলো? কতটা ক্রেডিট কার্ড উনার পকেটে ছিলো? উনার কাছে তো একটি বর্ম ছাড়া কিছুই ছিলো না। শেষমেশ বর্মটিও মোহরানার জন্যে বিক্রি করে দিতে হয়েছিলো।
.
আচ্ছা মা, আমার যদি আরেকটা বোন থাকতো—তবে কি সে টাকার অভাবে না খেয়ে মারা যেতো? সত্যি করে বল তো, টাকাটাই কি প্রধান সমস্যা? যদি তাই হয়, তবে আমার খরচের অর্ধেকটা দিয়ে দিতে আমি রাজি। আর আমি তো পঙ্গু নই। আল্লাহ আমাকে শক্তি দিয়েছেন, মেধা দিয়েছেন। আমি কোনো না কোনো পথ করেই নেবো। সত্যি কথা বলতে কী, টাকাটাই প্রধান সমস্যা নয়। আমি যেদিন প্রাইভেট মেডিক্যালে ভর্তি হওয়ার কথা বলেছিলাম, সেদিন তো তুমি রাজি হয়েছিলে। আমি বলেছিলাম, এত টাকা কোত্থেকে আসবে? তুমি বলেছিলেন, ও তোকে ভাবতে হবে না। তুই মন দিয়ে পড়াশোনো কর। তাহলে টাকার সমস্যা যে সত্যিকার সমস্যা না, সেটা বুঝতে কি আমার কষ্ট হবে? আসল সমস্যা কোথায় জানো? সমস্যা হলো, তুমি তোমার ছেলের অবস্থাটা বুঝতে চেষ্টা করছো না। তার আর্তনাদ তোমার কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। আর পৌঁছলেও তুমি শুনে না শোনার ভান করছো। আসলে তোমার সদিচ্ছা নেই মা। তুমি যদি দেখতে ‘Got married’ এর স্ট্যাটাসে অবিবাহিত ছেলেদের কতটা লাইক পড়ে, তবেই হয়তো আমার না বলা কথাটা বুঝতে পারতে।
.
প্লিজ মা, ভুল বুঝো না। ভেবো না, আমি তোমায় বাদ দিয়ে কেবল জীবনসঙ্গিনীর জন্যে পাগলপারা হচ্ছি। আল্লাহর শপথ! তুমি যদি না থাকতে, তবে তো আমি আঁধারে হারিয়ে যেতাম। না হাঁটতে পারতাম, না চলতে পারতাম, আর না এই অবস্থানে আসতে পারতাম। আল্লাহ তো তোমার মাধ্যমেই আমায় দুনিয়ার আলো দেখিয়েছেন। তোমার মাধ্যমেই সেই ছোট্ট বাবু থেকে আজকের তাগড়া জোয়ান বানিয়েছেন। তোমার অবদান আমি কী দিয়ে শোধ করবো মা? তোমার ঋণ শোধ করার মতো সাধ্যি কি আমার আছে?
.
কিন্তু তবুও…একটু বোঝার চেষ্টা করো। তোমার সাথে কথা বলার একটা সীমা আছে, যে সীমার বাইরে কিছু বলা যায় না। তোমার-আমার মধ্যে একটা রেড লাইন আছে, যে লাইন অতিক্রম করা যায় না। তাই এমন কাউকে দরকার, যার সাথে কোনো সীমা থাকবে না, কোনো রেড লাইন থাকবে না। যাকে সব বলা যাবে। যে আমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হবে। আমার সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেবে। আমার সাথে মিষ্টি দুষ্টুমি করবে। আমাকে মধুর যন্ত্রণা দেবে। চক্ষুকে শীতল করবে।
.
একজন ভালো সঙ্গিনী পুরুষকে অনেকদূর এগিয়ে দিতে পারে৷ অন্ধকার পথে আলোক জ্বালিয়ে সাহস সঞ্চার করতে পারে। বাবা তো মাঝেমধ্যেই বলেন, ‘তোর মা না থাকলে আমার জীনবটা এত গোছালো হতো না।’ আসলেই মা, বাবা বিন্দু পরিমাণও মিথ্যে বলেননি। জীবনসঙ্গিনীর সাথে এমন কিছু শেয়ার করা যায়, যা অন্য কাউকেই বলা যায় না। এ সত্যিটা তো তুমিও জানো। তবুও কেন যে আমার বেলায় এটা বুঝতে চাও না, আমি জানি না। আমি সত্যিই জানি না।
.
মা তুমি ভালো থেকো। বাবাকে আমার সালাম দিও। আর তোমার ছেলেটাকে একটু বুঝতে চেষ্টা কোরো।
ইতি
তোমার খোকা

====
লেখকঃ জাকারিয়া মাসুদ (https://www.facebook.com/JakariaMasudOfficial)

হয়নি যাবার বেলা (প্রথম কিস্তি)

হয়নি যাবার বেলা (প্রথম কিস্তি)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

তরুণ বয়সটাতে মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়না সে স্বপ্ন যতো অবাস্তব আর অসম্ভব হোকনা কেন! স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনায় দগ্ধ হবার অভিজ্ঞতা থাকেনা তাই মানুষ প্রচন্ড সাহসী থাকে। যৌবনের প্রথম শৈশবেই যৌবনকে বাজি ধরে জীবনের অসাধারণ স্কেচ আঁকে। তরুণ দু’চোখের সীমিত রেটিনায় সেই স্বপ্নের কোনো খুঁত ধরা পড়েনা। মারাত্মক উজ্জ্বল রঙের সেই স্কেচ বিবর্ণ হয়ে যেতে শুরু করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই। সবার ক্ষেত্রে অবশ্য হয়না, তবে ব্যতিক্রম তো আর উদাহরণ হতে পারেনা। অভিজ্ঞতার বলিরেখা স্বপ্নকে শীর্ণ করে দেয়। মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়। অনেক ভ্যারিয়েবল নিয়ে ভাবে, যদি এটা হয়, যদি এটা না হয়…। স্বপ্নভঙ্গের তীক্ষ্ণ যন্ত্রণার স্বাদও সে পেয়ে যায়। সব মিলিয়ে এক বীভৎস অবস্থা। মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়, স্বপ্ন দেখতে চায়না, অন্যকেও দেখতে দেয়না।
.
ভাইয়া দেখ, খুব মন খারাপ নিয়ে লিখাটা লিখছি। তোমাদের বয়সে আমিও স্বপ্ন দেখব বলে দু’চোখ পেতেছিলাম। আমারো একটা স্বপ্ন ছিল আর এখন স্বপ্নভঙ্গের বেদনাও আছে। আমি তোমাদের দুর্দান্ত দুর্দান্ত সব স্বপ্ন দেখতে নিষেধ করবনা, তবে কীভাবে, কোন পথে হাঁটলে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পুড়তে হবেনা তা নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করব ইনশা আল্লাহ্‌। তোমরা এখন যে পথের পথিক, সেই পথে হেঁটে ক্ষত বিক্ষত আমার দু’পা। চোরাবালি আর কাঁটাঝোপ গুলো চিনেছি একটা একটা করে, বুঝেছি কেন স্বপ্ন আহত হয় ক্ষণে ক্ষণে, তারপর একসময় নিহতই হয়ে যায়।
.
কেন স্বপ্নেরা মরে যায়, কেন উদীয়মান নক্ষত্ররা ঝরে যায়? ড্রাগস, প্রেম এই কালপ্রিটগুলোর কথা সচরাচর সামনে আসে। অভিভাবকেরা এগুলো নিয়ে কথা বলেন তাদের সন্তানদের সঙ্গে। মেনে চলতে না পারলেও (যেমন প্রেম) মোটামুটি সবাই সতর্ক থাকে বা মনের মধ্যে একটা খচখচানি থাকে। এই লিখায় আমরা আলোচনা করব এমন কিছু বিষয় নিয়ে যেগুলো সাধারণত সেরকমভাবে টাইমলাইটে আসেনা, না আসাটাও স্বাভাবিক। এগুলো বর্তমান অস্থির সময়ের নবউদ্ভূত সব সমস্যা। আমাদের বাবামার বা বড়ভাইবোনদের জেনারেশনদের অনেকেরই এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র কোনো ধারণা নেই।
(প্রেম সংক্রান্ত ব্যাপারস্যাপারগুলো আলোচনা করা হয়েছে এই সিরিজে- আততায়ী ভালোবাসা-http://lostmodesty.com/2018/09/আততায়ী-ভালোবাসা-প্রথম-পর/)
.
ভার্সিটিতে পা দেওয়া একটা ছেলে বা মেয়ের লাইফ স্টাইল কীরকম ? কীভাবে তারা চিন্তা করে?
.
কিছু ব্যতিক্রমবাদে মোটামুটি সবাই একটা ছকেঁবাধা জীবন যাপন করে। কিছুটা স্বকীয়তা নিয়ে ভার্সিটিতে আসলেও সেটি হারিয়ে ফেলতে খুব বেশি সময় লাগেনা পরিবেশের প্রেসারে। সবারই ছোট বড় একটা ফ্রেন্ড সার্কেল থাকে। ছেলেমেয়ে মিলিয়েই ফ্রেন্ড সার্কেল, আলাদা আলাদা না। এদের সাথে ফুটপাথে,গাছতলায়, ক্লাসরুম,লাইব্রেরির বারন্দায় রেস্টুরেন্ট এ আড্ডা দেওয়া, গিটার বাজিয়ে গান গাওয়া, দুই তিনমাস অন্তর অন্তর বান্দরবন,কক্সবাজারে ফ্রেন্ড সার্কেলের সব ছেলেমেয়ে একসাথে ট্যুর দেওয়া, গার্লফ্রেন্ড,বয়ফ্রেন্ড নিয়ে রেস্টুরেন্ট, দিয়াবাড়ি টাইপ জায়গা, রিকশায় হুড তুলে ডেটিং, ফেসবুকে এ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে তোলা ছবি আপলোড, কমেন্টে প্রশংসার বন্যা …। জাতে ওঠার জন্য ইংলিশ, কোরিয়ান সিরিয়াল, প্র্যাংক ভিডিও দেখা, ইপিএল, লা লিগা নিয়ে তুখোড় বিশ্লেষনে ফেসবুক কাঁপিয়ে ফেলা, আর্টসেল, তাহসান, মেটালিকায় বুঁদ হয়ে যাওয়া, গুরু জেমসের কনসার্টে উদ্দাম নাচানাচি, ফিফা, কল ওফ ডিউটি নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা পড়ে থাকা … মোটামুটি এই হল তাদের জীবন। তাদের এই জীবনের অনেক উপাদানই তারা নিজেরা বেছে নেয়নি-মিডিয়া,ফোনকোম্পানিগুলো, পাশ্চাত্য সভ্যতা তার ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। ইয়াবা,গাজা, লিটনের ফ্ল্যাট ব্যাপারগুলো আর না আনি। এগুলো তাদের লাইফস্টাইলের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তবে আমরা শুরুতেই বলেছি এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা আমাদের এই লিখার উদ্দেশ্য না।
.
এই ‘প্যারা নাই চিইল’ লাইফ লিড করতে যেয়ে পড়াশোনাটা আর ঠিকমতো করা হয়ে ওঠেনা। মাঝে মাঝে যে মন খারাপ হয়না, পড়তে বসতে ইচ্ছে করেনা সেটা নয়, তবে প্যারা নাই চিইল লাইফ লিড করার প্রেসারে এই মন খারাপটুকু পাত্তা পায়না। ভার্সিটির একদম প্রথম দিন থেকেই ‘পচানির’ তীব্র,আগ্রাসী যে কালচারের মুখোমুখি হতে হয় একজন তরুণ, তরুণীকে সেটা সহ্য করে নিজের স্বকীয়তা নিয়ে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। সব যায়গাতেই পচানি। উঠতে বসতে পচানি।
.
ভার্সিটিতে আসার প্রধান উদ্দেশ্যই তো ছিল কিছু শেখা, পড়াশোনা করা। কিন্তু মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করলে, স্যারদের প্রশ্ন করলে, সন্ধ্যায় হলে ফিরে পড়ার টেবিলে বসলে শুনতে হয় টিটকিরি। ব্যাটা একটা আঁতেল , জীবনকে উপভোগ করতে পারবেনা, আতঁতলামি করতে করতেই পটল তুলবে…’ এই আঁতেল আঁতেল পচানি খেতে খেতে একসময় পড়াশোনায় সিরিয়াস ছেলেমেয়েগুলো উদাসীন হয়ে যায়, ক্লাসনোট ঠিকমতো তোলেনা, সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে বসেনা। রেজাল্ট খারাপ করা শুরু করে।
.
অনেককেই এরকম হতে দেখলাম, আমি নিজেও এর কিছুটা ভুক্তভোগী। ভাই দেখ তোমাকে যতোই আঁতেল আঁতেল বলে পচাকনে কেন, কানে তুলবেনা পচানি, জানি এটা করা খুবই কষ্টকর। কিন্ত চেষ্টা করো,পারবে তাদের পচানি উপেক্ষা করতে। তাদের টিটকিরি,পচানো শুনে যদি তুমি পড়াশোণা বন্ধ করে দাও তাহলে ক্ষতিটা ওদের হবেনা, ক্ষতি তোমারই হবে। যে যাই বলুক, তুমি নিয়মিত পড়াশোনা করা, ক্লাসে মনোযোগী থাকা বন্ধ করোনা। আমাদের যেই ছেলেগুলোকে আঁতেল বলে পচাতো সবাই, কিন্তু শত পচানি সত্ত্বেও পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছিল , তাদের মোটামুটি সবাই আজ বেশ ভালো ভালো জায়গায় রয়েছে।
.
আরেক ধরণের পচানি আছে। এ পচানির নাম -গাইয়া/ক্ষ্যাত পচানি। শহরের ছেলেমেয়েও এই পচানি খায় তবে গ্রাম বা মফস্বল থেকে আসা ছেলে মেয়েদের এই পচানি বেশি খেতে হয়। একটু আগে যে লাইফস্টালের কথা বললাম সেই লাইফস্টালের কোনো উপাদান কারো জীবনে না থাকলে গাইয়া/ক্ষ্যাত উপাধি পেতে হয়। কোরিয়ান,ইংরেজি সিরিয়াল না দেখে বাংলা সিরিয়াল দেখলে, হলিউডের মুভি না দেখে কলকাতার মুভি দেখা মানে তুমি একটা গাইয়া। তুমি বাংলিশ ভাষায় কথা বলতে পারোনা, আইতাছি,খাইতাছি,করতাছি করতে পারোনা মানে তুমি একটা ক্ষ্যাত। তুমি দামী স্মার্ট ফোন ব্যবহার করোনা মানে তুমি আনস্মার্ট, তোমার প্রেস্টিজ নেই। ফুটবলের কোনো খবর রাখোনা, ফাস্টফুডের অনেক আইটেম তুমি চেখে দেখনি, পিংক ফ্লয়েডের টিশার্ট পরোনা, চে গুয়েভরার ক্যাপ মাথায় দিয়ে ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মতো তুমি বিপ্লব বিপ্লব মারাওনা তার মানে তুমি ক্ষ্যাত । মেয়েদের সঙ্গে মিশতে অস্বস্তিবোধ করো, ছেলেমেয়ে একসঙ্গে ট্যুর দিতে চাওনা তার মানে তুমি একটা ভোদাই। এই ক্ষ্যাত , ভোদাই আর গাইয়া পচানি কতো ছেলেমেয়ের জীবন নষ্ট করে দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।
.
এদের ধরে ধরে আমার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে এই যে ভাই, তুমি মাই লাইফ মাই রুলস বলে অহংকার করছো, তোমার মতো জীবন যাপন করেনা দেখে আরেকজনকে নির্দ্বিধায় গাইয়া,ক্ষ্যাত বানিয়ে দিচ্ছ তুমি কি কখনো ভেবে দেখেছে তুমি কার জীবন যাপন করছ? তোমার নিজের ? নাকি আরেকজনের বেঁধে দেওয়া জীবনে তুমি অভিনয় করছ? তুমি আরেকজনের হাতের পুতুল- যদি ফেসবুকে ক্লাসে ফাঁকি দেওয়া, ক্লাসে ঘুমানো প্রিপারেশন ছাড়া পরীক্ষা দেওয়াকে এতো গ্লোরিফাই না করা হতো, কুল ডুডস হবার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা না করা হতো তাহলে তুমি কি এগুলো করতে ? যদি মোবাইল কোম্পানিগুলো তোমাকে না শেখাতো জাস্টফ্রেন্ডদের (ছেলে মেয়ে একসঙ্গে, কোনো ব্যাপারনা) নিয়ে একসঙ্গে ট্যুরে যেতে হবে, একই হোটেলে একই রুম শেয়ার করে থাকতে হবে তাহলে কি তুমি এগুলো করতে ? যদি ফেসবুকে গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে ঘন ঘন দামি রেস্তোরায় সেলফি না দিলে জাতে উঠতে পারবেনা, সবাই ব্র্যান্ডের জামাকাপড় পরে,মাঞ্জা মেরে ছবি দেয় আমি না দিলে কেমন হয়’ এই প্রেসারগুলো যদি না থাকতো তুমি কি এতো কষ্ট করে টিউশানি করে, বাবা মার পকেট কেটে করে ঘন ঘন গার্লফ্রেন্ডে নিয়ে খেতে যেতে? ব্র্যান্ডের জামা কাপর কিনতে সব সময়? নিজের ইচ্ছেয় তুমি কি কি করো? আর জাতে ওঠার জন্য, ভাব মারার জন্য, অন্যরা কি ভাববে সেইটা ভেবে চিন্তিত হয়ে কি কি করো তার তালিকা করে দেখ- হিসেব মেলে কিনা!
.
ভাই তুমি আসলে সম্পূর্ণরূপে ব্রেইন ওয়াশড। মিডিয়া, এই সমাজ, সভ্যতার দ্বারা তুমি মগজধোলাইয়ের শিকার। তুমি অন্ধ। তুমি দাস।
.
এই জীবনে কি তুমি সুখী? তুমি কি হতাশার চাষাবাদ করোনা? তুমি কি অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো মনের মধ্যে চাপা দিয়ে রাখোনা ? ভবিষ্যতের চিন্তা করতে তুমি ভয় পাও। সিগারেট, গাঁজার আগুনে তুমি তোমার দুঃখগুলো পোড়াতে চাও। জাস্টফ্রেন্ডকে ভেবে বাথরুমে নিজের ওপর অত্যাচারের জীবনটাতে তুমি খুশি? রিকশা বিলাস আর লিটনের ফ্ল্যাটের অভিসার, এবোরশনের চিন্তা, একটার পর একটা গার্লফ্রেন্ডে পালটানো তোমাকে শান্তি দিয়েছে?
.
অথচ তোমার এই ‘ফেসবুকে সুখী কিন্ত বাস্তবে দুঃসহ’ জীবন যাপন করেনা জন্যেই তুমি আরেকজনকে গাইয়া/ক্ষ্যাত বলছো। তার জীবনটাকে নরক গুলজার করে ছাড়ছো। উঠতে বসতে, চলতে ফিরতে খেতে ঘুমাতে তোমার পচানি খেতে খেতে তারা নরক যন্ত্রণা ভোগ করে। নিজেদের গুটিয়ে নেয়। ভেতরে গুমরে গুমরে মরে, বাথরুমে কাঁদে। পড়াশোনার ক্ষতির কথা বলাই বাহুল্য, অনেক ছেলেমেয়ে এই মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ভার্সিটি ছেড়ে দেয়, ঢাকা ভার্সিটির এক ছেলে আত্মহত্যা করেছিল এ কারণে এমন সংবাদও একবার চোখে পড়েছিল। তুমি নিজের অজান্তেই কতো ছেলেমেয়ে তাদের বাবা মা পরিবারের স্বপ্ন নষ্ট করেছে, ভেবে দেখেছো?
.
এই যে এখন তুমি আরেকজনকে গাইয়া, ক্ষ্যাত বলে পচাচ্ছো, খুব মুভি সিরিয়াল, বন্ধু আড্ডা গান, ব্যাচট্যুর, রেস্টুরেন্ট, গারলফ্রেন্ড মারাচ্ছো, তোমার রেজাল্টের কী অবস্থা? তোমার কি কি স্কিল আছে? শুদ্ধ করে বাংলা বা ইংরেজি বলতে পারো? লিখতে পারো ? পাস করে যখন বের হবে তখন চাকুরী পাবে ? চাকুরী না পেলে আর এইসব মুভি সিরিয়াল, বন্ধু আড্ডা গান থাকবেনা, ফ্রেন্ডস অফ বেনিফিটসরা হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে, টিকির নাগালো পাবেনা, হতাশার সাগরে হাবুডুবু খাবে আর আফসোস করবে।
.
যাই হোক তুমি নিজে যদি কখনো এরকম পচানির শিকার হও, তাহলে খুঁজে দেখ তোমার আশেপাশে কোনো হুজুর ছেলে বা মেয়ে আছে কিনা (মেয়েদের জন্য)। তাদের সঙ্গে তুমি এই কষ্টগুলোর কথা শেয়ার করো। তাদের সাহায্য চাও। তাদের সঙ্গে বেশি বেশি মেশো। চলাফেরা, খাওয়া দাওয়ার, কথাবার্তার কিছু কিছু আদব থাকে। তাদের কাছ থেকে শিখে নাও। ইনশা আল্লাহ্‌ হুজুর ছেলে বা মেয়েগুলো তোমাকে সাহায্য করবে। তোমাকে নিরাশ হওয়া লাগবেনা। যেই পোলাপানগুলো তোমাকে বেশি পচানি দেয়, তাদের সঙ্গে একাকী কথা বলতে পারো। তাদের বোঝাতে পারো তাদের এই আচরণগুলো তোমাকে কতোটা কষ্ট দিচ্ছে। একটু ভালোমতো বুঝাতে পারলেই তারা বুঝবে ইনশা আল্লাহ্‌।

.
বেশ বড়সড় একটা ক্ষতি করে ফেলে মোটিভেশনাল স্পীকাররা । পড়াশোনার সাথে নূন্যতম সম্পর্ক নেই এমন পোলাপান যখন পরীক্ষায় ফেইল করে পড়ার টেবিলে ফেরত আসতে চায়, তখন এই গলাবাজরা কুমন্ত্রণা ঢালে পোলাপানের কানে। আরে দুই একটা ফেইল না করলে হয়- এইযে বিলগেইটসকে দেখ পরীক্ষায় ফেইল করেছে, স্টিভ জবসকে দেখো সে তো ভার্সিটি ড্রপ আউট… এরকম মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে পোলাপানের মধ্যে ‘ ফিল গুড’ টাইপের একটা অনুভূতি নিয়ে আসে। পোলাপান ভাবে তাইতো, পড়াশোনা করার কি দরকার- আমি বিল গেইটস হবো, আমি স্টিভ জবস হবো, পরীক্ষার আগে আগে ভাবে- এ সিঙ্গেল শিট অফ পেপার ক্যান্ট ডিসাইড মাই ফিউচার- এতো প্রেসার নেবার কি দরকার এগুলো ভেবে নিজেকে সান্তনা দেয়। বাস্তবতার মুখোমুখি হতে ভয় পায়। মোটিভেশন স্পীচ ড্রাগের মতো হয়ে গিয়েছে। মোটিভেশনার স্পীকাররা বাস্তবতা ভুলিয়ে দেয়, কাককে কোকিল আর ময়ূর হবার স্বপ্ন দেখিয়ে একগাদা টাকা আর তালি বগলদাবা করে ঘরে ফিরে।
.
সব মানুষের পক্ষেই স্টিভ জবস বা বিল গেইটস হওয়া সম্ভব নয়। যদি পরীক্ষায় ফেইল করা বিলগেইটস হবার পূর্বশর্ত হতো তাহলে বাংলার ঘরে ঘরে বিলগেইটস থাকতো। পোলাপান এই মিথ্যে সান্তনায় নিজেকে ভুলিয়ে তাদের প্যারা নাই চিইল লাইফে আবার ফেরত যায়। পোলাপান স্টিভ জবস বা বিল গেইটস হতে চায় কিন্তু তাদের মতো কাজ করেনা, তাদের মতো নিজের স্বপ্নের পেছনে সময় ব্যয় করেনা, মন প্রাণ ঢেলে কাজ করেনা। তাহলে কীভাবে সফল হবে? কীভাবে নিজের বুকের কোণে সযত্নে রাখা স্বপ্নটাকে আকাশের মতো বিশাল করবে ? সারা দুনিয়ার মাঝে ছড়িয়ে দেবে? পড়াশোনা করতে তোমার ভালো লাগেনা ঠিক আছে, তোমার স্বপ্ন নিয়ে তুমি কাজ করো। তুমি পড়াশোনার কথা বললে বলবা যে আমার এসব ভালোলাগেনা, আমি নিজের মতো করে কিছু করব, আবার নিজের স্বপ্নের পেছনেও সময় দাওনা, চিইল করে করে উল্টায়া ফেলো, তাহলে চারবছর শেষে একটা লো সিজিপিএ আর একরাশ হাতাশা ছাড়া তোমার কপালে কিছু জুটবে? । তুমি কাক, কাকই থেকে যাবে, না হতে পারবে ময়ূর না হতে পারবে কোকিল।
.
নিজের স্বপ্নের কথা বলতে আরেকটা কথা মনে পড়ে গেল। আরেকটা ফাঁদ- উদ্যোক্তা হবার, ব্যবসা করার ফাঁদ। প্রথম থেকেই চাকুরী তোমার কাছে মনে হয় গোলামি। তুমি তাই উদ্যোক্তা হবে, ব্যবসায়ী হবে। তাই চারবছর পড়াশোনা নিয়ে সিরিয়াস থাকলেনা। চিইল আর এঞ্জয় করে গেলে। বের হবার পর এখন তোমার সময় হলো মাঠে নামার। প্রথম ধাক্কাটা আসবে পরিবার থেকে। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এখনো জাতে ওঠার জন্য ব্যবসা বা উদ্যোক্তা ভালো কোনো অপশন নয়। ‘ছেলে কি করে’ সমাজের এই প্রশ্নের উত্তরে ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা খুব ভালো উত্তর নয়। বাবা মা তোমাকে প্রবলভাবে বাঁধা দিবে। তুমি সেই বাঁধাতে টিকতেই পারবেনা। উদ্যোক্তা হবার স্বপ্ন ভুলে বিসিএস পড়তে বসতে হবে, লো সিজিপিএর, স্কিল না থাকার কারণে অন্যান্য চাকুরী পেতে সমস্যা হবে। ঘুরে ফিরে সেই হতাশা আর হতাশা।
.
ধরো বাবা মা রাজি হলো। তুমি কোনো প্রজেক্ট নিয়ে মাঠে নামলে। হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করলে উদ্যোক্তা হবার কি কষ্ট, কতো পরিশ্রম, কতো মানসিক শক্তির দরকার। প্রথম অবস্থাতে লাভের মুখ খুব বেশি দেখবেনা, রাতারাতি কাড়ি কাড়ি টাকা কামানোর আরাম আয়েশের যে স্বপ্ন ছিল তা অনেকটাই ফিকে হয়ে যাবে। লস হলে তো কথায় নেই, তুমি সব কিছুতে ইস্তফা দিয়ে ঘরে ফিরে আসবে। সঙ্গী ? একটা লো সিজিপিএ আর তীব্র হতাশা । অনেকেই যে সফল উদ্যোক্তা হয়না সেটা না। কিন্তু তাদের মানসিক শক্তি, সংকল্প থাকে অন্য মাত্রার। শুরু থেকেই তাদের কংক্রিট একটা প্ল্যান ছিল। তুমি উদ্যোক্তা হতে চাও, ব্যবসায়ী হতে চাও, ভার্সিটিতে থাকা অবস্থাতেই শুরু করে দিতে সমস্যা কী? কেন এভাবে নিজেকে ভুলিয়ে রাখছো চার বছর? কেন নিজের পায়ে নিজে কুড়োল মারছো?
.
ভাই, তুমি বিল গেইটস হও, স্টিভ জবস হও, নিজের স্বপ্ন নিয়ে কাজ করো, উদ্যোক্তা হয়, হালাল হারামের সীমার মধ্যে থেকে চিল করো কোন সমস্যা নেই। শুধু একটু পড়াশোণা করো নিয়মিত। যে স্যারের ক্লাসগুলো করতে ভালো লাগে সেই স্যারের ক্লাসগুলো করো , সব ক্লাস করতে হবেনা, উইকেন্ডের একটা দিন ক্লাসনোটগুলাতে চোখ বুলাও, কুইজ বা ক্লাস টেস্টগুলো একটু পড়ে দাও। তাহলে দেখবে তুমি মোটামুটি নিজের ভেতর কিছু মালপানি নিয়ে বের হচ্ছো চারবছর পর। খুব বেশি সময় কিন্তু লাগেনা, অতি অল্প সময়ের একটু পড়াশোনা, এক সপ্তাহে এক দুই ঘন্টার পড়াশোনা তোমাকে রাখবে স্বপ্নপূরণের পথে।
.
চলবে ইনশা আল্লাহ্‌ …

ইউটিউব লিংক-https://m.youtube.com/watch?v=1fhMLMgEajA

‘স্বর্গের দিন! স্বর্গের রাত!’ (প্রথম পর্ব)

‘স্বর্গের দিন! স্বর্গের রাত!’ (প্রথম পর্ব)

এক বছরের বেশি হয়ে গেল আমার প্রবাস জীবনের – জার্মানির হামবুর্গ শহরে। হামবুর্গ আন্তর্জাতিক শহর – ১৮০ এর বেশী দেশের মানুষের এখানে বসবাস। এখানে আসার আগে মাত্র একজন বাংলাদেশীকে চিনতাম, তার উপর হামবুর্গে বাংলাদেশীর সংখ্যা হাতেগোনা হয়ার কারনে প্রথম থেকেই বিদেশি বন্ধবান্ধব জুটে জায়, এদের সাথেই উঠাবসা চলে। পূর্বের চায়না থেকে পশ্চিমের আমেরিকা – সবার সাথে মেশার সুযোগ হয়েছে…ইংলিশটা ভাল হয়ার কারনে অনেক জার্মান বন্ধুও জুটেছে (হাম্বুরগের জার্মানরা তাদের ইংলিশ এর উন্নতির বেপারে খুবই সচেতন :D)….উইকেন্ডের সারা রাত জেগে জীবন ভিত্তিক আড্ডাও হয়েছে। সব মিলিয়ে আমি বলব গত এক বছর আমার জীবনের সবচেয়ে শিক্ষামূলক সময় কাটিয়েছি – বেশ কিছু জিনিশ উপলব্ধি করেছি….
.
ছোটবেলায় আমার কাজিনের (Tamal vai)কল্যাণে হলিউড মুভি দেখা হয়েছে অনেক। মুভি দেখতাম আর আফসোস করতাম – ইশ!! কেন যে আমেরিকা-ইউরোপে জন্ম হলনা!!! কত সুন্দর বাল্যকাল কাটাতাম!!! স্কুল থেকে প্রতি বছর অন্য দেশে ট্রিপে নিয়ে যেত, সামারে বনেবাদারে ক্যাম্পিং করতাম, শীতকালে উইন্টার স্পোর্ট করতাম, ১৩-১৪ বছর বয়স থেকে গার্লফ্রেন্ড থাক্ত, ১৬ বছর থেকে পার্টটাইম কাজ শুরু করে টাকা জমায় ২০-২১ বছরে ওয়ার্ল্ড ট্রিপ দিতাম! what a life that would have been……অনেক রাগ ছিল বিধাতার উপর…গরীব দেশে জন্ম দেয়ার কারনে।
.
আজ আমি এক বছর প্রবাস জীবন কাটানোর পর প্রতিদিন একবার আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায করি, গরীব-মুসলিম দেশে জন্ম দেয়ার কারনে……একটু ব্যাখা করার চেষ্টা করি, কেন এই উপলব্ধি।
.
জার্মানি আসার আগে জার্মানির উপর কিছু আর্টিকেল পড়েছিলাম। এমন একটা আর্টিকেল এ ছিল লাভ ইন জার্মানি এর উপরে। আর্টিকেলের একটা জিনিস বেশ অবাক লাগসে – জার্মানরা “আমি তোমাকে ভালবাসি” – এই কথাটা পারত পক্ষে বলে না। ২-৩ বছরের সম্পরকের পর ও ওরা ভালবাসার কথা এরায় চলে। প্রথমে বিশ্বাস করি নাই। এখানে এসে জার্মানদের সাথে মিশার পর, বেশ কিছু জার্মান ফ্যামিলির কাছ থেকে দেখার পর ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পারসি।
.
এখানে বিয়ে ৪-৫ বছরের বেশি টিকে না। অধিকাংশ ফ্যামিলি বাচ্চা ছোট থাকা অবস্থায় ভেঙ্গে যায়। এর ফলে যেটা হয় যে, বাচ্চা ছোট বয়স থেকেই দেখে যে বাবা-মা দুই জনের কাছেই কয়েক মাস পর পরই গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড আসতেসে…কেউই স্থায়ী হয় না। ছোট বেলা থেকেই একটা শিক্ষা ওরা নিয়ে নেয়, “মানুষ আসবে মানুষ যাবে”। যার কারনে অটমেটিকালি মানসিক আত্মরক্ষা এর কারনে ওরা কোন মানুষের প্রতি ইমশোনাল ডেভেলপমেন্ট করতে পারে না। কারন আনকনশাসলি ওরা এটা ধরেই নেয় যে, কেউই বেশিদিন থাকবে না। তার উপর ১৩-১৪ বয়স থেকেই ফিসিকাল রিলেশনশিপ শুরু করে দেয় – ভালবাশা এর জন্য না, আসলেই ফিসিকাল কিউরিসিটি থেকে এবং প্রতি বছর নতুন নতুন। যার কারনে নারীপুরুষ সম্পর্কের ভিতর ওদের কাছে কোন কিছু বাকি থাকে না। যার ফলে ওরা পুরা নারীপুরুষ সম্পর্কের বিষয়ে ইন্সেন্সিটিভ হয়ে যায়।
.
একটা এক্সামপল দেই, এখানে ছেলে-মেয়ে বন্ধু (শুধু বন্ধু)একসাথে ঘুমায়…কোনরকম সমস্যা ছাড়া। গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ডকে জিজ্ঞাসা করা, কার সাথে চ্যাট করতেসে, কারসাথে পার্টিতে যাচ্ছে – এগুলো রুড।
রিলেশনশিপ ওদের কাছে নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হয়া, নতুন শরীর এর অনুভূতি নেয়া মাত্র……ভালবাসা এর অনুভূতি এক অবাস্তব বিষয়। বলিঊডের মুভি দেখে প্রচণ্ড অবাক হয় – সত্যিই কি ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টের মানুষরা এতোটা রোমান্টিক??? এতো অনুভূতি ওদের আসে কোথা থেকে???
.
আরেকটা বিষয় হল কালেক্টিভিসম অ্যান্ড ইন্ডিভিডুয়ালিসম। গরীব দেশের সমাজ কালিক্টিভিস্টিক হয় সারভাইভাল এর জন্য। কারন সরকার সমাজ সবসময় ব্যাসিক নিড ফিলাপ করে না। যার কারনে আমরা ছোটবেলা থেকেই পরিবার, বন্ধু, ভালোবাসার মানুষ এর জন্য স্যাক্রিফাইস করা শিখি…এটাইতো ভালবাসা, অনুভূতির জগতের ব্যাসিক।
.
আর একটা ইন্ডিভিডুয়ালিস্টিক সোসাইটিতে স্যাক্রিফাইস এর কন্সেপ্টটা অচেনা……একানকার মোটো হল – “তোমার জীবন এটা, তাই কর, যেটা শুধু তোমার জীবনের জন্য ভাল”। যার ফলে প্রতিটা মানুষ বাচে শুধু নিজের জন্য-আমাদের জন্য যেটা সায়েন্স ফিকশন, কল্পনার বাইরে। একারণে পরিবার-ভালবাসার মধ্যে এইধরনের প্রশ্ন খুবই কমন – “ও কি আমাকে সুখী করছে? ওকেই কি আমি চাই? আমার বাবা-মা এর সাথে থাকার কারনে আমার বযক্তিগত জীবন কি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে?”- পুরো জীবন জুরেই এইসব প্রশ্নের উত্তর খুজতে খুজতে চলে যায়…অনুভব আর করা হয় না। ওরা খুবই অবাক হয় শুনে, যখন আমি বলি, আমাদের প্রশ্নগুলো পুরো উল্টো – আমারা চিন্তা করি আমার আমাদের বাব-মাকে সুখী করতে পারছি কিনা, ভালবাসার মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে পারছি কিনা…
.
আর সবথেকে বড় বিষয় হল, গডলেস সোসাইটিতে বড় হবার কারণে শিখে, এই জীবনটাই আসল, এরপর আর কিছু নাই, সব শেষ! সব মানুষের পক্ষে তার এইধরনের বাস্তবতা মেনে নেয়া কঠিন। হার্টে সত্তের অপূর্ণতা থেকেই যায়।
.
মজার একটা বিষয় হল ছোটবেলা থেকেই এতোটা রোবোটিক যে, এখানে আপনি জার্মান কোন বাচ্চাকে কাঁদতে দেখবেন না। রাস্তায় যদি কোন বাচ্চার কান্না শুনেন, তাহলে চোখ বন্ধ করে বুঝে নিবেন টার্কিশ বা আরব বাচ্চা। আমি এখন পর্যন্ত একটা জার্মান বাচ্চাকে কান্তে দেখি নাই…সত্তি!!!!!!!!
.
আমার এই অভিজ্ঞতার পর ছোটবেলার ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডের প্রতি হিংসা, ওদের প্রতি করুণায় পরিণত হয়েছে। যতবারই জার্মানদের সাথে এইসব বিষয়ে কথা বলেছি, ততবারই গম্ভীর হযে গেছে, ২-৩ জন কেঁদেও দিয়েছে। আসলেই ওদের মনের ইমোশনাল ভেকেন্সিটা একটু ফিল করতে পারলে ভয় লাগে…কিভাবে এভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব??? উত্তর হল উইকডেতে কাজে ব্যস্ত থাকা, উইকেন্ডে মাতাল হয়ে সব ভুলে যাওয়া…মাঝে মাঝে সাইক্রিটিস্ট ভিসিট করা, এন্টি দিপ্রেসসিভ ড্রাগ নেয়া……নতুন রিলেশনশিপ খোজা, রাস্তায় প্রথম ২-৩ মাস ওপেনে কড়া ভালোবাসা(!) বহিঃপ্রকাশ করা……তারপর আবার প্রথম থেকে শুরু করা…..
.
আসলেই আল্লাহর কাছে অগনিত শুকরিয়া, বাংলাদেশের মত গরিব ও রক্ষণশীল মুসলিম দেশে জন্ম দেয়ার জন্য। যেখানে এমন মা পেয়েছি যে তার, ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়েছে ছেলে-মেয়েকে মানুষ করার জন্য। যেখানে বাবা পেয়েছি যে শখ করে নিজের জন্য একটা ঘড়িও কিনেনি – ছেলেমেয়েদের পেছনে খরচ করার জন্য। যেখানে পরিবার পেয়েছি যার কথা ভাবলেই সব দুঃখ কষ্ট ম্লান হয়ে যায়। যেখানে আল্লাহ তোমাকে পেয়েছি – আখিরাতের কথা চিন্তা করার সুযোগ পেয়েছি……
.
My last word would be my greatest realization in life, „Whatever that sounds good or looks good is not necessarily good “… Dear Generation Y, stop following west blindly. I know that it looks like a joy ride, but it’s all a downhill fall which has almost no way back unless Allah wants. May Allah make us among those upon whom he has bestowed His grace. May Allah guide us all to the right path and make us the grateful of His grace. Ameen

চলবে ইনশা আল্লাহ…

(কালেক্টেড)

আরো পড়ুন-
একেই বলে সভ্যতা (প্রথম পর্ব) !!!: https://tinyurl.com/yaky6j8b
একেই বলে সভ্যতা (দ্বিতীয় পর্ব) !!!: https://bit.ly/2xbpnW5
এরই নাম স্বাধীনতা !!!: https://bit.ly/2xcsUnn
এরই নাম স্বাধীনতা!!! দ্বিতীয় পর্ব – https://bit.ly/2xce9kq
এরই নাম স্বাধীনতা!!! তৃতীয় পর্ব-https://bit.ly/2MxnRna
পাশ্চাত্যে বেড়ে ওঠা: https://bit.ly/2p1Irme
মুখোশ উন্মোচনঃ পর্ব-২: https://bit.ly/2Ms17VA
মুখোশ উন্মোচনঃ পর্ব- ৩ https://bit.ly/2p6dopk