মিথ্যের শেকল যত

মিথ্যের শেকল যত

পর্নোগ্রাফি সরাসরি বিকৃত যৌনাচার এবং যৌন-নিপীড়নের প্রভাবক হিসাবে কাজ করে। যৌনতা যেমন শারীরিক, তেমনই মানসিক। পর্নোগ্রাফি টার্গেট করে মানুষের মনকে, আর একবার মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করার পর সেটার ছাপ পড়তে শুরু করে শরীরের ওপর। পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত সবাই বের হয়ে রেইপ করা শুরু করে দেয়, ব্যাপারটা এমন না। তবে পর্ন সেক্সের ব্যাপারে স্বাভাবিক ধারণাকে বদলে দিয়ে বিকৃত ও অস্বাভাবিক যৌনতার ইচ্ছে তৈরি করে। পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত সবার মধ্যেই বিকৃত যৌনতার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়।

প্রথমবার হার্ডকোর পর্নোগ্রাফি দেখার সময় অনেক কিছুই আপনার কাছে অস্বাভাবিক, নোংরা মনে হবে। গা ঘিনঘিন করবে। কিন্তু ক্রমাগত এ ধরনের পর্ন ভিডিও দেখতে থাকলে এক সময় আপনার কাছেই এসব কাজকে খুব স্বাভাবিক লাগবে। শুধু তা-ই না, আপনার মধ্যে এমন আচরণ করার আকর্ষণ জন্মাবে। পর্নোগ্রাফি এভাবে আমাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অবসেসিভ এবং প্যাথোলজিকাল টেন্ডেন্সি গড়ে তোলে।

একেক জনের মধ্যে একেক ধরনের আসক্তি, অবসেশন, বিকার বা প্যাথোলজিকাল আচরণের প্রবণতা তৈরি হয়। এটা হতে পারে হস্তমৈথুন, ভয়ারিযম,[1] অ্যানাল-ওরাল সেক্সের মতো বিকৃত যৌনাচার, ক্রমাগত সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসিতে ভোগা, গ্রুপ সেক্স, সমকামিতা, শিশুকামিতা, ধর্ষণ করার প্রবণতা, ব্যাপক বহুগামিতা অথবা অন্য কোনো যৌন-মানসিক বিকৃতি।

সহজ ভাষায়, পর্নোগ্রাফি মানুষের স্বাভাবিক যৌন প্রবণতা নষ্ট করে দেয়। পর্নোগ্রাফি যত “কড়া” ধাঁচের হয়, পর্ন-আসক্ত দর্শকের ওপর সেটার প্রভাব তত তীব্র হয়। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্ন ভিডিওগুলোতে সহিসংতার ব্যাপক উপস্থিতির কারণে এখন পর্ন-আসক্তদের মধ্যে ধর্ষণ-প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কথাগুলোর সাথে স্বাভাবিক বিবেচনাবোধ-সম্পন্ন কারও দ্বিমত করার কথা না। একজন মানুষ যার ফিতরাহ (Natural Disposition/সহজাত প্রবণতা) নষ্ট হয়ে যায়নি, এ কথাগুলো স্বীকার করে নেবেন। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। অর্থনীতিতে। যখন কোনো সমীকরণে অর্থনীতি ঢুকে পড়ে, সবচেয়ে সোজাসাপ্টা বিষয়গুলোও চরম গোলমেলে হয়ে ওঠে।

গ্লোবাল পর্নোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির সাথে যুক্ত শত শত বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। ২০০৬ সালে এ ইন্ডাস্ট্রির মোট আয় ছিল ৯৭ বিলিয়ন ডলার। মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যামাযন, ইয়াহু, অ্যাপল এবং নেটফ্লিক্সের সম্মিলিত আয়ের চেয়ে বেশি![2]

বছরে পর্ন ইন্ডাস্ট্রির প্রফিট ১৫ বিলিয়ন ডলার। সে তুলনায় হলিউডের বাৎসরিক প্রফিট? ১০ বিলিয়ন ডলার।[3]

আর এ তো শুধু ঘোষিত আয়ের হিসেব। পর্ন ইন্ডাস্ট্রির লেনদেনের বড় একটা অংশ কখনো রিপোর্টেড হয় না।[4] অর্থাৎ এ ইন্ডাস্ট্রির প্রকৃত সাইযটা আরও বড়। যখন কোনো কিছুর সাথে এত এত টাকা জড়িত থাকে, তখন সেটাকে ক্ষতিকর হিসাবে স্বীকার করা, ঘোষণা দেয়া বেশ কঠিন হয়ে যায়। সহজ সমীকরণে গোলমেলে অর্থনীতি ঢুকে পড়ে। সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসকে রক্ষা করাটা হয়ে দাঁড়ায় রুটি-রুজি আর পুঁজির প্রশ্ন। ফার্মাসিউটিক্যাল, হোটেল ও ট্যুরিযম, ক্যাইবল ও স্যাটেলাইট টেলিভিশন নেটওয়ার্ক, ওয়াল স্ট্রিট, গ্লোবাল সেক্স ট্র্যাফিকিং, সেক্সোলজি ও সাইকোলজি—এ সবগুলো ইন্ডাস্ট্রি বিভিন্নভাবে লাভবান হয় পর্ন ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে।

ব্যক্তি ও সমাজের ওপর পর্নের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা আড়াল করে পর্নকে নির্দোষ ও উপকারী বিনোদন প্রমাণ করতে তাই ধরাবাঁধা কু-যুক্তি আর অপবিজ্ঞান ব্যবহার করে চালানো হয় ব্যাপক প্রপাগ্যান্ডা। আর পর্নোগ্রাফি ও হস্তমৈথুনের ফাঁদে আটকে পড়া অনেকেই অন্ধের মতো এ ফাঁকাবুলিগুলো ক্রমাগত আওড়ে যান।

এমনই একটি বহুল ব্যবহৃত তত্ত্ব হলো “Catharsis Theory” বা “Catharsis Effect”। বার বার এ তত্ত্বের রেফারেন্স টেনে এনে অনেকেই দাবি করে বসে, “ধর্ষণ, যৌন-নিপীড়ন, যৌনবিকৃতি, মানসিক বিকৃতি, শিশুকাম এগুলোর পেছনে পর্নোগ্রাফি প্রভাবক হিসেবে কাজ তো করেই না, বরং সমাজ থেকে এ অপরাধগুলোর মাত্রা কমিয়ে ফেলার জন্য পর্নোগ্রাফি খুবই কার্যকর। একেবারে ব্রহ্মাস্ত্র!”

 

তো কীভাবে এই ব্রহ্মাস্ত্র কাজ করে?

এ তত্ত্বের প্রবক্তারা ব্যাখ্যা করেন এভাবে –

ধরুন, কেউ কামের জ্বালায় একদম অস্থির হয়ে আছে। পাগলপ্রায় অবস্থা। যেকোনো উপায়ে, যার সাথেই হোক অন্তরঙ্গ না হতে পারলে সমূহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা। কিন্তু সেই লোকের কোনো সুযোগ নেই কারও সঙ্গে অন্তরঙ্গ হবার। এখন সে কী করবে? প্রবৃত্তির ক্রমাগত অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সে হাত বাড়াতে পারে তার আশেপাশের যেকোনো নারীর দিকে, শিশুদের দিকে নজর দেয়াও অসম্ভব কিছু না, পতিতালয়েও যেতে পারে! কিন্তু যদি তার পর্ন দেখার সুযোগ থাকে, তাহলে নিজের ভেতরের ক্রমেই বাড়তে থাকা প্রেশারটুকু রিলিয করে দিয়ে ঠান্ডা হতে পারবে। সমাজের অগণিত মানুষ রক্ষা পাবে বিপর্যয়ের হাত থেকে।

মনে করুন, একজন ব্যক্তি সম্ভাব্য শিশু ধর্ষক। বহুদিন থেকেই তার ইচ্ছা শিশুদের নিপীড়ন করার। কিন্তু সুযোগের অভাবে সেটা সম্ভব হয়ে উঠেনা। এখন এই ব্যক্তিকে যদি ক্রমাগত চাইল্ড পর্ন দেখানো হয়, তাহলে সে কিছুদিন পর শিশুদের সঙ্গে যৌনমিলনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।[5] এভাবে মানুষের যৌনতাড়না, যৌনবিকৃতি, যৌন-নিপীড়নের ইচ্ছা, সেক্স ফ্যান্টাসিগুলো পর্ন দেখার মাধ্যমে পূরণ হয়ে যাবে। বাস্তবজীবনে আর এসব বিকৃত কাজকর্ম করার দরকার হবে না। সমাজ রক্ষা পাবে ক্ষতির হাত থেকে।[6]

এই পর্যন্ত পড়ার পর মনে হয় ঠিকই তো! পর্নোগ্রাফি যৌনচাহিদা (তা যতই বিকৃত হোক না কেন) পূরণের একটা নিরাপদ রাস্তা তৈরি করে দিয়ে সমাজকে মারাত্মক বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাচ্ছে।

কিন্তু আসলে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। এ থিওরিকে বহু আগেই এক্সপার্টরা বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছেন।[7], [8]

তাহলে শুভংকরের ফাঁকিটা কোথায়?

যে এক্সপেরিমেন্টের ওপর ভিত্তি করে Catharsis Theory দেয়া হয়েছিল তার এক্সপেরিমেন্টাল সেটআপ ছিল খুবই অগোছালো। মানসম্মত এবং গ্রহণযোগ্য গবেষণার জন্য যে স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখা দরকার তার কিছুই করা হয়নি।[9] টেনেটুনে ৩০ জনের একটু বেশি মানুষের (৩২ জন) ওপর ১৫ দিন ধরে গবেষণা চালিয়ে Catharsis Theory-এর উপসংহার টানা হয়। এ ৩২ জনের মধ্যে ২৩ জনের একটা গ্রুপকে একটানা ১৫ দিন, ৯০ মিনিট করে একই ঘরানার পর্ন ভিডিও দেখানো হয়। ১৫ দিন পর ২৩ জনের গ্রুপটা জানায়, শুরুতে তারা পর্ন ভিডিও দেখে উত্তেজিত হতো, কিন্তু পরে তারা পর্ন ভিডিওতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। একই রকমের পর্ন ভিডিও দেখার ফলে তাদের একঘেয়েমি পেয়ে বসে। শুভংকরের ফাঁকিটা এখানেই। পর্নকে নির্দোষ প্রমাণ করার বদলে এটা আসলে মানুষের যৌনতার ওপর পর্নের ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর প্রভাবের একটি প্রমাণ।

ব্যাপারটা একটু চিন্তা করুন। একই ধরনের পর্ন টানা ১৫ দিন; মাত্র ১৫ দিন দেখলেই মানুষের একঘেয়ে লাগতে শুরু করে। একই ধাঁচের পর্ন তাদের আর আগের মতো উত্তেজিত করতে পারে না। মনে করুন আপনি বিরিয়ানি খেতে পছন্দ করেন, এখন আপনাকে যদি ক্রমাগত কয়েকদিন ধরে বিরিয়ানি খাওয়ানো হতেই থাকে, হতেই থাকে, তাহলে একপর্যায়ে আপনি আর বিরিয়ানি খেতে চাইবেন না। এটাই স্বাভাবিক। তেমনিভাবে একই ঘরানার পর্ন ভিডিও বার বার দেখতে থাকলে তাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা খুবই স্বাভাবিক।

এমন অবস্থায় একঘেয়েমি দূর করার জন্য মানুষ কী করতে পারে? তারা বোরড হয়ে পর্ন দেখা ছেড়ে দেয়? অথবা তাদের আচরণ এবং যৌন-চাহিদার ওপর পর্নোগ্রাফির কোনো প্রভাব পড়ে না? আমরা কিন্তু ইতিমধ্যেই বুঝতে পারছি যে, কিছুটা হলেও যৌন-চাহিদার ওপর প্রভাব পড়ছে। কারণ, কয়েকদিন পর্ন দেখার পরই দর্শকের উত্তেজিত হবার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে সংবেদনশীলতা।

মানুষ সাধারণত প্রথম দিকে সফটকোর ঘরানার পর্ন দেখে। একসময় সফটকোর পর্ন তাদের কাছে একঘেয়ে লাগতে শুরু করে। তখন তারা ঝুঁকে হার্ডকোর পর্নোগ্রাফির দিকে। একসময় হার্ডকোর পর্নোগ্রাফিও তাদের উত্তেজিত করার জন্য যথেষ্ট হয় না। পর্ন-আসক্ত ব্যক্তি তখন ঝুঁকে আরও কড়া ধাঁচের পর্নোগ্রাফির দিকে। পশুকাম, শিশুকাম, রেইপপর্ন, ট্যাবু ইত্যাদি চরম বিকৃত ধরনের পর্ন দেখা শুরু করে।[10] একইসাথে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে পর্ন-আসক্তি। মানে পর্ন দেখার সময় ক্রমাগত বাড়তে থাকে। আসক্তির শুরুর দিকে কেউ সপ্তাহে এক ঘণ্টা পর্ন দেখলে, কিছুদিন পর সে হয়তো সপ্তাহে দুই ঘণ্টা পর্ন দেখবে, এভাবে ধীরে ধীরে পর্ন দেখার পরিমাণ বাড়তে থাকে। সেই সাথে বাড়তে থাকে পর্দায় দেখা জিনিসগুলো বাস্তব জীবনে অনুকরণ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

এখন কেউ হয়তো বলতে পারে, “যারা পর্ন দেখে তাদের সবাই কি ধর্ষণ কিংবা শিশুনির্যাতন শুরু করে? অবশ্যই না। তাই পর্নোগ্রাফি রেইপ কিংবা অন্যান্য যৌন-বিকৃতিকে প্রভাবিত করে, এমন বলা ভুল।“

এ কথাটা আসলে টোবাকো ইন্ডাস্ট্রির এ ভুল দাবির মতো যে, “যেহেতু অনেক ধূমপায়ীই ফুসফুস ক্যান্সারে মারা যায় না, তাই ধূমপান ফুসফুস ক্যান্সারের কারণ না।” পর্ন ভিডিও দেখেই সবাই রেইপ করতে বেড়িয়ে পরে না, এ কথা সত্য। কিন্তু এ থেকে কি এই উপসংহার টানা যায়, পর্ন আসলে ধর্ষণ প্রতিরোধ করে? দুটো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের দিকে তাকানো যাক।

১. সাধারণত পর্নোগ্রাফি দেখার পর মানুষ কী করে?

২. পর্নোগ্রাফি দেখা কি দর্শকের ওপর কোনো যৌন-মনস্তাত্ত্বিক (psychosexual) প্রভাব ফেলে?

প্রথম প্রশ্নের উত্তরটা সবার জানা। কেউ পর্ন দেখা শেষ করে চুপচাপ পড়াশোনা, অফিসের কাজ অথবা পরিবারের লোকজনের সাথে আলাপচারিতায় ফেরত যায় না। পর্ন দেখার পর অবশ্যই “ঠান্ডা” হতে হয়। কোনো কারণে তখনই সম্ভব না হলে, একটু নিরিবিলিতে, উপযুক্ত সুযোগ পাওয়ামাত্র ব্যক্তি “ঠান্ডা” হতে চায়। পর্ন দেখার পর অধিকাংশ মানুষ হস্তমৈথুন করে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পর্ন দেখা হয় হস্তমৈথুন করার জন্য। এটা একটা সার্কুলার লুপের মতো।

যদিও অধিকাংশ মানুষের কাছে সেক্সের তুলনায় হস্তমৈথুন যৌনক্রিয়া হিসাবে হয়তো “নিম্নমানের” অলটারনেটিভ, কিন্তু তবুও দিন শেষ হস্তমৈথুন একটা যৌনক্রিয়া। সুতরাং এ কথা আমরা সবাই স্বীকার করি যে, মানুষ পর্ন দেখে যৌনক্রিয়ায় (হস্তমৈথুন) লিপ্ত হয় অথবা যৌনক্রিয়ার আগে নিজেকে উত্তেজিত করার জন্য পর্ন দেখে। পর্ন দেখা, গান শোনা কিংবা নাটক দেখার মতো নিছক কোনো প্যাসিভ, নিষ্ক্রিয় বিনোদন না। বরং পর্ন দেখা এমন এক প্রক্রিয়ার অংশ যার সাথে বাস্তব যৌনক্রিয়া অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। পর্ন দেখার পর আপনি রিলিয খুজবেনই। এটাই স্বাভাবিক। পর্নোগ্রাফি এবং বীর্যপাতের আনন্দ অর্জন, একসূত্রে গাঁথা। যৌনক্রিয়ার মাধ্যমে বীর্যপাত বা শীর্ষসুখে পৌঁছানো হলো পর্ন দেখার স্বাভাবিক পরিণতি।[11] এটুকু পর্যন্ত স্বীকার করে নিতে সুস্থ মস্তিষ্কের কারও আপত্তি থাকার কথা না।

যদি এটুকু আপনি স্বীকার করে নেন তাহলে আসলে প্রশ্নটা দাঁড়ায়, আপনি কি মনে করেন সব ক্ষেত্রে এ “যৌনক্রিয়া” হস্তমৈথুনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? পর্ন-আসক্ত ব্যক্তি শুধু হস্তমৈথুনেই আগ্রহী হবে? চিন্তা করতে থাকুন, সেই ফাঁকে আমরা দ্বিতীয় প্রশ্নটার উত্তরের দিকে একটু নজর বুলিয়ে নিই।

পর্নোগ্রাফি দেখা কি দর্শকের ওপর কোনো যৌন-মনস্তাত্ত্বিক (psychosexual) প্রভাব ফেলে?

হ্যাঁ। পর্নোগ্রাফি দর্শকের যৌন-মনস্তত্ত্বের ওপর প্রভাব ফেলে। পর্নোগ্রাফিকে উপকারী প্রমাণ করার জন্য যে তত্ত্ব প্রচার করা হয়, সেটা দিয়েই এটা প্রমাণ করা যায়। একই ধরনের পর্ন একটানা দেখার কারণে একঘেয়ে লাগা—এটা একটা যৌন-মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। আগে যা দেখে দর্শক উত্তেজিত হচ্ছিল, এখন সেটাতে আর তার হচ্ছে না, এটা হলো যৌন-মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলাফল। পর্নের কারণে দর্শকের যৌনচাহিদা এবং যৌনচিন্তার ধরন বদলে যাচ্ছে।

পর্নে দেখা যৌনাচারগুলো ছাড়া সাধারণ যৌন আচরণ পর্ন-আসক্ত অনেকের কাছে একেবারেই পানসে মনে হয়। অনেকের জন্য পর্ন বা বিকৃত যৌনাচার ছাড়া স্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত হওয়া কঠিন হয়ে যায়, এটা আরেকটা প্রমাণ। পর্ন-আসক্ত ব্যক্তি বাস্তব জীবনে পর্ন ভিডিওতে দেখা কাজগুলোর অনুকরণ করতে চায়, এটা আরও একটা প্রমাণ।

পর্ন দেখে মানুষ শুধু রিলিয পাচ্ছে না, বিশেষ ধরনের যৌনাচারের জন্য তার মধ্যে তীব্র আকাঙ্ক্ষাও তৈরি হচ্ছে এবং শুধু এটুকুতেই আসলে ক্যাথারসিস থিওরি ভুল প্রমাণিত হয়ে যায়।[12]

এখানে একটা বিষয় হলো যৌন-মনস্তত্ত্বের ওপর পর্নোগ্রাফির এ প্রভাব সাথে সাথে কার্যকর হয় না। যারা পর্নোগ্রাফিকে উপকারী বলেন, তারা মূলত এ পয়েন্টের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের দাবি প্রমাণ করতে চান। কিন্তু সমস্যা হলো পর্নোগ্রাফির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী, সেটা তারা এড়িয়ে যান। পর্ন দেখেই কেউ রেইপ করতে বের হয়ে যায় না, কিন্তু তার মানে এটা না যে, এর কোনো প্রভাব তার ওপর পড়েনি। যৌন-মনস্তত্ত্বের ওপর পর্নোগ্রাফির যে প্রভাব সেটা ধীরে ধীরে কার্যকর হয়। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বার বার পর্নোগ্রাফি দেখার ফলে, তার চিন্তার কাঠামোতে পরিবর্তন আসে।

পর্ন-আসক্ত ব্যক্তি পর্ন দেখা বা পর্নের দৃশ্য নিয়ে ফ্যান্টাসাইয করা ছাড়া উত্তেজিত হতে পারে না। আবার ক্রমাগত পর্ন দেখতে থাকলে সময়ের সাথে সাথে পর্নের মাধ্যমে তার উত্তেজিত হবার ক্ষমতাও কমতে থাকে। আরও বেশি সহিংস, আরও বেশি বিকৃত পর্ন ছাড়া সে উত্তেজিত হতে পারে না। এ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে একপর্যায়ে সেক্স সম্পর্কে তার চিন্তা, বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক যৌন আচরণ থেকে একবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সহজ ভাষায় প্রথমত পর্নোগ্রাফি মানুষকে যৌনক্রিয়াতে তীব্রভাবে উদ্বুদ্ধ করে। আর দ্বিতীয়ত পর্নোগ্রাফির যৌনক্রিয়ার ব্যাপারে মানুষের প্রেফারেন্সকে বদলে দেয়। তার যৌনচাহিদা এবং যৌনমনস্তত্ত্ব বিকৃত হয়ে যায়।

একদিকে তার মধ্যে তীব্র যৌনাকাঙ্ক্ষা কাজ করে, অন্যদিকে স্বাভাবিকভাবে তৃপ্ত হওয়া তার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। নারী, বিয়ে, সেক্স, রেইপ, বিকৃত যৌনাচার ইত্যাদি নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণ বদলে যায়। এমন ব্যক্তির রেইপ, শিশুকাম কিংবা অন্য কোনো বিকৃত যৌনাচারে লিপ্ত হবার সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

“সিগারেট থেকে শুরু, শেষকালে হেরোইন”, ব্যাপারটা অনেকটা এমন। এটা মাদকাসক্তির ক্লাসিক প্যাটার্ন। শুরুতে অল্পেই নেশা হয়ে যায়। কিন্তু সময়ের সাথে চাহিদা বাড়তে থাকে। আগে যতটুকুতে “ধরত”, তাতে আর হয় না। নেশা চড়াতে আরও বেশি মাদকের দরকার হয়। সেই সাথে তৈরি হতে থাকে মাদকের ওপর ডিপেন্ডেস, আসক্তি। এভাবে মাদকাসক্তি ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়। পর্ন-আসক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও বিষয়টা এমন।

চিন্তা করে দেখুন, একজন পর্ন-আসক্ত ব্যক্তি যখন এমন অবস্থার মধ্যে দিয়ে যায়, তখন তার যৌন-মনস্তত্ত্বের কী অবস্থা হয়? নিত্যনতুন নারী কিংবা শিশুদেহের হার্ডকোর পর্নোগ্রাফি দেখেও যে লোক উত্তেজিত হতে পারে না, বাস্তবের রক্ত-মাংস-ঘামের নারীর সাথে স্বাভাবিক যৌনতা কি তাকে উত্তেজিত করতে পারবে? এভাবে একজন লোক যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে, যখন ধর্ষণের ভিডিও কিংবা শিশুদের ধর্ষণের ভিডিও পর্যন্ত তার কাছে একঘেয়ে লাগা শুরু করে, তখন সে কী করে? কী তাকে উত্তেজিত করবে? সে কি অতৃপ্তির জ্বালা, এ তীব্র ক্ষুধা নীরবে সয়ে যাবে? আপনি-আমি, আমরা সবাই জানি, তীব্র যৌনাকাঙ্ক্ষা নিছক “মনের জোরে” চেপে রাখা যায় না। সাময়িকভাবে পারা গেলেও সেটা স্থায়ী হয় না। এক সময় না এক সময় বিস্ফোরণ ঘটেই।

আসলে পর্নোগ্রাফি রিলিযের কাজ তো করেই না; বরং আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে এবং আসক্ত ব্যক্তিকে বিকৃত যৌনাচারের দিকে নিয়ে যায়। ফলে সমাজে যৌন-নিপীড়ন, শিশুকাম, রেইপসহ অন্যান্য বিকৃত কামের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। যার অনেক প্রমাণ আমরা ইতিমধ্যে আলোচনা করেছি, আরও অসংখ্য প্রমাণ চারপাশের পৃথিবীতে আপনি পাবেন। এত গেল যৌনচাহিদা এবং যৌন-মনস্তাত্ত্বিক দিকের কথা। এ ছাড়া কমন সেন্সের মাপকাঠিতেও ক্যাথারসিস থিওরি বা পর্নোগ্রাফি “উপকারী” হবার অন্য কোনো থিওরি, একেবারেই টেকে না। যদি কেউ বার বার ইয়াবা কিংবা হেরোইন খাবার ভিডিও দেখে, যদি এসব ভিডিওতে এ কাজগুলোকে গ্ল্যামারাইযড করে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে কি সমাজে ইয়াবা কিংবা হেরোইন ব্যবহার কমে যাবে? আচ্ছা ধরুন আপনাকে বলা হলো, বাংলাদেশের প্রাইমারি স্কুলগুলোতে শিক্ষক কর্তৃক শিশুদের শারীরিক আঘাত করার হার কমাতে। আপনি কি এটার সলিউশান হিসাবে এসব শিক্ষকদের বলবেন, ছোট বাচ্চাদের পেটানোর এবং টর্চার করার নতুন নতুন ভিডিও নিয়ম করে দেখতে?

নানা আঙ্গিকে, নানা লোকেশানে চাকচিক্যময় ও জাঁকজমকপূর্ণভাবে ছোট বাচ্চাদের মারা এবং মার খেতে দেখার ভিডিও কি তাদের পেটানোর ইচ্ছা ও মানসিকতাকে নষ্ট করে দেবে? সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো মানুষ কি আদৌ এ ধরনের “সমাধান” সিরিয়াসলি নেবে? পর্ন দেখার সাথে যদি রেইপের হার কমে, তাহলে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পর্ন প্রডিউস করা এবং পর্নোগ্রাফির সবচেয়ে বড় গ্রাহক অ্যামেরিকাতে কেন এত রেইপ হয়? কেন অ্যামেরিকান মিলিটারি, কলেজ, হলিউড সব জায়গাতে এত ধর্ষণ, এত যৌন-নিপীড়ন হয়? কেন রেইপ পর্ন ইন্ডিয়াতে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকার পরও ভারতে রেইপ না কমে বরং ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়? স্রেফ স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে এ ধরনের গোঁজামিল দেয়া কথা ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফির মতো এতটা ক্ষতিকর বিষয়কে “নির্দোষ বিনোদন” প্রমাণ করার প্রপাগ্যান্ডা চালানো হয়। হস্তমৈথুনের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই রকম। বর্তমান সময়ের অধিকাংশ ডাক্তার, এক্সপার্ট এবং ইন্টারনেট ওয়েবসাইট আপনাকে বলবে, হস্তমৈথুন একেবারেই ক্ষতিকর না।

এদিক-সেদিক থেকে নানা জোড়াতালি দেয়া প্রমাণ তুলে এনে প্রমাণ করতে চাইবে হস্তমৈথুন “প্রায় নিশ্চিতভাবেই” শরীরের জন্য ভালো। এটা একেবারেই “ন্যাচারাল” একটি বিষয়, এ নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই। হস্তমৈথুন শরীরের জন্য ভালো বা স্বাভাবিক যৌন আচরণ এ ধরনের কোনো কংক্রিট প্রমাণ নেই। হস্তমৈথুন “স্বাভাবিক”, “ন্যাচারাল” এসব কথার প্রচলন আজ থেকে মাত্র সাত-আট দশক আগে। এর আগ পর্যন্ত হস্তমৈথুনকে, বিশেষ করে নিয়মিত ও ক্রনিক হস্তমৈথুনকে একটি অস্বাভাবিক যৌনাচার হিসাবেই দেখা হতো। এমনকি নানা যৌনবিকৃতিকে হোয়াইটওয়াশ করা, সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতো বিকৃত মানসিকতার লোকও হস্তমৈথুনক অস্বাভাবিক মনে করত।

মূলত হস্তমৈথুনকে স্বাভাবিক এবং উপকারী হিসেবে দেখার প্রবণতা শুরু হয় ১৯৪৯ সালে আলফ্রেড কিনসির Sexual Behavior In The Human Male প্রকাশিত হবার পর। এ বইটি এবং ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত তার আরেকটি বই Sexual Behavior in the Human female, ম্যাস মিডিয়ার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পাশ্চাত্যে ঝড় তোলে। যৌনতা সম্পর্কে পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে আনে আমূল পরিবর্তন। পাশ্চাত্যের ইতিহাসের অন্য কোনো বই বা রিপোর্ট পাশ্চাত্যকে এতটা বদলে দেয়নি যেমন এই দুটি বই দিয়েছিল। আধুনিক সেক্স এডুকেশান, সাইকোলজি এবং সেক্স সম্পর্কে চিকিৎসকদের সার্বিক চিন্তা কিনসির এই দুটি বইয়ের ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হচ্ছে। যৌনতা সম্পর্কে আধুনিক পশ্চিমা ধারণা একেবারে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে আলফ্রেড কিনসির এই দুই বিখ্যাত “থিসিসের” ওপর ভিত্তি করে। তার এ বইয়ে কিনসি চরম পর্যায়ের বিকৃত কিছু চিন্তাকে বিজ্ঞানের নামে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। সে দাবি করে শিশুরা জন্মগত ভাবেই, এমনকি গর্ভে থাকা অবস্থা থেকেই সেক্সুয়ালি এক্টিভ। তার মতে শিশুরা একেবারে ছোটকাল থেকেই হস্তমৈথুন করা শুরু করে।

কত ছোটকাল থেকে?

কিনসির দাবি হল দুই, চার, সাত মাস বয়সী শিশুরাও নাকি হস্তমৈথুনের মাধ্যমে চরমানন্দে (Orgasm) পৌঁছাতে সক্ষম! সাত মাস বয়সী একটি শিশু এবং এক বছরের নিচের আরও পাঁচজন শিশুকে সে নিজে নাকি শীর্ষসুখ অর্জন করতে দেখেছে।[13] সে আরও বলে, এত কমবয়স্ক শিশুরা বয়স্ক সঙ্গী/সঙ্গিনীদের সঙ্গে আনন্দদায়ক এবং উপকারী যৌনমিলন করতেই পারে, এবং এমন করা উচিত।[14] অভিভাবকদের উচিত ৬-৭ বছর বয়স থেকে শুরু করে শিশুদের হস্তমৈথুন করানো এবং একসাথে মিলেমিশে হস্তমৈথুন করা!

কিনসি আরও দাবি করে, অধিকাংশ মানুষ আসলে উভকামী, যৌনতার কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠি নেই। কোনো যৌনতাই অস্বাভাবিক না। সমকাম, উভকাম, শিশুকাম, পশুকাম, অজাচার, যার যা ইচ্ছে সেটা করবে, এতে কোনো সমস্যা নেই।[15]

আসলে কিনসি নিজে ছিল একজন চরম মাত্রার বিকৃত মানসিকতার লোক। ব্যক্তিজীবনে ভয়ঙ্কর বিকৃত যৌনাচারে অভ্যস্ত। তার “রিসার্চ” ছিল জালিয়াতিতে ভরা। পরবর্তীকালে এই “মহান” বিজ্ঞানীর কাজগুলো ভুল প্রমাণিত হয়েছে বিজ্ঞানীদের হাতেই। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন আলফ্রেড কিনসির দাবিগুলোর তেমন কোনো সায়েন্টিফিক ভিত্তি নেই, তার তথ্য-উপাত্তগুলো যথেষ্ট পরিমাণে গোঁজামিলে ভরপুর।[16] এক্সপেরিমেন্ট করার জন্য অনেক সময় সাবজেক্টের ওপর চরম যৌন-নির্যাতন চালানো হয়েছে, রেহাই দেয়া হয়নি শিশুদেরও। কিন্তু ততদিনে ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে। “হস্তমৈথুন ক্ষতিকর না; বরং উপকারী” কিনসির জোর গলায় দাবি করা এ চরম মিথ্যা সেক্স এডুকেশানের বইগুলোতে বার বার খুব বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং এটাকে ধ্রুব সত্য বলে মেনে নিতে বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু হস্তমৈথুন যদি স্বাভাবিক ও ভালো হয়, তাহলে প্রথমবার হস্তমৈথুনের পর কেন মনের ওপর অনুশোচনার একটা গাঢ় পর্দা নেমে আসে?

প্রথমবার হস্তমৈথুনের মাধ্যমে বীর্যপাত করার প্রায় সবার চরম অনুশোচনা হয়। ভাষা, ভৌগোলিক অবস্থান, ধর্ম-বর্ণভেদে এমন অবস্থায় মানুষের মনে হয় সে খুব খারাপ কিছু একটা করে ফেলেছে। অনুভূতিটা সর্বজনীন। এর ব্যাখ্যা কী? হস্তমৈথুন ভালো প্রমাণ করতে চাওয়া “বিশেষজ্ঞরা” বলবে, ধর্ম এবং সামাজিক মূল্যবোধ আমাদের চিন্তা করতে শেখায় যে, এ কাজটা খারাপ। এটা একটা পাপ। আর এ জন্যই মানুষের মধ্যে অনুশোচনা কাজ করে।

এ ব্যাখ্যার ভুল কোথায়?

কোনো কাজের ব্যাপারে ধর্মের বক্তব্য দ্বারা প্রভাবিত হবার জন্য আপনাকে তো আগে কাজটাকে চিনতে হবে, সেটার সম্পর্কে ধর্মের বক্তব্য জানতে হবে। কিন্তু আপনি দেখবেন হস্তমৈথুনের মাধ্যমে প্রথম বীর্যপাতের অভিজ্ঞতার সময় অনেকেরই ধারণাই থাকে না আসলে কী হচ্ছে। যে ছেলেটা বুঝতেই পারছে না কী হলো, সে কীভাবে ওই কাজের ব্যাপারে ধর্মের বক্তব্য জানবে, আর সেটা দিয়ে প্রভাবিত হবে? আসলে এটাই হলো ফিতরাহ, মানুষের সহজাত প্রবণতা (Natural Disposition)। মানুষের সহজাত নৈতিক কম্পাস তাকে জানিয়ে দেয় কাজটা খারাপ। আর তাই প্রথম প্রথম সবাই অনুশোচনায় ভোগে। কিন্তু পরে মানুষ এর যৌক্তিকতা দাঁড় করায়, একে স্বাভাবিক মনে করা শুরু করে।

এ ছাড়া বাস্তব অভিজ্ঞতাও প্রমাণ করে হস্তমৈথুন আসক্তি শুধু সমস্যাই না; বরং ভয়ঙ্কর রকমের মনোদৈহিক সমস্যা। ভুক্তভোগীদের কিছু অভিজ্ঞতা এরই মধ্যে আমরা আপনাদের সামনে তুলে ধরেছি। হস্তমৈথুনে আসক্তদের এমন করুণ উপাখ্যান এক-দুটো না। অজস্র।

হস্তমৈথুনকে স্বাভাবিক প্রমাণে উঠেপড়ে লাগার পেছনে আরেকটা বড় কারণ হলো, সেই পুরনো কালপ্রিট—অর্থনীতি। হস্তমৈথুন আসক্তি আর পর্নোগ্রাফি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। এ দুয়ে মিলে এক চক্র তৈরি করে। আর এ চক্রে আটকা পড়ে শত সহস্র প্রাণ। যদি হস্তমৈথুনকে ক্ষতিকর বলে স্বীকার করে নেয়া হয়, হস্তমৈথুন না করতে মানুষকে উৎসাহ দেয়া হয়, হস্তমৈথুন আসক্তি বন্ধে কাউন্সেলিং করা হয়, তাহলে শত বিলিয়ন ডলারের পর্নোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির কী হবে? এ অতিকায় ইন্ডাস্ট্রি কি নিজ অস্তিত্বের প্রতি এমন হুমকিকে মেনে নেবে? নাকি নিজের অঢেল সম্পদ ব্যবহার করে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে অ্যাকাডেমিয়া, মিডিয়া এবং “বিশেষজ্ঞদের” মাধ্যমে হস্তমৈথুনকে স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রমাণে?

পরের বার “কেন হস্তমৈথুন ভালো”, “হস্তমৈথুনের ১৮ অজানা উপকারিতা” জাতীয় ইন্টারনেট আর্টিকেলগুলো পড়ার সময় এ বিষয়টা মাথায় রাখবেন।

সর্বোপরি মুসলিম হিসাবে আমাদের ফ্রেইম অফ রেফারেন্স কোনটা আগে সেটা আমাদের বুঝতে হবে। এতক্ষণ যা কিছু আমরা আলোচনা করেছি, এ সবকিছু হলো সেকেন্ডারি, গৌণ প্রমাণ। মুসলিম হিসাবে আমাদের জন্য প্রাইমারি প্রমাণ হলো ইসলামী শারীয়াহর বক্তব্য। আর ইসলামের বক্তব্য হলো হস্তমৈথুন হারাম।[17] একজন মুসলিমের জন্য প্রমাণ হিসাবে এটাই যথেষ্ট হওয়া উচিত। যেখানে ইসলামের স্পষ্ট বিধান আছে সেখানে বিজ্ঞানের “প্রায় নিশ্চিত” মত গোনায় ধরার মতো কিছু না। বিশেষ করে বিষয়টি যখন নৈতিকতার সাথে সম্পর্কিত। যেমন বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিয়ে-বহির্ভূত সেক্স ক্ষতিকর কিছু না। বরং আধুনিক পশ্চিমা দর্শনে এটা স্বাভাবিক, এমনকি প্রশংসনীয়। অন্যদিকে যিনা ইসলামের দৃষ্টিতে কবিরা গুনাহ। বিজ্ঞান যদি কাল থেকে যিনাকে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলে প্রচার করা শুরু করে, তাহলে এতে একজন মুসলিমের কিছুই যায় আসে না। যিনার ব্যাপারে তার ধারণা এতে বদলে যাবে না।

সুতরাং হস্তমৈথুন যদি কখনো বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সুনিশ্চিতভাবে স্বাস্থ্যকর বলে প্রমাণিতও হয় (যেটা এখনো হয়নি) তবুও এতে একজন মুসলিমের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আসার কথা না, কারণ ইসলামের মাপকাঠিতে কাজটা অনৈতিক এবং হারাম। আর বাস্তবতা হলো মনোদৈহিকভাবে হস্তমৈথুন এবং পর্ন-আসক্তি দুটোই অত্যন্ত ক্ষতিকর। আমরা ইতিমধ্যেই আলোচনা করেছি কীভাবে এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিবার ও সমাজ কেউই মুক্তি পায়নি।

পর্ন-আসক্তি আর হস্তমৈথুনের চক্র ব্যক্তির জীবনকে হতাশা, গ্লানি আর পুনরাবৃত্তির চোরাবালিতে আটকে ফেলে। এ বৃত্তে আটকা পরে তিলে তিলে ক্ষয়ে যেতে থাকে শত সহস্র মানবাত্মা। এ চক্র ভাঙার, এ বৃত্তের বাইরে যাবার উপায় কী? আদৌ কি সম্ভব?

পড়ুন- http://lostmodesty.com/tag/ঝেটিয়ে-বিদায়-করুন-বেয়াড়া/

 

রেফারেন্সঃ

[1] Voyeurism – ঈক্ষণকামিতা। অপরের যৌনক্রিয়া দেখে যৌন তৃপ্তি পাওয়া।

[2] Pornography addiction: A neuroscience perspective,Donald L. Hilton, Jr and Clark Watts – https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3050060/]

[3] How Big is the Porn Industry? – http://bit.ly/2AVUgxT

[4] How large is the adult entertainment industry? – http://to.pbs.org/2FxiEt7

[5] Bart & Jozsa, 1980, p. 210

[6] Kelly, Wingfield, & Regan, 1995, p. 23

[7] Catharine A. MacKinnon, “X-Underrated: Living in a World the Pornographers Have Made,” in Big Porn Inc., edited by Melinda Tankard Reist and Abigail Bray, 9–15. North Melbourne, Australia: Spinifex Press, 2011

[8] Sommers & Check, 1987

[9] Diamond, 1980; Howard, Reifler, & Liptzin, 1991

[10] Zillmann & Bryant, 1986, p. 577

[11] Cline, 1974; Osanka & Johann, 1989.

[12] Sommers & Check, 1987

[13] Sex education as bullying, page 7

[14] Kinsey, Sex and Fraud, page 3

[15] Ibid, page 2

[16] Ibid, page 1

[17] Ruling on masturbation and how to cure the problem – https://islamqa.info/en/329

নীড়ে ফেরার গল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)

আসসালামু আলাইকুম।

আমি  মফস্বলে বেড়ে ওঠা একজন সহজ সরল ছেলে।সারাদিন হই হুল্লোড় করে ঘুরতাম,বন্ধুদের সাথে খেলতাম।আব্বাকে অনুসরণ করে মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়তাম।সবে মক্তবে প্রথম কোরআন খতম দিয়েছি।আমার বয়স তখন তের বছর।ক্লাস সিক্স এ পড়ি।পর্নোগ্রাফি কি জিনিস আর হস্তমৈথুন কি জিনিস কিছুই বুঝতাম না।সেক্স কি জিনিস তাও বুজতাম না।অন্যরা এসব নিয়ে কথা বললে প্রচন্ড লজ্জা পেতাম।

একদিন আমার এক ভাগিনা (আমার থেকে দুই বছরের বড় হবে) বেড়াতে এসেছে আমাদের বাড়িতে।হেমন্তকালের প্রথমদিক,এমনিতেই আমার শরতকাল আর হেমন্তকাল ভালো লাগে।আকাশে সারি সারি মেঘের ভেলা,মাঠে সবুজ ধান আর ঝিরিঝিরি বাতাশের আবেশ!ঘর থেকে বেরুলেই মন জুড়িয়ে যায়।মাঠে ধানী জমির আইল ধরে হেটে বেড়াতাম,এখনো সময় পেলে ঘুরি।আমি ভাগনাকে নিয়ে চললাম ক্ষেতের আইলের দিকে।হাটছি আর আল্লাহর অপরুপ সৃষ্টি উপভোগ করছি।একটি জমিতে ধান অনেক লম্বা হয়েছে,এমন স্থানে এসে ভাগনা আচমকা বসে পড়ল,সাথে সাথে আমাকেও টেনে বসালো।বসে সে তার প্যান্ট খুলে ফেলল। আমি দেখেই বললাম তুমি এ কী কর? আমাকে বলল, ‘দেখ!’  সে  হস্তমৈথুন করতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর দেখলাম সাদা সাদা ঘন কি একটা জিনিস বের হয়ে আসল। আমি তো দেখে অবাক! সে বলল যদি শরীর জেগে যায় আর মেয়ে না পাস তাহলে এভাবে চাহিদা মেটাতে হয়’।

আমার তখন কৌতুহলী মন।আমি অনেক শরম পেয়েছি কিন্তু মনে মনে এ রকম করার কৌতুহল বেড়েই চলল।এক সপ্তাহ পর আমি ভাবলাম আচ্ছা একবার করেই দেখি কি রকম লাগে!এই বলে হস্তমৈথুন শুরু করলাম।প্রায় দশ মিনিট যাবত এই নাফরমানি করে অবশেষে কি রকম যেন একটা তৃপ্তি পেলাম,এক ধরনের ভালো লাগা তৈরি হয়ে গেল।

.এরপর থেকে যে শুরু হলো আমার নিয়মিত হস্তমৈথুন!কোনদিন একবার,কোনদিন দুইবার,তিন বার,চারবার পর্যন্ত করতাম।ক্লাস নাইনে উঠার পর চাচাতো ভাইয়ের মোবাইল আসল বিদেশ থেকে।শুরু হলো মোবাইলে পর্ন দেখা আর হস্তমৈথুন করা।পর্ন দেখে কোনদিন আমি ছয়বার পর্যন্ত হস্তমৈথুন করেছি!

.কলেজে উঠার পর খেয়াল করলাম আমার শরীর ভেঙ্গে গেছে,স্মৃতিশক্তি কমে গেছে,কানে কম শুনি,চোখে কম দেখি।কিন্তু হস্তমৈথুনের হার বেড়েই চলল।সেই তের বছর বয়স থেকে শুরু হয়েছিল,আজ আমি ২৪ বছরের যুবক।এই বারোটা বছর আমি একটানা হস্তমৈথুন করেই গেছি!

.কত বড় গোনাহগার যে হয়েছি! আল্লাহ………যে আমি একসময় ফজরের নামাজের জন্য রাত তিনটায় মসজিদে যেতাম একা একা,সে আমি একটানা একমাস কিংবা তার থেকেও বেশি সময় মসজিদে যাইনি শুধু জুমার নামাজ ছাড়া!এক সময় বোধোদয় হলো হস্তমৈথুন ছাড়ার।গত দুইটা বছর ধরে চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না।ফেসবুকে একদিন একটা গ্রুপ দেখলাম”নাসিহাহ-দ্বীনি পরামর্শ”।গ্রুপে এড হলাম।গ্রুপের প্রতিটা পোস্ট মনোযোগ সহকারে পড়তাম আর আমল করার চেষ্টা করতাম।

.এর মধ্যে আমার মেজ বোন মারা গেলেন।আমি আরো মুষড়ে পড়লাম।ভেবে দেখলাম দুনিয়া দুই দিনের।তরতাজা আমার বোন যদি মারা যেতে পারেন তাহলে আমার বাঁচার কোন নিশ্চয়তা আছে?মারা গেলে সাথে নিয়ে যাবো কী?নামাজ কালামে মনোযোগী হলাম।কিন্তু হস্তমৈতুনের অভ্যাস ছাড়তে পারছিলাম না।ঠিক তখনি আমার কাছে আলোকবর্তিকা হয়ে আসল গ্রুপের একটি পোস্ট-হস্তমৈতুনের কুফল ও তার থেকে মুক্তির উপায়।সেখানেই দেখতে পাই মুক্ত বাতাসের খোঁজে বইটির নাম।সাথে সাথেই অর্ডার করি।পুরো বইটি পড়ে শেষ করি।পড়ার পর মনে হলো এতদিন আমি যা করেছি সবই ভুল,পাহাড় পর্বত সমান গুনাহ আমি করে ফেলেছি!কিন্তু আর না।আমি মহান আল্লাহর কাছে তাওবা করেছি আর করব না এসব।

.আগে প্রচুর হতাশ হতাম,এখন আর হতাশাবোধ করি না।আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলে কাঁদি।রাহমানুর রাহীম আল্লাহ আমাকে হেদায়াত নসীব করেছেন।প্রায় তিনমাস যাবত আমি হস্তমৈথুন আর পর্নোগ্রাফি থেকে দুরে আছি।আমি শিউর আল্লাহ আমার এই গুনাহ রহমতে ভরপুর করে দিবেন।যাদের জন্য এটি সম্ভব হয়েছে তারা হলেন ঐ বড় ভাই যিনি গ্রুপে পোস্ট দিয়েছিলেন আর মুক্ত বাতাসের খোঁজে বইটি যারা লিখেছেন।আমি ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করতে পারব না।আমার অন্তর এমন কি আমার হাড়ে ও দোআ দিবে এর জন্য।যারা মানুষকে পাপ কাজ থেকে বাঁচাতে এরকম একটি বই লিখেছেন।নিশ্চই কিয়ামাতের দিন এর উত্তম প্রতিদান পাবেন।ইনশাআল্লাহ।

.এখন আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি,কোরআনুল কারীমের একটা খতম ও ধরেছি।প্রতি সপ্তাহে একটা রোজা রাখি।আগে ফেসবুকে অশ্লীল পোস্ট দিতাম,এখন তাও দেইনা।আমি বেরিয়ে পড়েছি মুক্ত বাতাসের খোঁজে।দোআ করবেন আল্লাহ যেন আমাকে ইসলাম সম্পর্কে আরো বেশি জানার এবং ইবাদাত করার তৌফিক দান করেন।আর ইসলামের ছায়াতলেই কালিমার সহিত যেন শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে পারি।

আমীন।

পড়ুন-

নীড়ে ফেরার গল্প (প্রথম কিস্তি): https://bit.ly/2xbUIZ0
ইনবক্স থেকে: https://bit.ly/2QlBdpD

 

আততায়ী ভালোবাসা (প্রথম পর্ব) 

আততায়ী ভালোবাসা (প্রথম পর্ব) 

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

ফেইসবুক মাঝে মাঝে ফিরিয়ে নিয়ে যায় তারুণ্যের প্রথম দিনগুলোতে। পুরোনো স্ট্যাটাসগুলো ফেইসবুক মেমরি হিসেবে হোমপেইজে ভেসে ওঠে। চশমার এপাশের চোখদুটো যা দেখে তা বিশ্বাস করতে চায়না। আফসোস, বিস্ময় আর হাসির মাঝামাঝি একটা অনুভূতি হয়। কতো অপরিপক্ক ছিলাম তখন। কী সব ছেলেমানুষি করেছি, হাস্যকর কতো স্ট্যাটাস দিয়েছি!
.
সঙ্গে সঙ্গে স্ট্যাটাস ডিলিট করে দেই। ইয়ার দোস্তদের কেউ দেখে ফেললে আর রক্ষে নেই। পঁচিয়ে পাগল করে দিবে। অথচ চার পাঁচ বছর আগে যখন এগুলো লিখেছিলাম তখন নিজেকে কতো ‘স্মার্ট আর কুল’ মনে হয়েছিল। লাইক কমেন্ট পেয়ে খুব ভালো লেগেছিল। বন্ধুরা কতো প্রশংসা করেছিল! এককালের ‘হিট’ স্ট্যাটাসগুলো আজ সেই একই আমির কাছে লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে । যে বন্ধুরা প্রশংসার বন্যায় আমাকে ভাসিয়ে দিয়েছিল সেই একই বন্ধু বান্ধবের দল এই পোস্ট দেখলে আমাকে পঁচাবে!
.
চৌধুরী সাহেব ঠিকই বলেছিল। মানুষ মরে গেলে পঁচে যায়,বেঁচে থাকলে বদলায়। সকালে বিকালে বদলায়, কারণে অকারণে বদলায়।
.
মাত্র চার পাঁচ বছরের ব্যবধানে কতো বদলে গেছি! চারপাঁচ বছর পরেও এই আমি আর সেই আমি থাকবোনা নিশ্চয়ই।
গতকাল যেটাকে ধ্রুবসত্য বলে মনে হয়েছিল আজ তা মিথ্যে, যে আচার আচরণকে স্মার্ট,কুল,জাতে ওঠার সিঁড়ি ভেবেছিলাম আজ নিজের কাছেই তা হাসি ঠাট্টা আর লজ্জার বিষয়। আফসোসের বিষয়!
কীভাবে এতো অপরিণত আচরণ করেছিলাম ভেবে অবাক হবার বিষয়।
.
আল্লাহ্‌র কালাম আর আল্লাহ্‌র দ্বীন ছাড়া কোন কিছুই আসলে ধ্রুব সত্য নয়। শক্ত করে আঁকড়ে ধরে জমে থাকার কিছু নেই। সময় পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে বদলে যায় সবই… ফিজিক্সের থিওরি,ফেসবুকের ট্রেন্ড, রাজনীতি, সিংহাসন, নিয়ন আলোর রাজপথ। পরাশক্তির অহং, ঔদ্ধত্যও ধুলোয় লুটোয়।
.
আজ কোন মেয়েকে তোমার কাছে মনে হচ্ছে স্বর্গের অপ্সরী, মেয়ে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে অষ্টপ্রহর। তুমি নিশ্চিত থাকো কিছুদিন পরেই তোমার এই অনুভূতির পরিবর্তন হয়ে যাবে। ঘোর কেটে যাবে। এটা স্রেফ বয়ঃসন্ধিকালের মোহ, বা অস্থির তারুণ্যের অস্থিরতা।
স্কুলে পড়ার সময় তুমি একরকম থাকবে, তোমার চিন্তাভাবনা পছন্দ অপছন্দের মাপকাঠি জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি একরকম হবে।
.
কলেজে ওঠার পর তোমার পরিচিতির গন্ডি কিছুটা বড় হবে। তুমি কিছুটা বদলাবে।
মনোজগতে আলোড়ন বয়ে যাবে এর পরের ধাপ- বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভার্সিটির বাতাসেও কী যেন থাকে! তোমার জীবনবোধ,চিন্তা চেতনা, পছন্দ অপছন্দের মাপকাঠি বদলে যাবে। তুমি নিজেকে ক্রমাগত ভাঙতে থাকবে নতুনভাবে গড়ার নেশায়।
.
স্কুল থেকে কলেজ,কলেজ থেকে ভার্সিটি … ধীরে ধীরে বদলে যাবে তুমি । একটু একটু করে পরিণত হবে। কিন্তু তোমার মনের মানুষটিও যদি এরকম কোনো জার্নির মধ্যে দিয়ে না যায়, পিছিয়ে পড়ে তাহলেই পরিস্থিতি ধারণ করবে জটিল আকার। প্রেমিকার কালো চোখ আর অতো টানবেনা,অন্ধকার রাত্রির মতো ঘনকালো চুল মনে হবে ঘোড়ার লেজ, যে হাসি আগে বুকে ছুরি বসাতো সেই হাসি দেখে প্রথমেই মনে হবে, ‘আরে! ওর দাঁত এতো হলুদ কেন। কয়দিন ব্রাশ করেনা? আচার আচরণ কথা বার্তায় অনেক ভুল ধরা পড়বে, … ক্ষ্যাত মনে হবে। প্রেমিকা হয়ে যাবে অচল মূদ্রার মতো। সহজ বাংলায় প্রেম আর জমবেনা, তুমি পালাবার পথ খুঁজবে। (বোনেরা আমার, প্রেমিকার জায়গায় প্রেমিক ধরে পড়ে যাও। একই কাহিনী। যাহাই বাহান্ন তাহাই তিপ্পান্ন। তোমাদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টা আরো প্রকোট হয়ে ধরা পড়বে। তুমি চাইবেইনা তোমার প্রেমিক তোমার চেয়ে কম শিক্ষিত বা কম যোগ্যতা সম্পন্ন হোক)
.
কিছু কিছু প্রেম সময়ের এই ঝড় ঝাপটা সামলে নিয়ে টিকে থাকে তেলাপোকার মতো করে। বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় এবং প্রেমের এপিটাফ লিখা হয়ে যায় ঠিক তখনই। সামনের লেখাগুলোতে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আসবে ইনশা আল্লাহ্‌ ।
.
মোহ আর প্রেমের কতো ফুল ফুটতে দেখলাম। কিছুকাল পরে সেই ফুল ঝরে যেতে দেখলাম নিজের চোখে। কতো প্রেমিক প্রেমের শপথ করে কবিতা আউড়ে কসম খেল- ভালোবাসার জন্যে তারা জীবন বিলিয়ে দিবে নিঃসংকোচিত্তে, দুঃখের প্রত্যেকটি দ্বীপকে আপণ করে নিবে, দরকার হলে দাঁড়িয়ে যাবে পুরো পৃথিবীর বিপক্ষে, তবুও ভালোবাসার অসম্মান হতে দিবেনা,প্রেমিকাকে বুকে জড়িয়ে রাখবে আজীবন, শত প্রতিকূলতার মুখেও হাত ছাড়বেনা কখনোই। আকাশ বাতাস আর জমীনকে সাক্ষী রেখে তারা উদ্দাত্ত কন্ঠে জানান দিল জীবন চলে গেলেও অন্য কোনো মেয়েকে মেনে নিবেনা জীবনসঙ্গিনী হিসেবে।
আজ সেইসব বোকা, মিথ্যুক প্রেমিকের দল অন্য কোনো রূপসীর চোখে চোখে রেখে সেই একই পুরোনো কবিতার কসম খাচ্ছে। লাজুক মুখে কেউ কেউ জানান দিচ্ছে অন্য কোনো মমতাময়ীর বাচ্চার বাবা হবার শুভ সংবাদ ।
.
ভাই তোমার মোহ কেটে গেলে, নেশা কেটে গেলে প্রেমও হারিয়ে যাবে। তুমি অন্য কোনো ভালোবাসার প্রহরে অন্য কোনো রূপসীকে ভালোবাসার কথা বলবে। প্রেম হচ্ছে মদের মতো, প্রেমিকেরা নেশাখোর। কিছুতেই তোমার মন ভরবেনা, নেশা জমবেনা।
বিশ্বাস করো তুমি ঐসব বোকা প্রেমিকদের মতোই। তুমি ওদের চেয়ে আলাদা নও কিছুতেই। তুমি ওদের মতোই।
.
যেই রূপসী তোমার চিন্তা ভাবনা,তোমার রক্তে মিশে গেছে , যে রূপসীকে ছাড়া তোমার দিন কাটেনা, তুমি বাঁচবেনা, বিশ্বাস করো সেই রূপসীকে ছাড়াই তুমি দিব্যি হেসে খেলে বেঁচে থাকবে। মাসের পর মাস চলে যাবে, ক্যালেন্ডারের পাতায় ধুলো জমবে, রূপসীর কথা তোমার ক্ষণিকের জন্যেও মনে হবেনা। তার চেহারা মন থেকে মুছে যাবে, যেই চোখ তোমার রাতের ঘুম হারাম করে দিত সেই গভীর কালো চোখও হারিয়ে যাবে। হয়তো ভুলে যাবে রূপসীর নামও। উদাস দুপুরের কোনো দলছুট চৈতালী বাতাস দূর অতীত থেকে বয়ে নিয়ে আসবে টুকরো টুকরো স্মৃতি… গাগলামী, ছেলেমানুষী… রক্ত দিয়ে প্রেমপত্র লিখা, এসিডে পুড়িয়ে নিজের শরীরে প্রেমিকার নাম লিখা,দূরালপনের এলোমেলো কথোপকথনে রাত ভোর হয়ে যাওয়া,বাবার পকেট কেটে ১৮ তম জন্মদিনে ১৮টি রক্তলাল গোলাপ কিনে দেওয়া, রিকশায় বৃষ্টিবিলাস, ফুচকা খাওয়া, মনোমালিন্য,ঝগড়া, ইঁদুর মারা বিষ বা কোকের সঙ্গে মিশিয়ে ঘুমের ঔষধ খেয়ে ফেলা …
.
পাগলামির কথা ভেবে তুমি হাসবে, কী অবুঝ ছিলে তুমি, পাগলামির কী বিশাল ভাবসম্প্রসারণ করেছিলে। নাতি নাতনি বা কোন তরুণ শ্রোতাকে সামনে বসিয়ে তুমি রসিয়ে রসিয়ে প্রেমের অমর(!) কাহিনী শোনাবে!
.
বয়সে ছোটদেরকে প্রেম বিষয়ক সবক দিতে গেলে আমি আলোচনা মূলত এভাবেই শুরু করি। এ পর্যন্ত বোঝানোর পর প্রায় সবাই বিনাবাক্যব্যয়ে আমার কথা মেনে নেয়। ঠিক ঠিক, তোমার কথা ঠিক। বোঝাতে পারার তৃপ্তির হাসি দিয়ে আমি জিজ্ঞাসা করি , ‘তাহলে তোরা প্রেম করিস কেন’?
মোটা দাগে তিন ধরণের উত্তর আসে-
.
১) এখন যার সঙ্গে প্রেম করছি তাকেই বিয়ে করব এমননা। জাস্ট টাইম পাস করার জন্যে প্রেম করি।
২) ফ্রেন্ড সার্কেলের সবাই প্রেম করে, আমি প্রেম না করলে কেমন না?
৩) প্রেম না করলে ভালো লাগেনা , একা একা লাগে। গুমোট নগরে ভীষণ দুঃখবোধ হয়। দুদণ্ড শান্তি দরকার ভাই , দুদন্ড শান্তি।

(চলবে ইনশা আল্লাহ্‌)

১০৮ টি নীলপদ্ম (প্রথম পর্ব)

১০৮ টি নীলপদ্ম (প্রথম পর্ব)

সৃষ্টির একবারের শুরুর সেই সময়টা । আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করা হয়েছে ।  তিনি জান্নাতে থাকেন । একা একা  কিছুটা বিষণ্ণ মনে   ঘুরে বেড়ান । আই রিপিট “জান্নাতে” মন খারাপ করে ঘুরে বেড়ান । অবশেষে আল্লাহ্‌ (সুবঃ), আদম (আঃ) এর সঙ্গী   হাওয়া (আঃ) কে সৃষ্টি করলেন।আদম (আঃ) এর বিষন্নতা কেটে গেল।

স্বামী / স্ত্রী এবং তাদের মধ্যেকার অন্তরঙ্গতা  আল্লাহ্‌ (সুবঃ) এর এক বিশাল নিয়ামত । স্বামী / স্ত্রী একজন অপরের চোখ শীতলকারী , প্রশান্তি দানকারী । হাজার বছর ধরেই স্বামী স্ত্রীর এই অসম্ভব সুন্দর সম্পর্ক, একে অপরের প্রতি স্রদ্ধাবোধ, ত্যাগ স্বীকারের হাজার হাজার  কাহিনী  লিপিবদ্ধ হয়েছে, মহাকাব্য রচিত হয়েছে , রচিত হয়েছে অসংখ্য অশ্রু  ঝরানো উপাখ্যান । কিন্তু আমাদের এই তথাকথিত আধুনিক মহান সভ্যতায় বদলে গেছে  স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক ।

ঠুনকো হয়ে গেছে  স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটা ভালোবাসায় মিশে গেছে ফরমালিন । কমে গেছে একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ।  আমাদের দাদা দাদী, নানা নানীদের জেনারেশান,   অত দূরে যেতে হবে না, আমাদের বাবা মার জেনারেশানের স্বামী স্ত্রীর  সম্পর্কের মধ্যে যে পরিমাণ সততা ছিল ,যে পরিমাণ আবেগ ছিল তা আমাদের জেনারেশানের মধ্যে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বছরের পর বছর ধরে তাঁরা একসাথে একি ছাদের নিচে ঘুমিয়েছেন , জীবনের সকল দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছেন , সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে একসঙ্গে যুদ্ধ করেছেন, হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়েছেন জীবনের পক্ষে।

আমাদের জেনারেশানের দাম্পত্য জীবন অনেকটা পিকনিকের মতো । একে অন্যকে  দেখে দুজনকেই দুজনের  অনেক “কুউউল” মনে হল , তারপর  দুজনে বিয়ে করে কিছুদিন “এনজয়” করল । তারপর একরাতে মশারী খাটাতে যেয়ে  দুজনের হালকা কথা কাটাকাটি শুরু হল , তারপর ঝগড়া , তারপর রাত দুপুরে দুই পক্ষের অভিভাবক ডেকে ডিভোর্স ।

খালাস।

আবার কিছুদিন পর অন্য একজনকে দেখে অনেক ‘কুউউল’ মনে হল, তারপর আবার বিয়ে , তারপর কিছুদিন এনজয়, ফেসবুকের ওয়ালপেজ ভর্তি বেডরূম সেলফি , তারপর একদিন সামান্য কারণে হুট করে  ডিভোর্স ।  এই দুষ্ট চক্র চলতেই থাকে ।

কিন্তু কেন?

কেন হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা  স্বামী স্ত্রীর মধুর সম্পর্কের আজ এই  বেহাল দশা ? কেন এক নিদারুণ দুঃসময়ে টালমাটাল পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী বন্ধনগুলোর একটি?

অনেক গুলো ফ্যাক্টর আছে এর পিছনে । পুঁজিবাদী চিন্তাভাবনা ,সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে নিজের প্রবৃত্তির দাসত্ব

করা,সেকুল্যারিজমের প্রসার,মিডিয়ার মগজধোলাই,নারীবাদের উত্থান ।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর পর্নমুভি, আইটেম সং,  সর্বোপরি মিডিয়ার pornification এবং নারীকে শুধু মাত্র

দেহসর্বস্ব ‘সেক্স অবজেক্ট’ হিসেবে দেখানোর  ট্রেন্ড ।  এই কম আলোচিত বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই আমাদের   এই লিখাটি

সামনে এগুবে ইনশা আল্লাহ্‌  ।

আমাদের জেনারেশান  লাগামছাড়া অশ্লীলতা আর বেহায়াপনায় গা ভাসিয়েছে । এক দুই  ঘন্টানেট  ব্রাউজিং করেই তারা

বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে “যখন কিছুই লুকানোর থাকেনা” টাইপ মেয়েদের ছবি দেখে ফেলে তা আমাদের বাপ দাদারা তাঁদের

সারাজীবনে দেখেছে কিনা সন্দেহ । হাই স্পীড নেট , এন্ড্রয়েড ফোনের কল্যানে পর্ন মুভি আলু পটলের মতোই সহজলভ্য

হয়ে গেছে আর আমাদের ছেলে মেয়েরা তা গোগ্রাসে গিলছে ।

প্রতি সেকেন্ডে গড়ে ২৮,২৫৮ জন মানুষ পর্ন দেখছে [১] University of Montreal  এর গবেষকরা এমন একজনকেও খুঁজে পাননি যে জীবনে কখনোই পর্ণ দেখেনি।[২]

Security technology company Bitdefender এর গবেষনা থেকে দেখা যাচ্ছে,পর্নসাইটে যাতায়াত করে এমন ১০ জনের মধ্যে ১ জনের বয়স দশ বছরের নিচে । এবং এই দুধের বাচ্চা গুলো রেপপর্ন টাইপের জঘন্য জঘন্য সব ক্যাটাগরির পর্ন দেখে । [৩]

পর্নমুভি দেখে, চটি গল্প পড়ে বড় হওয়া এইসব ছেলে মেয়েরা যৌনতা সম্পর্কে অতিরঞ্জিত, অবাস্তব ধারনা নিয়ে বড় হয়ে ঊঠছে ।  এদের সেক্স এডুকেশানের  মাধ্যমও এই পর্ন মুভি। National Union of Students(NUS) এর জরিপ থেকে দেখা যাচ্ছে শতকরা ৬০ জন স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা যৌনতা সম্পর্কে জানার জন্য পর্ণ মুভি দেখছে।[৪]

অস্ট্রেলিয়ান গবেষক Maree Crabbe এবং David Corlett এর ভাষ্যে,‘ আমাদের সংস্কৃতিটাই এমন হয়ে গিয়েছে যে কিশোর,তরুণরা কীভাবে যৌনতাকে উপলব্ধি করবে এবং যৌনতার মুখোমুখি দাঁড়াবে সেটা শেখাচ্ছে পর্ণ। সেক্স এডুকেশানের প্রভাবশালী মাধ্যম হচ্ছে পর্ণ’। [৫]

মানুষ কোন একটা বিষয় বার বার দেখতে থাকলে এবং সেটা তার ভালো লাগলে একসময় না একসময় সে সেটা করতে চাই । কাজেই  বিয়ের পর শুরু হচ্ছে ঝামেলা। [৬]

পর্নমুভিতে আসক্ত হওয়ার কারণে বিয়ের আগে  থেকেই  স্বামীর মনে নারী দেহের বিভিন্ন অঙ্গের আকার  আকৃতি   সম্পর্কে অতিরঞ্জিত এবং অবাস্তব ধারনা থাকে। [৭] তার  অবচেতন মন এটা ধারণা করে থাকে যে সব  নারীর দেহই  পর্নমুভির অভিনেত্রীদের মতো । এবং  নারীরা  বিছানায়, পর্নঅভিনেত্রীদের মতোই বেপরোয়া । কিন্তু সে যখন আসল সত্যটা আবিষ্কার করে বসে তখন সে হতাশ হয়ে যায় এবং দাম্পত্য জীবনে শুরু হয় অশান্তি।

মুদ্রার ওপর পিঠটাও দেখে ফেলা যাক । পর্নমুভিতে আসক্ত নারীরাও ছেলেদের দেহ সম্পর্কে অতিরঞ্জিত ধারনা করে বসে থাকে । বিয়ের পর সে যখন আবিষ্কার করে তার স্বামীর দেহ পর্নমুভিতে দেখানো পুরুষদের মতো না , তার স্বামী পর্নমুভিতে দেখানো পুরুষটার মতো এক্ট করতে পারছে না বা  ডিউরেশান পর্নমুভির চেয়ে  অনেক কম । তখন সে তার স্বামীকে নিয়ে অসন্তুষ্টিতে ভুগছে । দাম্পত্য কলহ শুরু হচ্ছে । পরকীয়ার সূত্রপাত হচ্ছে ।  পরকীয়ার পালে জোর হাওয়া লাগাতে ইন্ডিয়ান বস্তাপচা সিরিয়াল তো আছেই ।

দুজনের কেউই ভেবে দেখছেনা পর্নমুভিতে যেগুলো দেখানো হচ্ছে সেগুলো  কতটা ফেক ।কতটা এডিটিং করা হয়েছে । পর্নঅভিনেত্রীদের “শরীর” বলুন আর পর্নঅভিনেতার “শরীর” বলুন এগুলো সব কিছুই স্বাভাবিক আকারের চেয়ে অতিরিক্ত বড় আকারে পর্নমুভিতে এডিটিং এর মাধ্যমে উপস্থাপনা করা হয় । অনেক ঘাম ঝরিয়ে , বিশেষ ব্যামায় করে, সার্জারির মাধ্যমে এইগুলো বড় করা হয় । স্বাভাবিক নারী পুরুষের দেহ তাদের মত হবে না এটাই সত্য ।  আর ত্রিশ চল্লিশ মিনিটের একটি পর্নমুভি হয়তো সাত দিন ধরে শুটিং করা হচ্ছে ,পুরুষ অভিনেতা বা অভিনেত্রীরা যৌন শক্তি বর্ধক ড্রাগস নিয়ে তাতে পারফর্ম করছে , আর এর ভোক্তারা  নীল স্ক্রীনের সামনে  পর্ন মুভি দেখে ভেবে নিচ্ছেন তারা বোধহয় “একশটেই” চল্লিশ পঞ্চাশ মিনিট  স্টে করতে পারে । পর্নআসক্ত স্ত্রী ভাবছে পর্নমুভির অভিনেতা এতক্ষন পারলে আমার স্বামী কেন পারছে না তার নিশ্চয় সমস্যা আছে, পর্নআসক্ত স্বামী ভাবছে আরে সে এতক্ষন পারলে আমি কেন পারি না , নিশ্চয় আমার কোন সমস্যা আছে।

এইভাবে পর্নআসক্ত স্বামী তার আত্মবিশ্বাস  হারিয়ে ফেলছে আর স্ত্রীরাও অসন্তুষ্টিতে ভুগছে । স্বামী স্ত্রীর ভালবাসায় ভাটা পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের (যৌন বিশেষজ্ঞ,চিকিৎসক,মনোবিদ,মনোবিজ্ঞানী,প্রফেসর) শতাধিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে [৮] পর্ন,মারাত্মক রকমের যৌন সমস্যা সৃষ্টি করে। ইরেক্টাইল  ডিসফাংশন (লিঙ্গ উত্থিত না হওয়া) থেকে শুরু করে , প্রিম্যাচিউর ইউজাকুলেশান(অকাল বীর্যপাত), যৌনতার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, অতৃপ্ত থাকা,স্বামী স্ত্রীর মধ্যেকার ভালোবাসা কমে যাওয়া, যৌনতায় আগ্রাসন প্রদর্শন…

বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে যুবকদের যৌনসমস্যা যতোটা বৃদ্ধি পেয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে এর আগে কখনো এরকম হয়নি। ৭জন নেভি চিকিৎসক সহ আরো অনেক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে লিখিত একটি গবেষণাপত্র [৯], [১০] থেকে দেখা যাচ্ছে, ১৪ থেকে ৩৫ শতাংশ পুরুষ ইরেক্টাইল ডিসফাংশন জনিত সমস্যায় আক্রান্ত। যৌনতায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন এমন পুরুষের সংখ্যা শতকরা ১৬ থেকে ৩৭ জন। এই পুরুষদের কারো কারো বয়স ৪০ বছর বা তার চেয়ে কম , কেউ কেউ ২৫ বছর বয়সী টগবগে যুবক , কেউ কেউ সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া টিনেজার!

অনলাইন ফ্রি পর্নোগ্রাফি যুগের পূর্বের (?-২০০৬) বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা গিয়েছে ৪০ বছর বা এর চেয়ে কম বয়সী পুরুষদের মাত্র ২-৫ শতাংশ পুরুষ ইরেক্টাইল ডিসফাংশনে আক্রান্ত। ৩৫ বছর বা এর চেয়ে কমবয়সী কেউ ইরেক্টাইল ডিসফাংশনে আক্রান্ত এমনটা শোনাই যেতনা। তার মানে গত কয়েক বছরে তরুণ,যুবকদের ইরেক্টাইল ডিসফাংশন  প্রায়  ১০০০% বেড়েছে। এর পেছনে দায়ি কে ?

চলবে ইনশা আল্লাহ্‌……

পড়ুন-

১০৮ টি নীলপদ্ম (দ্বিতীয় কিস্তি)- https://bit.ly/2oZy6ab
১০৮ টি নীলপদ্ম (শেষ কিস্তি)- https://bit.ly/2QodAwv

রেফারেন্সঃ

[১] https://goo.gl/NxUWuY

[২]https://goo.gl/Z6TwPJ

[৩][ http://bit.ly/2fdBY1a

[৪]  https://goo.gl/HdfMq6

[৫] https://goo.gl/PGF6zX

[৬]Cicely Alice Marston and Ruth Lewis. “Anal Heterosex Among Young People and Implications for Health Promotion: A Qualitative Study in the UK,” BMJ Open 4, no. 8 (2014).

[৭] Emily Leickly, Kimberly Nelson, and Jane Simoni, “Sexually Explicit Online Media, Body Satisfaction, and Partner Expectations Among Men who have Sex with Men: A Qualitative Study,” Sexuality Research & Social Policy (2016). doi:10.1007/s13178-016-0248-7

[৮] https://goo.gl/tGJ4Nd

[৯] https://goo.gl/9FbhBs

[১০] https://goo.gl/ANeYcd

চোরাবালি (অষ্টম পর্ব)

চোরাবালি (অষ্টম পর্ব)

আসসালামু-আলাইকুম।

আমি এনামুল, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ তৃতীয় বর্ষে পড়ছি। সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর কসম আমি একটা মিথ্যা কথাও এখানে বলব না, পুরোটাই আমার এবং পরিচিতজনদের সাথে ঘটে যাওয়া বাস্তবতা। এখন আমার বয়স বিশের এর কাছাকাছি কিন্তু ছোট থেকেই অন্যদের তুলনায় একটু চিকন। বন্ধুদের সাথে তেমন মিশি না আর আমার বন্ধুর সংখ্যাও হাতে গোনা কয়েকজন। কারো কারো কাছে হস্তমৈথুন সম্পর্কে শুনতাম কিন্তু ততটা বুঝতাম না। গত বছর দুয়েক আগে কৌতূহলবশত হস্তমৈথুন করেই ফেলি। অদ্ভুদ রকমের পাগল করে দেয়া একটি সুখকর অনুভূতি পেলাম প্রথম বার। এরপর থেকে এটা বারবার আমাকে ছায়ার মত আকর্ষণ করত।
.
কিছুদিন পর পর্ন দেখার সাথে সাথে একই সময়ে এটা করতে শুরু করলাম। সপ্তাহে ৩,৪ দিন বা তার বেশি হস্তমৈথুন করতাম। কিন্তু প্রতিবারই এটা করার পর এমন হতাশার সৃষ্টি হত যেন সব শেষ! স্পার্ম বের হয়ে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ড পরেই মনে হত আমি একি করলাম, প্রতিবারই তওবা করতাম যে জীবনে আর এই কাজ করব না। একদিন বা তার বেশি সময় মন খারাপ করে হতাশায় ডুবে থাকতাম কিন্তু দুইদিন পর আবার যেই-সেই! এভাবেই বারবার পুনরাবৃত্তি হচ্ছিল প্রায় দেড়টি বছর ধরে। কোন ভাল কাজ করতে আগ্রহ পেতাম না। ভাল কোন কাজ করার সময় মনে হত কি লাভ এসব করে, আমিতো কঠিন অপরাধে জড়িয়ে আছি। এমনিতেই শুকনা ছিলাম আর দিনে দিনে আরো ডালপালা হয়ে যাচ্ছিলাম, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল হতাশার মাত্রা। একটা সময় খেয়াল করলাম অতীতের অনেক কিছুই আমি মনে করতে পারছি না, বারবার চেষ্টা করছি কিন্তু তবুও পারছি না। একটা সহজ বিষয় বুঝতে বা মনে রাখতে খুব বেগ পেতে হচ্ছে, কোন কাজে শক্তি পাচ্ছিনা। আগে প্রতিদিন ১৫ কি.মি. সাইকেল চালিয়ে কলেজে যেতাম কিন্তু এখন বাজারে যেতেই হাঁপিয়ে যাই।
.
যাইহোক, আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুর কাছে তার জীবনের গল্প শুনেছিলাম অনেকবার। প্রতিদিন কয়েকবার করে মাস্টারবেট করত সে। কয়েক বছর পর ধাতুক্ষয়ের সাথে তার এমন অবস্থা হয়েছিল যে, তার বীর্য থেকে পায়খানার চেয়ে বাজে দুর্গন্ধ বের হত। একেকটা সময় মাথাব্যথায় অজ্ঞান হয়ে যেত। মেধাবী ছেলেটার ক্যারিয়ার, ভবিষ্যৎ সব ধ্বংস হয়ে গিয়েছে বলা যায়।
.
আমার জীবনে ফিরে আসি, হঠাৎ একদিন রাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়, দেখলাম আমার পরনের লুঙ্গি ভিজা। নাহ সেটা পানি বা প্রস্রাব ছিলনা, স্পার্ম ছিল। কিন্তু আমি তো স্বপ্নে কিছু দেখিনি, স্বপ্নদোষ তো হয়নি তাহলে এরকম কেন? খেয়াল করলাম অটোমেটিক স্পার্ম বের হচ্ছে ফোটা ফোটা করে। দুইদিন পর রাতে আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। মনে পড়ল সেই বন্ধুটির কথা, ভাবলাম আমিও কি তার পথে হাটছি, তার পরিণতি কি আমাকে হাতছানি দিচ্ছে????
এতটাই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছিলাম যে মহান আল্লাহর কাছে তওবা করলাম “আল্লাহ প্রয়োজনে আমার বউ বাচ্চা কিছু লাগবে না আমি জীবনে কোন খারাপ কাজ করব না, কিন্তু আমাকে ওর পরিণতি দিয়েন না” জেলার সবচেয়ে ভাল ডাক্তারের কাছে গেলাম কিন্তু কয়েক মাস ধরে আমার প্রস্রাবের সাথে স্পার্ম বের হচ্ছে এবং সাথে শারীরিক এবং মানসিক দুর্বলতা তো আছেই। সিজিপিএ ৩.৫০ থেকে ২.৭৫ এ নেমে গেল! ওই বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারলাম আমার পরিচিত অনেক ছেলেই এই অসুখে আক্রান্ত এবং সবার এই সমস্যার শুরু হস্তমৈথুন থেকে।
.
পর্ন,মাস্টারবেশন থেকে এখন আমি দূরে। সময় থাকতে ভাল হওয়ার সুযোগ পেয়েও আমি হাতছাড়া করেছিলাম কিন্তু আজ প্রকৃতি আমাকে জোর করে শান্ত করেছে। জানিনা কবে এই অসুস্থতা থেকে মুক্তি পাব কিংবা আদৌ মুক্তি পাব কিনা শঙ্কিত। অনেকটা সময় নিয়ে মোবাইল কিবোর্ডে কষ্ট করে লিখলাম, প্রয়োজনে লিখার ভুলগুলো সংশোধন করে হলেও লিখাটা প্রকাশ করবেন যেন মাস্টারবেশনে আক্রান্ত ভাইয়েরা একটু হলেও এর ভয়াবহতা বুঝতে পারে।
আইডি নেমটা মেনশন করবেন না

পড়ুন-

চোরাবালি প্রথম পর্ব – https://bit.ly/2ObItTt
চোরাবালি দ্বিতীয় পর্ব – https://bit.ly/2Qm0j7D
চোরাবালি তৃতীয় পর্ব – https://bit.ly/2p0HR8l
চোরাবালি চতুর্থ পর্ব – https://bit.ly/2QoRtGb
চোরাবালি পঞ্চম পর্ব- https://bit.ly/2Nzoh0M
চোরাবালি ষষ্ঠ পর্ব- https://bit.ly/2QocEIA
চোরাবালি সপ্তম পর্ব- https://bit.ly/2x9hr81
মাস্টারবেশন কী মাসলগ্রোথ এবং এথলেটিক পারফরম্যান্সের ক্ষতি করে?- https://bit.ly/2NzycUa
মিথ্যের শেকল যতো- https://bit.ly/2QpkT7f
সমকামিতা এবং হস্তমৈথুন আদিম মানুষের মধ্যে বিরল!- https://bit.ly/2CQOOT2
.