মিথ্যের শেকল যত

মিথ্যের শেকল যত

পর্নোগ্রাফি সরাসরি বিকৃত যৌনাচার এবং যৌন-নিপীড়নের প্রভাবক হিসাবে কাজ করে। যৌনতা যেমন শারীরিক, তেমনই মানসিক। পর্নোগ্রাফি টার্গেট করে মানুষের মনকে, আর একবার মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করার পর সেটার ছাপ পড়তে শুরু করে শরীরের ওপর। পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত সবাই বের হয়ে রেইপ করা শুরু করে দেয়, ব্যাপারটা এমন না। তবে পর্ন সেক্সের ব্যাপারে স্বাভাবিক ধারণাকে বদলে দিয়ে বিকৃত ও অস্বাভাবিক যৌনতার ইচ্ছে তৈরি করে। পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত সবার মধ্যেই বিকৃত যৌনতার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়।

প্রথমবার হার্ডকোর পর্নোগ্রাফি দেখার সময় অনেক কিছুই আপনার কাছে অস্বাভাবিক, নোংরা মনে হবে। গা ঘিনঘিন করবে। কিন্তু ক্রমাগত এ ধরনের পর্ন ভিডিও দেখতে থাকলে এক সময় আপনার কাছেই এসব কাজকে খুব স্বাভাবিক লাগবে। শুধু তা-ই না, আপনার মধ্যে এমন আচরণ করার আকর্ষণ জন্মাবে। পর্নোগ্রাফি এভাবে আমাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অবসেসিভ এবং প্যাথোলজিকাল টেন্ডেন্সি গড়ে তোলে।

একেক জনের মধ্যে একেক ধরনের আসক্তি, অবসেশন, বিকার বা প্যাথোলজিকাল আচরণের প্রবণতা তৈরি হয়। এটা হতে পারে হস্তমৈথুন, ভয়ারিযম,[1] অ্যানাল-ওরাল সেক্সের মতো বিকৃত যৌনাচার, ক্রমাগত সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসিতে ভোগা, গ্রুপ সেক্স, সমকামিতা, শিশুকামিতা, ধর্ষণ করার প্রবণতা, ব্যাপক বহুগামিতা অথবা অন্য কোনো যৌন-মানসিক বিকৃতি।

সহজ ভাষায়, পর্নোগ্রাফি মানুষের স্বাভাবিক যৌন প্রবণতা নষ্ট করে দেয়। পর্নোগ্রাফি যত “কড়া” ধাঁচের হয়, পর্ন-আসক্ত দর্শকের ওপর সেটার প্রভাব তত তীব্র হয়। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্ন ভিডিওগুলোতে সহিসংতার ব্যাপক উপস্থিতির কারণে এখন পর্ন-আসক্তদের মধ্যে ধর্ষণ-প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কথাগুলোর সাথে স্বাভাবিক বিবেচনাবোধ-সম্পন্ন কারও দ্বিমত করার কথা না। একজন মানুষ যার ফিতরাহ (Natural Disposition/সহজাত প্রবণতা) নষ্ট হয়ে যায়নি, এ কথাগুলো স্বীকার করে নেবেন। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। অর্থনীতিতে। যখন কোনো সমীকরণে অর্থনীতি ঢুকে পড়ে, সবচেয়ে সোজাসাপ্টা বিষয়গুলোও চরম গোলমেলে হয়ে ওঠে।

গ্লোবাল পর্নোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির সাথে যুক্ত শত শত বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। ২০০৬ সালে এ ইন্ডাস্ট্রির মোট আয় ছিল ৯৭ বিলিয়ন ডলার। মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যামাযন, ইয়াহু, অ্যাপল এবং নেটফ্লিক্সের সম্মিলিত আয়ের চেয়ে বেশি![2]

বছরে পর্ন ইন্ডাস্ট্রির প্রফিট ১৫ বিলিয়ন ডলার। সে তুলনায় হলিউডের বাৎসরিক প্রফিট? ১০ বিলিয়ন ডলার।[3]

আর এ তো শুধু ঘোষিত আয়ের হিসেব। পর্ন ইন্ডাস্ট্রির লেনদেনের বড় একটা অংশ কখনো রিপোর্টেড হয় না।[4] অর্থাৎ এ ইন্ডাস্ট্রির প্রকৃত সাইযটা আরও বড়। যখন কোনো কিছুর সাথে এত এত টাকা জড়িত থাকে, তখন সেটাকে ক্ষতিকর হিসাবে স্বীকার করা, ঘোষণা দেয়া বেশ কঠিন হয়ে যায়। সহজ সমীকরণে গোলমেলে অর্থনীতি ঢুকে পড়ে। সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসকে রক্ষা করাটা হয়ে দাঁড়ায় রুটি-রুজি আর পুঁজির প্রশ্ন। ফার্মাসিউটিক্যাল, হোটেল ও ট্যুরিযম, ক্যাইবল ও স্যাটেলাইট টেলিভিশন নেটওয়ার্ক, ওয়াল স্ট্রিট, গ্লোবাল সেক্স ট্র্যাফিকিং, সেক্সোলজি ও সাইকোলজি—এ সবগুলো ইন্ডাস্ট্রি বিভিন্নভাবে লাভবান হয় পর্ন ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে।

ব্যক্তি ও সমাজের ওপর পর্নের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা আড়াল করে পর্নকে নির্দোষ ও উপকারী বিনোদন প্রমাণ করতে তাই ধরাবাঁধা কু-যুক্তি আর অপবিজ্ঞান ব্যবহার করে চালানো হয় ব্যাপক প্রপাগ্যান্ডা। আর পর্নোগ্রাফি ও হস্তমৈথুনের ফাঁদে আটকে পড়া অনেকেই অন্ধের মতো এ ফাঁকাবুলিগুলো ক্রমাগত আওড়ে যান।

এমনই একটি বহুল ব্যবহৃত তত্ত্ব হলো “Catharsis Theory” বা “Catharsis Effect”। বার বার এ তত্ত্বের রেফারেন্স টেনে এনে অনেকেই দাবি করে বসে, “ধর্ষণ, যৌন-নিপীড়ন, যৌনবিকৃতি, মানসিক বিকৃতি, শিশুকাম এগুলোর পেছনে পর্নোগ্রাফি প্রভাবক হিসেবে কাজ তো করেই না, বরং সমাজ থেকে এ অপরাধগুলোর মাত্রা কমিয়ে ফেলার জন্য পর্নোগ্রাফি খুবই কার্যকর। একেবারে ব্রহ্মাস্ত্র!”

 

তো কীভাবে এই ব্রহ্মাস্ত্র কাজ করে?

এ তত্ত্বের প্রবক্তারা ব্যাখ্যা করেন এভাবে –

ধরুন, কেউ কামের জ্বালায় একদম অস্থির হয়ে আছে। পাগলপ্রায় অবস্থা। যেকোনো উপায়ে, যার সাথেই হোক অন্তরঙ্গ না হতে পারলে সমূহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা। কিন্তু সেই লোকের কোনো সুযোগ নেই কারও সঙ্গে অন্তরঙ্গ হবার। এখন সে কী করবে? প্রবৃত্তির ক্রমাগত অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সে হাত বাড়াতে পারে তার আশেপাশের যেকোনো নারীর দিকে, শিশুদের দিকে নজর দেয়াও অসম্ভব কিছু না, পতিতালয়েও যেতে পারে! কিন্তু যদি তার পর্ন দেখার সুযোগ থাকে, তাহলে নিজের ভেতরের ক্রমেই বাড়তে থাকা প্রেশারটুকু রিলিয করে দিয়ে ঠান্ডা হতে পারবে। সমাজের অগণিত মানুষ রক্ষা পাবে বিপর্যয়ের হাত থেকে।

মনে করুন, একজন ব্যক্তি সম্ভাব্য শিশু ধর্ষক। বহুদিন থেকেই তার ইচ্ছা শিশুদের নিপীড়ন করার। কিন্তু সুযোগের অভাবে সেটা সম্ভব হয়ে উঠেনা। এখন এই ব্যক্তিকে যদি ক্রমাগত চাইল্ড পর্ন দেখানো হয়, তাহলে সে কিছুদিন পর শিশুদের সঙ্গে যৌনমিলনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।[5] এভাবে মানুষের যৌনতাড়না, যৌনবিকৃতি, যৌন-নিপীড়নের ইচ্ছা, সেক্স ফ্যান্টাসিগুলো পর্ন দেখার মাধ্যমে পূরণ হয়ে যাবে। বাস্তবজীবনে আর এসব বিকৃত কাজকর্ম করার দরকার হবে না। সমাজ রক্ষা পাবে ক্ষতির হাত থেকে।[6]

এই পর্যন্ত পড়ার পর মনে হয় ঠিকই তো! পর্নোগ্রাফি যৌনচাহিদা (তা যতই বিকৃত হোক না কেন) পূরণের একটা নিরাপদ রাস্তা তৈরি করে দিয়ে সমাজকে মারাত্মক বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাচ্ছে।

কিন্তু আসলে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। এ থিওরিকে বহু আগেই এক্সপার্টরা বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছেন।[7], [8]

তাহলে শুভংকরের ফাঁকিটা কোথায়?

যে এক্সপেরিমেন্টের ওপর ভিত্তি করে Catharsis Theory দেয়া হয়েছিল তার এক্সপেরিমেন্টাল সেটআপ ছিল খুবই অগোছালো। মানসম্মত এবং গ্রহণযোগ্য গবেষণার জন্য যে স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখা দরকার তার কিছুই করা হয়নি।[9] টেনেটুনে ৩০ জনের একটু বেশি মানুষের (৩২ জন) ওপর ১৫ দিন ধরে গবেষণা চালিয়ে Catharsis Theory-এর উপসংহার টানা হয়। এ ৩২ জনের মধ্যে ২৩ জনের একটা গ্রুপকে একটানা ১৫ দিন, ৯০ মিনিট করে একই ঘরানার পর্ন ভিডিও দেখানো হয়। ১৫ দিন পর ২৩ জনের গ্রুপটা জানায়, শুরুতে তারা পর্ন ভিডিও দেখে উত্তেজিত হতো, কিন্তু পরে তারা পর্ন ভিডিওতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। একই রকমের পর্ন ভিডিও দেখার ফলে তাদের একঘেয়েমি পেয়ে বসে। শুভংকরের ফাঁকিটা এখানেই। পর্নকে নির্দোষ প্রমাণ করার বদলে এটা আসলে মানুষের যৌনতার ওপর পর্নের ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর প্রভাবের একটি প্রমাণ।

ব্যাপারটা একটু চিন্তা করুন। একই ধরনের পর্ন টানা ১৫ দিন; মাত্র ১৫ দিন দেখলেই মানুষের একঘেয়ে লাগতে শুরু করে। একই ধাঁচের পর্ন তাদের আর আগের মতো উত্তেজিত করতে পারে না। মনে করুন আপনি বিরিয়ানি খেতে পছন্দ করেন, এখন আপনাকে যদি ক্রমাগত কয়েকদিন ধরে বিরিয়ানি খাওয়ানো হতেই থাকে, হতেই থাকে, তাহলে একপর্যায়ে আপনি আর বিরিয়ানি খেতে চাইবেন না। এটাই স্বাভাবিক। তেমনিভাবে একই ঘরানার পর্ন ভিডিও বার বার দেখতে থাকলে তাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা খুবই স্বাভাবিক।

এমন অবস্থায় একঘেয়েমি দূর করার জন্য মানুষ কী করতে পারে? তারা বোরড হয়ে পর্ন দেখা ছেড়ে দেয়? অথবা তাদের আচরণ এবং যৌন-চাহিদার ওপর পর্নোগ্রাফির কোনো প্রভাব পড়ে না? আমরা কিন্তু ইতিমধ্যেই বুঝতে পারছি যে, কিছুটা হলেও যৌন-চাহিদার ওপর প্রভাব পড়ছে। কারণ, কয়েকদিন পর্ন দেখার পরই দর্শকের উত্তেজিত হবার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে সংবেদনশীলতা।

মানুষ সাধারণত প্রথম দিকে সফটকোর ঘরানার পর্ন দেখে। একসময় সফটকোর পর্ন তাদের কাছে একঘেয়ে লাগতে শুরু করে। তখন তারা ঝুঁকে হার্ডকোর পর্নোগ্রাফির দিকে। একসময় হার্ডকোর পর্নোগ্রাফিও তাদের উত্তেজিত করার জন্য যথেষ্ট হয় না। পর্ন-আসক্ত ব্যক্তি তখন ঝুঁকে আরও কড়া ধাঁচের পর্নোগ্রাফির দিকে। পশুকাম, শিশুকাম, রেইপপর্ন, ট্যাবু ইত্যাদি চরম বিকৃত ধরনের পর্ন দেখা শুরু করে।[10] একইসাথে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে পর্ন-আসক্তি। মানে পর্ন দেখার সময় ক্রমাগত বাড়তে থাকে। আসক্তির শুরুর দিকে কেউ সপ্তাহে এক ঘণ্টা পর্ন দেখলে, কিছুদিন পর সে হয়তো সপ্তাহে দুই ঘণ্টা পর্ন দেখবে, এভাবে ধীরে ধীরে পর্ন দেখার পরিমাণ বাড়তে থাকে। সেই সাথে বাড়তে থাকে পর্দায় দেখা জিনিসগুলো বাস্তব জীবনে অনুকরণ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

এখন কেউ হয়তো বলতে পারে, “যারা পর্ন দেখে তাদের সবাই কি ধর্ষণ কিংবা শিশুনির্যাতন শুরু করে? অবশ্যই না। তাই পর্নোগ্রাফি রেইপ কিংবা অন্যান্য যৌন-বিকৃতিকে প্রভাবিত করে, এমন বলা ভুল।“

এ কথাটা আসলে টোবাকো ইন্ডাস্ট্রির এ ভুল দাবির মতো যে, “যেহেতু অনেক ধূমপায়ীই ফুসফুস ক্যান্সারে মারা যায় না, তাই ধূমপান ফুসফুস ক্যান্সারের কারণ না।” পর্ন ভিডিও দেখেই সবাই রেইপ করতে বেড়িয়ে পরে না, এ কথা সত্য। কিন্তু এ থেকে কি এই উপসংহার টানা যায়, পর্ন আসলে ধর্ষণ প্রতিরোধ করে? দুটো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের দিকে তাকানো যাক।

১. সাধারণত পর্নোগ্রাফি দেখার পর মানুষ কী করে?

২. পর্নোগ্রাফি দেখা কি দর্শকের ওপর কোনো যৌন-মনস্তাত্ত্বিক (psychosexual) প্রভাব ফেলে?

প্রথম প্রশ্নের উত্তরটা সবার জানা। কেউ পর্ন দেখা শেষ করে চুপচাপ পড়াশোনা, অফিসের কাজ অথবা পরিবারের লোকজনের সাথে আলাপচারিতায় ফেরত যায় না। পর্ন দেখার পর অবশ্যই “ঠান্ডা” হতে হয়। কোনো কারণে তখনই সম্ভব না হলে, একটু নিরিবিলিতে, উপযুক্ত সুযোগ পাওয়ামাত্র ব্যক্তি “ঠান্ডা” হতে চায়। পর্ন দেখার পর অধিকাংশ মানুষ হস্তমৈথুন করে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পর্ন দেখা হয় হস্তমৈথুন করার জন্য। এটা একটা সার্কুলার লুপের মতো।

যদিও অধিকাংশ মানুষের কাছে সেক্সের তুলনায় হস্তমৈথুন যৌনক্রিয়া হিসাবে হয়তো “নিম্নমানের” অলটারনেটিভ, কিন্তু তবুও দিন শেষ হস্তমৈথুন একটা যৌনক্রিয়া। সুতরাং এ কথা আমরা সবাই স্বীকার করি যে, মানুষ পর্ন দেখে যৌনক্রিয়ায় (হস্তমৈথুন) লিপ্ত হয় অথবা যৌনক্রিয়ার আগে নিজেকে উত্তেজিত করার জন্য পর্ন দেখে। পর্ন দেখা, গান শোনা কিংবা নাটক দেখার মতো নিছক কোনো প্যাসিভ, নিষ্ক্রিয় বিনোদন না। বরং পর্ন দেখা এমন এক প্রক্রিয়ার অংশ যার সাথে বাস্তব যৌনক্রিয়া অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। পর্ন দেখার পর আপনি রিলিয খুজবেনই। এটাই স্বাভাবিক। পর্নোগ্রাফি এবং বীর্যপাতের আনন্দ অর্জন, একসূত্রে গাঁথা। যৌনক্রিয়ার মাধ্যমে বীর্যপাত বা শীর্ষসুখে পৌঁছানো হলো পর্ন দেখার স্বাভাবিক পরিণতি।[11] এটুকু পর্যন্ত স্বীকার করে নিতে সুস্থ মস্তিষ্কের কারও আপত্তি থাকার কথা না।

যদি এটুকু আপনি স্বীকার করে নেন তাহলে আসলে প্রশ্নটা দাঁড়ায়, আপনি কি মনে করেন সব ক্ষেত্রে এ “যৌনক্রিয়া” হস্তমৈথুনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? পর্ন-আসক্ত ব্যক্তি শুধু হস্তমৈথুনেই আগ্রহী হবে? চিন্তা করতে থাকুন, সেই ফাঁকে আমরা দ্বিতীয় প্রশ্নটার উত্তরের দিকে একটু নজর বুলিয়ে নিই।

পর্নোগ্রাফি দেখা কি দর্শকের ওপর কোনো যৌন-মনস্তাত্ত্বিক (psychosexual) প্রভাব ফেলে?

হ্যাঁ। পর্নোগ্রাফি দর্শকের যৌন-মনস্তত্ত্বের ওপর প্রভাব ফেলে। পর্নোগ্রাফিকে উপকারী প্রমাণ করার জন্য যে তত্ত্ব প্রচার করা হয়, সেটা দিয়েই এটা প্রমাণ করা যায়। একই ধরনের পর্ন একটানা দেখার কারণে একঘেয়ে লাগা—এটা একটা যৌন-মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। আগে যা দেখে দর্শক উত্তেজিত হচ্ছিল, এখন সেটাতে আর তার হচ্ছে না, এটা হলো যৌন-মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলাফল। পর্নের কারণে দর্শকের যৌনচাহিদা এবং যৌনচিন্তার ধরন বদলে যাচ্ছে।

পর্নে দেখা যৌনাচারগুলো ছাড়া সাধারণ যৌন আচরণ পর্ন-আসক্ত অনেকের কাছে একেবারেই পানসে মনে হয়। অনেকের জন্য পর্ন বা বিকৃত যৌনাচার ছাড়া স্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত হওয়া কঠিন হয়ে যায়, এটা আরেকটা প্রমাণ। পর্ন-আসক্ত ব্যক্তি বাস্তব জীবনে পর্ন ভিডিওতে দেখা কাজগুলোর অনুকরণ করতে চায়, এটা আরও একটা প্রমাণ।

পর্ন দেখে মানুষ শুধু রিলিয পাচ্ছে না, বিশেষ ধরনের যৌনাচারের জন্য তার মধ্যে তীব্র আকাঙ্ক্ষাও তৈরি হচ্ছে এবং শুধু এটুকুতেই আসলে ক্যাথারসিস থিওরি ভুল প্রমাণিত হয়ে যায়।[12]

এখানে একটা বিষয় হলো যৌন-মনস্তত্ত্বের ওপর পর্নোগ্রাফির এ প্রভাব সাথে সাথে কার্যকর হয় না। যারা পর্নোগ্রাফিকে উপকারী বলেন, তারা মূলত এ পয়েন্টের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের দাবি প্রমাণ করতে চান। কিন্তু সমস্যা হলো পর্নোগ্রাফির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী, সেটা তারা এড়িয়ে যান। পর্ন দেখেই কেউ রেইপ করতে বের হয়ে যায় না, কিন্তু তার মানে এটা না যে, এর কোনো প্রভাব তার ওপর পড়েনি। যৌন-মনস্তত্ত্বের ওপর পর্নোগ্রাফির যে প্রভাব সেটা ধীরে ধীরে কার্যকর হয়। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বার বার পর্নোগ্রাফি দেখার ফলে, তার চিন্তার কাঠামোতে পরিবর্তন আসে।

পর্ন-আসক্ত ব্যক্তি পর্ন দেখা বা পর্নের দৃশ্য নিয়ে ফ্যান্টাসাইয করা ছাড়া উত্তেজিত হতে পারে না। আবার ক্রমাগত পর্ন দেখতে থাকলে সময়ের সাথে সাথে পর্নের মাধ্যমে তার উত্তেজিত হবার ক্ষমতাও কমতে থাকে। আরও বেশি সহিংস, আরও বেশি বিকৃত পর্ন ছাড়া সে উত্তেজিত হতে পারে না। এ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে একপর্যায়ে সেক্স সম্পর্কে তার চিন্তা, বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক যৌন আচরণ থেকে একবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সহজ ভাষায় প্রথমত পর্নোগ্রাফি মানুষকে যৌনক্রিয়াতে তীব্রভাবে উদ্বুদ্ধ করে। আর দ্বিতীয়ত পর্নোগ্রাফির যৌনক্রিয়ার ব্যাপারে মানুষের প্রেফারেন্সকে বদলে দেয়। তার যৌনচাহিদা এবং যৌনমনস্তত্ত্ব বিকৃত হয়ে যায়।

একদিকে তার মধ্যে তীব্র যৌনাকাঙ্ক্ষা কাজ করে, অন্যদিকে স্বাভাবিকভাবে তৃপ্ত হওয়া তার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। নারী, বিয়ে, সেক্স, রেইপ, বিকৃত যৌনাচার ইত্যাদি নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণ বদলে যায়। এমন ব্যক্তির রেইপ, শিশুকাম কিংবা অন্য কোনো বিকৃত যৌনাচারে লিপ্ত হবার সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

“সিগারেট থেকে শুরু, শেষকালে হেরোইন”, ব্যাপারটা অনেকটা এমন। এটা মাদকাসক্তির ক্লাসিক প্যাটার্ন। শুরুতে অল্পেই নেশা হয়ে যায়। কিন্তু সময়ের সাথে চাহিদা বাড়তে থাকে। আগে যতটুকুতে “ধরত”, তাতে আর হয় না। নেশা চড়াতে আরও বেশি মাদকের দরকার হয়। সেই সাথে তৈরি হতে থাকে মাদকের ওপর ডিপেন্ডেস, আসক্তি। এভাবে মাদকাসক্তি ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়। পর্ন-আসক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও বিষয়টা এমন।

চিন্তা করে দেখুন, একজন পর্ন-আসক্ত ব্যক্তি যখন এমন অবস্থার মধ্যে দিয়ে যায়, তখন তার যৌন-মনস্তত্ত্বের কী অবস্থা হয়? নিত্যনতুন নারী কিংবা শিশুদেহের হার্ডকোর পর্নোগ্রাফি দেখেও যে লোক উত্তেজিত হতে পারে না, বাস্তবের রক্ত-মাংস-ঘামের নারীর সাথে স্বাভাবিক যৌনতা কি তাকে উত্তেজিত করতে পারবে? এভাবে একজন লোক যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে, যখন ধর্ষণের ভিডিও কিংবা শিশুদের ধর্ষণের ভিডিও পর্যন্ত তার কাছে একঘেয়ে লাগা শুরু করে, তখন সে কী করে? কী তাকে উত্তেজিত করবে? সে কি অতৃপ্তির জ্বালা, এ তীব্র ক্ষুধা নীরবে সয়ে যাবে? আপনি-আমি, আমরা সবাই জানি, তীব্র যৌনাকাঙ্ক্ষা নিছক “মনের জোরে” চেপে রাখা যায় না। সাময়িকভাবে পারা গেলেও সেটা স্থায়ী হয় না। এক সময় না এক সময় বিস্ফোরণ ঘটেই।

আসলে পর্নোগ্রাফি রিলিযের কাজ তো করেই না; বরং আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে এবং আসক্ত ব্যক্তিকে বিকৃত যৌনাচারের দিকে নিয়ে যায়। ফলে সমাজে যৌন-নিপীড়ন, শিশুকাম, রেইপসহ অন্যান্য বিকৃত কামের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। যার অনেক প্রমাণ আমরা ইতিমধ্যে আলোচনা করেছি, আরও অসংখ্য প্রমাণ চারপাশের পৃথিবীতে আপনি পাবেন। এত গেল যৌনচাহিদা এবং যৌন-মনস্তাত্ত্বিক দিকের কথা। এ ছাড়া কমন সেন্সের মাপকাঠিতেও ক্যাথারসিস থিওরি বা পর্নোগ্রাফি “উপকারী” হবার অন্য কোনো থিওরি, একেবারেই টেকে না। যদি কেউ বার বার ইয়াবা কিংবা হেরোইন খাবার ভিডিও দেখে, যদি এসব ভিডিওতে এ কাজগুলোকে গ্ল্যামারাইযড করে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে কি সমাজে ইয়াবা কিংবা হেরোইন ব্যবহার কমে যাবে? আচ্ছা ধরুন আপনাকে বলা হলো, বাংলাদেশের প্রাইমারি স্কুলগুলোতে শিক্ষক কর্তৃক শিশুদের শারীরিক আঘাত করার হার কমাতে। আপনি কি এটার সলিউশান হিসাবে এসব শিক্ষকদের বলবেন, ছোট বাচ্চাদের পেটানোর এবং টর্চার করার নতুন নতুন ভিডিও নিয়ম করে দেখতে?

নানা আঙ্গিকে, নানা লোকেশানে চাকচিক্যময় ও জাঁকজমকপূর্ণভাবে ছোট বাচ্চাদের মারা এবং মার খেতে দেখার ভিডিও কি তাদের পেটানোর ইচ্ছা ও মানসিকতাকে নষ্ট করে দেবে? সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো মানুষ কি আদৌ এ ধরনের “সমাধান” সিরিয়াসলি নেবে? পর্ন দেখার সাথে যদি রেইপের হার কমে, তাহলে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পর্ন প্রডিউস করা এবং পর্নোগ্রাফির সবচেয়ে বড় গ্রাহক অ্যামেরিকাতে কেন এত রেইপ হয়? কেন অ্যামেরিকান মিলিটারি, কলেজ, হলিউড সব জায়গাতে এত ধর্ষণ, এত যৌন-নিপীড়ন হয়? কেন রেইপ পর্ন ইন্ডিয়াতে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকার পরও ভারতে রেইপ না কমে বরং ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়? স্রেফ স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে এ ধরনের গোঁজামিল দেয়া কথা ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফির মতো এতটা ক্ষতিকর বিষয়কে “নির্দোষ বিনোদন” প্রমাণ করার প্রপাগ্যান্ডা চালানো হয়। হস্তমৈথুনের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই রকম। বর্তমান সময়ের অধিকাংশ ডাক্তার, এক্সপার্ট এবং ইন্টারনেট ওয়েবসাইট আপনাকে বলবে, হস্তমৈথুন একেবারেই ক্ষতিকর না।

এদিক-সেদিক থেকে নানা জোড়াতালি দেয়া প্রমাণ তুলে এনে প্রমাণ করতে চাইবে হস্তমৈথুন “প্রায় নিশ্চিতভাবেই” শরীরের জন্য ভালো। এটা একেবারেই “ন্যাচারাল” একটি বিষয়, এ নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই। হস্তমৈথুন শরীরের জন্য ভালো বা স্বাভাবিক যৌন আচরণ এ ধরনের কোনো কংক্রিট প্রমাণ নেই। হস্তমৈথুন “স্বাভাবিক”, “ন্যাচারাল” এসব কথার প্রচলন আজ থেকে মাত্র সাত-আট দশক আগে। এর আগ পর্যন্ত হস্তমৈথুনকে, বিশেষ করে নিয়মিত ও ক্রনিক হস্তমৈথুনকে একটি অস্বাভাবিক যৌনাচার হিসাবেই দেখা হতো। এমনকি নানা যৌনবিকৃতিকে হোয়াইটওয়াশ করা, সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতো বিকৃত মানসিকতার লোকও হস্তমৈথুনক অস্বাভাবিক মনে করত।

মূলত হস্তমৈথুনকে স্বাভাবিক এবং উপকারী হিসেবে দেখার প্রবণতা শুরু হয় ১৯৪৯ সালে আলফ্রেড কিনসির Sexual Behavior In The Human Male প্রকাশিত হবার পর। এ বইটি এবং ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত তার আরেকটি বই Sexual Behavior in the Human female, ম্যাস মিডিয়ার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পাশ্চাত্যে ঝড় তোলে। যৌনতা সম্পর্কে পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে আনে আমূল পরিবর্তন। পাশ্চাত্যের ইতিহাসের অন্য কোনো বই বা রিপোর্ট পাশ্চাত্যকে এতটা বদলে দেয়নি যেমন এই দুটি বই দিয়েছিল। আধুনিক সেক্স এডুকেশান, সাইকোলজি এবং সেক্স সম্পর্কে চিকিৎসকদের সার্বিক চিন্তা কিনসির এই দুটি বইয়ের ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হচ্ছে। যৌনতা সম্পর্কে আধুনিক পশ্চিমা ধারণা একেবারে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে আলফ্রেড কিনসির এই দুই বিখ্যাত “থিসিসের” ওপর ভিত্তি করে। তার এ বইয়ে কিনসি চরম পর্যায়ের বিকৃত কিছু চিন্তাকে বিজ্ঞানের নামে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। সে দাবি করে শিশুরা জন্মগত ভাবেই, এমনকি গর্ভে থাকা অবস্থা থেকেই সেক্সুয়ালি এক্টিভ। তার মতে শিশুরা একেবারে ছোটকাল থেকেই হস্তমৈথুন করা শুরু করে।

কত ছোটকাল থেকে?

কিনসির দাবি হল দুই, চার, সাত মাস বয়সী শিশুরাও নাকি হস্তমৈথুনের মাধ্যমে চরমানন্দে (Orgasm) পৌঁছাতে সক্ষম! সাত মাস বয়সী একটি শিশু এবং এক বছরের নিচের আরও পাঁচজন শিশুকে সে নিজে নাকি শীর্ষসুখ অর্জন করতে দেখেছে।[13] সে আরও বলে, এত কমবয়স্ক শিশুরা বয়স্ক সঙ্গী/সঙ্গিনীদের সঙ্গে আনন্দদায়ক এবং উপকারী যৌনমিলন করতেই পারে, এবং এমন করা উচিত।[14] অভিভাবকদের উচিত ৬-৭ বছর বয়স থেকে শুরু করে শিশুদের হস্তমৈথুন করানো এবং একসাথে মিলেমিশে হস্তমৈথুন করা!

কিনসি আরও দাবি করে, অধিকাংশ মানুষ আসলে উভকামী, যৌনতার কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠি নেই। কোনো যৌনতাই অস্বাভাবিক না। সমকাম, উভকাম, শিশুকাম, পশুকাম, অজাচার, যার যা ইচ্ছে সেটা করবে, এতে কোনো সমস্যা নেই।[15]

আসলে কিনসি নিজে ছিল একজন চরম মাত্রার বিকৃত মানসিকতার লোক। ব্যক্তিজীবনে ভয়ঙ্কর বিকৃত যৌনাচারে অভ্যস্ত। তার “রিসার্চ” ছিল জালিয়াতিতে ভরা। পরবর্তীকালে এই “মহান” বিজ্ঞানীর কাজগুলো ভুল প্রমাণিত হয়েছে বিজ্ঞানীদের হাতেই। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন আলফ্রেড কিনসির দাবিগুলোর তেমন কোনো সায়েন্টিফিক ভিত্তি নেই, তার তথ্য-উপাত্তগুলো যথেষ্ট পরিমাণে গোঁজামিলে ভরপুর।[16] এক্সপেরিমেন্ট করার জন্য অনেক সময় সাবজেক্টের ওপর চরম যৌন-নির্যাতন চালানো হয়েছে, রেহাই দেয়া হয়নি শিশুদেরও। কিন্তু ততদিনে ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে। “হস্তমৈথুন ক্ষতিকর না; বরং উপকারী” কিনসির জোর গলায় দাবি করা এ চরম মিথ্যা সেক্স এডুকেশানের বইগুলোতে বার বার খুব বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং এটাকে ধ্রুব সত্য বলে মেনে নিতে বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু হস্তমৈথুন যদি স্বাভাবিক ও ভালো হয়, তাহলে প্রথমবার হস্তমৈথুনের পর কেন মনের ওপর অনুশোচনার একটা গাঢ় পর্দা নেমে আসে?

প্রথমবার হস্তমৈথুনের মাধ্যমে বীর্যপাত করার প্রায় সবার চরম অনুশোচনা হয়। ভাষা, ভৌগোলিক অবস্থান, ধর্ম-বর্ণভেদে এমন অবস্থায় মানুষের মনে হয় সে খুব খারাপ কিছু একটা করে ফেলেছে। অনুভূতিটা সর্বজনীন। এর ব্যাখ্যা কী? হস্তমৈথুন ভালো প্রমাণ করতে চাওয়া “বিশেষজ্ঞরা” বলবে, ধর্ম এবং সামাজিক মূল্যবোধ আমাদের চিন্তা করতে শেখায় যে, এ কাজটা খারাপ। এটা একটা পাপ। আর এ জন্যই মানুষের মধ্যে অনুশোচনা কাজ করে।

এ ব্যাখ্যার ভুল কোথায়?

কোনো কাজের ব্যাপারে ধর্মের বক্তব্য দ্বারা প্রভাবিত হবার জন্য আপনাকে তো আগে কাজটাকে চিনতে হবে, সেটার সম্পর্কে ধর্মের বক্তব্য জানতে হবে। কিন্তু আপনি দেখবেন হস্তমৈথুনের মাধ্যমে প্রথম বীর্যপাতের অভিজ্ঞতার সময় অনেকেরই ধারণাই থাকে না আসলে কী হচ্ছে। যে ছেলেটা বুঝতেই পারছে না কী হলো, সে কীভাবে ওই কাজের ব্যাপারে ধর্মের বক্তব্য জানবে, আর সেটা দিয়ে প্রভাবিত হবে? আসলে এটাই হলো ফিতরাহ, মানুষের সহজাত প্রবণতা (Natural Disposition)। মানুষের সহজাত নৈতিক কম্পাস তাকে জানিয়ে দেয় কাজটা খারাপ। আর তাই প্রথম প্রথম সবাই অনুশোচনায় ভোগে। কিন্তু পরে মানুষ এর যৌক্তিকতা দাঁড় করায়, একে স্বাভাবিক মনে করা শুরু করে।

এ ছাড়া বাস্তব অভিজ্ঞতাও প্রমাণ করে হস্তমৈথুন আসক্তি শুধু সমস্যাই না; বরং ভয়ঙ্কর রকমের মনোদৈহিক সমস্যা। ভুক্তভোগীদের কিছু অভিজ্ঞতা এরই মধ্যে আমরা আপনাদের সামনে তুলে ধরেছি। হস্তমৈথুনে আসক্তদের এমন করুণ উপাখ্যান এক-দুটো না। অজস্র।

হস্তমৈথুনকে স্বাভাবিক প্রমাণে উঠেপড়ে লাগার পেছনে আরেকটা বড় কারণ হলো, সেই পুরনো কালপ্রিট—অর্থনীতি। হস্তমৈথুন আসক্তি আর পর্নোগ্রাফি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। এ দুয়ে মিলে এক চক্র তৈরি করে। আর এ চক্রে আটকা পড়ে শত সহস্র প্রাণ। যদি হস্তমৈথুনকে ক্ষতিকর বলে স্বীকার করে নেয়া হয়, হস্তমৈথুন না করতে মানুষকে উৎসাহ দেয়া হয়, হস্তমৈথুন আসক্তি বন্ধে কাউন্সেলিং করা হয়, তাহলে শত বিলিয়ন ডলারের পর্নোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির কী হবে? এ অতিকায় ইন্ডাস্ট্রি কি নিজ অস্তিত্বের প্রতি এমন হুমকিকে মেনে নেবে? নাকি নিজের অঢেল সম্পদ ব্যবহার করে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে অ্যাকাডেমিয়া, মিডিয়া এবং “বিশেষজ্ঞদের” মাধ্যমে হস্তমৈথুনকে স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রমাণে?

পরের বার “কেন হস্তমৈথুন ভালো”, “হস্তমৈথুনের ১৮ অজানা উপকারিতা” জাতীয় ইন্টারনেট আর্টিকেলগুলো পড়ার সময় এ বিষয়টা মাথায় রাখবেন।

সর্বোপরি মুসলিম হিসাবে আমাদের ফ্রেইম অফ রেফারেন্স কোনটা আগে সেটা আমাদের বুঝতে হবে। এতক্ষণ যা কিছু আমরা আলোচনা করেছি, এ সবকিছু হলো সেকেন্ডারি, গৌণ প্রমাণ। মুসলিম হিসাবে আমাদের জন্য প্রাইমারি প্রমাণ হলো ইসলামী শারীয়াহর বক্তব্য। আর ইসলামের বক্তব্য হলো হস্তমৈথুন হারাম।[17] একজন মুসলিমের জন্য প্রমাণ হিসাবে এটাই যথেষ্ট হওয়া উচিত। যেখানে ইসলামের স্পষ্ট বিধান আছে সেখানে বিজ্ঞানের “প্রায় নিশ্চিত” মত গোনায় ধরার মতো কিছু না। বিশেষ করে বিষয়টি যখন নৈতিকতার সাথে সম্পর্কিত। যেমন বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিয়ে-বহির্ভূত সেক্স ক্ষতিকর কিছু না। বরং আধুনিক পশ্চিমা দর্শনে এটা স্বাভাবিক, এমনকি প্রশংসনীয়। অন্যদিকে যিনা ইসলামের দৃষ্টিতে কবিরা গুনাহ। বিজ্ঞান যদি কাল থেকে যিনাকে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলে প্রচার করা শুরু করে, তাহলে এতে একজন মুসলিমের কিছুই যায় আসে না। যিনার ব্যাপারে তার ধারণা এতে বদলে যাবে না।

সুতরাং হস্তমৈথুন যদি কখনো বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সুনিশ্চিতভাবে স্বাস্থ্যকর বলে প্রমাণিতও হয় (যেটা এখনো হয়নি) তবুও এতে একজন মুসলিমের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আসার কথা না, কারণ ইসলামের মাপকাঠিতে কাজটা অনৈতিক এবং হারাম। আর বাস্তবতা হলো মনোদৈহিকভাবে হস্তমৈথুন এবং পর্ন-আসক্তি দুটোই অত্যন্ত ক্ষতিকর। আমরা ইতিমধ্যেই আলোচনা করেছি কীভাবে এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিবার ও সমাজ কেউই মুক্তি পায়নি।

পর্ন-আসক্তি আর হস্তমৈথুনের চক্র ব্যক্তির জীবনকে হতাশা, গ্লানি আর পুনরাবৃত্তির চোরাবালিতে আটকে ফেলে। এ বৃত্তে আটকা পরে তিলে তিলে ক্ষয়ে যেতে থাকে শত সহস্র মানবাত্মা। এ চক্র ভাঙার, এ বৃত্তের বাইরে যাবার উপায় কী? আদৌ কি সম্ভব?

পড়ুন- http://lostmodesty.com/tag/ঝেটিয়ে-বিদায়-করুন-বেয়াড়া/

 

রেফারেন্সঃ

[1] Voyeurism – ঈক্ষণকামিতা। অপরের যৌনক্রিয়া দেখে যৌন তৃপ্তি পাওয়া।

[2] Pornography addiction: A neuroscience perspective,Donald L. Hilton, Jr and Clark Watts – https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3050060/]

[3] How Big is the Porn Industry? – http://bit.ly/2AVUgxT

[4] How large is the adult entertainment industry? – http://to.pbs.org/2FxiEt7

[5] Bart & Jozsa, 1980, p. 210

[6] Kelly, Wingfield, & Regan, 1995, p. 23

[7] Catharine A. MacKinnon, “X-Underrated: Living in a World the Pornographers Have Made,” in Big Porn Inc., edited by Melinda Tankard Reist and Abigail Bray, 9–15. North Melbourne, Australia: Spinifex Press, 2011

[8] Sommers & Check, 1987

[9] Diamond, 1980; Howard, Reifler, & Liptzin, 1991

[10] Zillmann & Bryant, 1986, p. 577

[11] Cline, 1974; Osanka & Johann, 1989.

[12] Sommers & Check, 1987

[13] Sex education as bullying, page 7

[14] Kinsey, Sex and Fraud, page 3

[15] Ibid, page 2

[16] Ibid, page 1

[17] Ruling on masturbation and how to cure the problem – https://islamqa.info/en/329

শেয়ার করুনঃ
“পাঠক, সাবধান!  ভয়ের জগতে প্রবেশ করছ তুমি!!”

“পাঠক, সাবধান! ভয়ের জগতে প্রবেশ করছ তুমি!!”

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম ।

“পাঠক, সাবধান!
ভয়ের জগতে প্রবেশ করছ তুমি!!”
.
অপ্রত্যাশিতভাবে অনির্ধারিত কালের জন্য ছুটি পাওয়া গেছে। নানা কারনে নজরদারী নেই, জবাবদিহিতা নেই। চিন্তাহীন এবং আনন্দময় একটা সময়। আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগের কথা। সকাল ন’টার মতো বাজছে। রোদ মাথায় নিয়ে হাকডাক করতে করতে ওয়ার্কাররা বাসার সামনের আন্ডার-কন্সট্রাকশান বিল্ডিং-এর ছাদ ঢালাই –এর কাজ করছে। নাস্তা শেষে এক তলার সামনের বারান্দাতে গল্পের বই নিয়ে বসলেও পুরোটা মনোযোগ বইয়ের দিকে নেই। পড়া ফেলে মাঝে মাঝেই এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। পাহাড়ী এলাকায় বাসা। কিংবা বলা যায় পাহাড় কেটে বানানো আবাসিক এলাকা। বারান্দার ডান দিক ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের খন্ডিত ছিটেফোঁটা।
.
বিক্ষিপ্ত ভাবে এদিক ওদিক তাকাবার সময় খেয়াল হল বারান্দার পাশে পাহাড়ের খন্ডিত ছিটেফোটার অংশে দাড়ানো কেউ একজন আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বই থেকে পুরোপুরি মাথা না উঠিয়ে আড়চোখে তাকালাম। সমবয়েসী একটা ছেলে। জীর্ন-মলিন পোশাক। সম্ভবত পাতা কুড়োতে এই দিকে আসা। মনে হল আমার চাইতে হাতে ধরা বইয়ের প্রতিই দর্শনার্থীর মনোযোগ বেশি। আড়চোখে ছেলেটাকে বার দুয়েক দেখে নিয়ে কায়দা করে বইটাকে ঘুরিয়ে ধরলাম যাতে ছেলেটা পুরো প্রচ্ছদটা দেখতে পায়। মনে মনে এক গাল হেসে নিলাম। স্বাভাবিক। কেনার সময়ই বইটার প্রচ্ছদে চোখ আটকে গিয়েছিল। বইটার গল্প নিয়ে আমি সন্দিহান ছিলাম। তবুও বলা যায় প্রচ্ছদের আকর্ষনেই অন্যান্য বইগুলোকে ফেলে এ বইটাকে বেছে নেওয়া। মনে মনে বারকয়েক নিজের পিঠ চাপড়ে দিলাম। কাজ ফেলে সমবয়েসী একটা ছেলে আমার বইয়ের প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে থাকা নিঃসন্দেহে আমার সিদ্ধান্তের যথার্থতার অকাট্য প্রমান।
.
বইটা ছিল সেবা প্রকাশনীর জনপ্রিয় কিশোর হরর সিরিযের। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে এক্স-ফাইলস, গুসবাম্পস, রসওয়েল সহ হরর/থ্রিলার/সায়েন্স ফিকশান জাতীয় বিভিন ওয়েস্টার্ন টিভি সিরিয ও সিনেমার জনপ্রিয়তার সময়ে শুরু হয়েছিল “কিশোর হরর” সিরিযের। সেবা প্রকাশনীর নিয়মিত পাঠকদের কাছে, বিশেষ করে স্কুল পড়ুয়া “তিন গোয়েন্দা” পাঠকদের কাছে খুব দ্রুতই জনপ্রিয় ওঠে কিশোর হরর সিরিয। হরর সিরিযের জনপ্রিয়তার প্রভাবে কিছুদিন তিন গোয়েন্দা সিরিয থেকেও “কিশোর চিলার” নামে কিছু বই প্রকাশ করা হয়। আমার হাতে ধরা বইটার নাম ছিল বৃক্ষমানব। প্রচ্ছদে ছিল সবুজ রঙের বিকৃত বিকট এক মুখের ছবি। ৯৭ এ প্রকাশিত “বৃক্ষমানব” ছিল সেবা-র কিশোর হরর সিরিযের প্রথম দিকের বই এবং আমাদের (আমার ও আপুর জয়েন্ট ভেনচার) কেনা কিশোর হরর সিরিযের প্রথম বই। লেখকের নাম, টিপু কিবরিয়া।
.
.
২.
সেবার কিশোর হরর সিরিয আর সিরিযের লেখকের নাম নানা কারন প্রায় ভুলতে বসেছিলাম। বই পড়ার নেশা দীর্ঘদিন ভোগালেও ইংরেজি গল্প আর টিভি-শোর মধ্যম মানের নকল পড়ার চাইতে সোর্স ম্যাটেরিয়াল পড়াটাই বেশি লজিকাল মনে হত। এছাড়া স্কুলের দিনগুলোতে সম্পূর্ণ অবসর সময়টা বইয়ের জন্য বরাদ্দ থাকলেও সময়ের সাথে সাথে ক্রমান্বয়ে বইয়ের জন্য বরাদ্দটা কমতে থাকে। টিপু কিবরিয়ার বিস্মৃতপ্রায় নামটা মনে করিয়ে দেয় ২০১৪ এর জুন থেকে অগাস্ট পর্যন্ত প্রকাশিত বেশ কিছু নিউয রিপোর্ট। প্রায় দু’মাস ধরে প্রকাশিত এসব রিপোর্টের সারসংক্ষেপ পাঠকের জন্য এখানে তুলে ধরছি।
.
আন্তর্জাতিক শিশু পর্নোগ্রাফির ভয়ঙ্কর একটি চক্র বাংলাদেশে বসেই দীর্ঘ নয় বছর পথশিশুদের ব্যবহার করে পর্নো ভিডিও তৈরি করে আসছিল। আন্তর্জাতিক শিশু পর্নোগ্রাফির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দেশের তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ২০১৪ এর ১০ জুন ইন্টারপোলের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে শিশু পর্ণোগ্রাফি তৈরির দায়ে সিআইডি গ্রেফতার করে টি আই এম ফখরুজ্জামান ও তার দুই সহযোগীকে। সিআইডির পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম জানান, এ চক্র আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী ছেলেশিশুদের দিয়ে পর্নো ছবি তৈরি করতো। এ চক্রের মূল হোতা টি আই এম ফখরুজ্জামান টিপু কিবরিয়া নামে অধিক পরিচিত। তার বাইরের পরিচয় তিনি দেশের একটি খ্যাতনামা প্রকাশনা সংস্থার কিশোর থ্রিলার ও হরর সিরিজের লেখক। এছাড়া তার বেশ কিছু শিশুতোষ গল্প উপন্যাসের বইও রয়েছে। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে এখন তার অন্ধকার জগতের পরিচয়ই সামনে চলে এসেছে।
.
১৯৯১ সাল থেকে ১০ বছর টিপু সেবা প্রকাশনীর কিশোর পত্রিকার সহকারী সম্পাদক ছিলেন। ২০০৩ সাল থেকে ফ্রি-ল্যান্স আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেন। গড়ে তোলেন একটি ফটোগ্রাফিক সোসাইটিও। রাজধানীর মুগদায় তার একটি স্টুডিও রয়েছে। এ সময় তার তোলা ছেলে পথশিশুদের স্থির ছবি ইন্টারনেটে বিশেষ করে ফেসবুক, টুইটারম ফ্লিকারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করতেন। এই ছবি দেখে সুইজারল্যান্ড ও জার্মানির পর্নো ছবির ব্যবসায়ীরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে নগ্ন ছবি পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। বিনিময়ে টাকারও প্রস্তাব দেয়া হয়। প্রস্তাবে রাজি হয় টিপু। ফুঁসলিয়ে ও টাকার বিনিময়ে পথশিশুদের সংগ্রহ করে নগ্ন ছবি তুলে পাঠাতে শুরু করেন।
.
কিছু ছবি পাঠানোর পরই পর্নো ছবি পাঠানোর প্রস্তাব দেয়া হয় তাকে। শুরু হয় এই পর্নো ছবি (ভিডিও) তৈরির কাজ। সময়টা ২০০৫ সাল। নুরুল আমিন ওরফে নুরু মিয়া, নুরুল ইসলাম, সাহারুলসহ কয়েকজনের মাধ্যমে বস্তিসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে ছিন্নমূল ছেলে শিশুদের সংগ্রহ করেন টিপু। মুগদার মানিকনগরের ওয়াসা রোডের ৫৭/এল/২ নম্বর বাড়ির নিচতলায় দুই রুমের বাসা ভাড়া নিয়ে জমে ওঠে ফ্রি-ল্যান্স ফটোগ্রাফির আড়ালে পথশিশুদের দিয়ে পর্নো ছবি নির্মাণ ও ইন্টারনেটে বিদেশে পাঠানোর রমরমা ব্যবসা। নয় বছরে কমপক্ষে ৫০০ শিশুর পর্ণোগ্রাফিক ভিডিও তৈরি করে টিপু ও তার সহযোগীরা। ৮-১৩ বছরের এসব পথশিশুদের ৩০০-৪০০ টাকা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে এ কাজে ব্যবহার করা হতো।
.
টিপু এবং তার ওই সহযোগীরা শিশুদের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচারে লিপ্ত হতেন। আর বেশির ভাগই এসব ভিডিও করতেন টিপু নিজেই। একপর্যায়ে এই জঘন্য অপরাধ টিপুর নেশা ও পেশায় পরিণত হয়ে যায়। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে টিপু বলেছেন, তিনি পর্নো ছবি তৈরি করে জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডের তিন ব্যক্তির কাছে পাঠাতেন। এঁদের একেকজনের কাছ থেকে প্রতি মাসে তিনি ৫০ হাজার করে দেড় লাখ টাকা পেতেন। তবে তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি জানিয়েছে, টিপু কিবরিয়া তাঁর তৈরি পর্নো ছবি ১৩টি দেশের ১৩ জন নাগরিকের কাছে পাঠাতেন। এসব দেশের মধ্যে আছে কানাডা, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, মধ্য ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ। তদন্তে আরো জানা গেছে বেশির ভাগ ছবি ও ভিডিও পাঠানো হতো জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডে। এরপর সেখানকার ব্যবসায়ীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এসব পর্নো ছবি বিক্রি করতো। প্রতিটি সিডির জন্য ৩শ’ থেকে ৫শ’ ডলার পেতেন টিপু। এই টাকা অনলাইন ব্যাংকিং ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে টিপুর কাছে পাঠানো হতো।
.
টিপুর মাধ্যমে শিশু পর্নো ছবি বিক্রির দুই হোতা বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন। চলতি বছরের প্রথম দিকে জার্মানির এক পর্নো ছবি বিক্রেতা বাংলাদেশে এসেছিলেন। আর ২০১২ সালে আসেন সুইজারল্যান্ডের আরেক পর্নো বিক্রেতা। তারা ওঠেন ঢাকার আবাসিক হোটেলে। সে সময় টিপু তাদের কাছে ছেলে শিশু পাঠান। তারা ওই শিশুদের নিয়ে বিকৃত যৌনাচারে লিপ্ত হন। এজন্য টিপু এবং তার সহযোগীরা পেয়েছেন ৮ হাজার ডলার।

.

ইন্টারপোলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১০ ও ১১ জুন খিলগাঁও, মুগদা এবং গোড়ানে অভিযান চালিয়ে টিপু কিবরিয়া এবং তার তিন সহযোগী নুরুল আমিন, নুরুল ইসলাম ও সাহারুলকে গ্রেফতার করে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম টিম। স্টুডিওতে আপত্তিকর অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ১৩ বছরের এক শিশুর সাথে টিপুর সহযোগী নুরুল ইসলানকে। টিপুর খিলগাঁওয়ের তারাবাগের ১৫১/২/৪২ নম্বর বাড়ির বাসা ও স্টুডিও থেকে শতাধিক পর্নো সিডি, আপত্তিকর শতাধিক স্থির ছবি, ৭০টি লুব্রিকেটিং জেল, ৪৮ পিস আন্ডারওয়ার, স্টিল ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা, কম্পিউটার হার্ডডিস্ক, সিপিইউ, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
.
http://bit.ly/2atUZJi
http://bit.ly/2aQzPe9
http://bit.ly/2atZg5N
http://bit.ly/2aPjZjN
http://bit.ly/2aPjTsf
http://bit.ly/2aPkiuM
http://bit.ly/2auZpmn
http://bit.ly/2atZFVN
.
টিপু কিবরিয়ার ফ্লিকার লিঙ্ক – http://bit.ly/2b1ZXiu
টিপু কিবরিয়ার ব্লগ (সামওয়্যার ইন ব্লগ) লিঙ্ক – http://bit.ly/2aHYxuv
.
উপরের তথ্যগুলো ভয়ঙ্কর। তবে বাস্তব অবস্থা এর চেয়ে লক্ষগুন বেশি ভয়ঙ্কর। টিপু কিবরিয়ারা একটা বিশাল নেটওয়ার্কের ছোট একটা অংশ মাত্র। বিশ্বব্যাপী চাইল্ড পর্ণোগ্রাফি ও পেডোফাইল নেটওয়ার্কের ব্যাপ্তি, ক্ষমতা ও অবিশ্বাস্য অসুস্থ অমানুষিক নৃশংসতার প্রকৃত চিত্র এতোটাই ভয়াবহ যে প্রথম প্রথম এটা বিশ্বাস করাটা একজন ব্যাক্তির জন্য কঠিন হয়ে যায়। আর একবার এ অসুস্থতা ও বিকৃতির বাস্তবতা, মাত্রা, প্রসার, ও নাগাল সম্পর্কে একবার জানার পর এ ভয়াবহতাকে মাথা থেকে দূর করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের চারপাশের বিকৃত অসুস্থ পৃথিবীটার এ এমন এক বাস্তবতা যা সম্পর্কে জানাটাই একজন মানুষের মনকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। এ এমন এক অন্ধকার জগত যাতে মূহুর্তের জন্য উকি দেওয়া একজন মানুষকে আমৃত্যু তাড়া করে বেড়াতে পারে।
.
টিপু কিবরিয়ার লেখা কিশোর হরর সিরিযের বইগুলোর ব্যাক কাভারে সবসময় দুটা লাইন দেয়া থাকতো – “পাঠক, সাবধান! ভয়ের জগতে প্রবেশ করছ তুমি!!” এ লাইনদুটো কিশোর হরর সিরিযের ট্যাগলাইনের মতো ছিল। সেবার বইগুলোর পাতায় উঠে আসা অন্ধকারের কল্পিত গল্পগুলোর জন্য লাইনদুটোকে অতিশয়োক্তি মনে হলেও, যে অন্ধকারে বাস্তবর জগতের চিত্র তুলে ধরতে যাচ্ছি তার জন্য এ লাইনদুটোকে কোনক্রমেই অত্যুক্তি বলা যায় না। তাই টিপু কিবরিয়াকে দিয়ে যে গল্পের শুরু সে গল্পের গভীরে ঢোকার আগে টিপুর ভাষাতেই সতর্ক করছি–
.
“পাঠক, সাবধান!
ভয়ের জগতে প্রবেশ করছ তুমি!!”
.
.
৩.
টিপু কিবরিয়াকে যদি ম্যানুফ্যাকচারার হিসেবে চিন্তা করেন তবে তার বানানো শিশু পর্ণোগ্রাফির মূল ডিস্ট্রিবিউটার এবং ব্যবহারকারীরা হল পশ্চিমা বিশেষ করে ইউরোপিয়ানরা। শুধুমাত্র চোখের ক্ষুধা মেটানোয় তৃপ্ত না হয়ে টিপুর এ ইউরোপিয়ান ক্রেতাদের মধ্যে কেউ কেউ বাংলাদেশে ঘুরে গেছে। কিছু ডলারের বিনিময়ে টিপু কিবরিয়া তার ইউরোপিয়ান ক্রেতাদের জন্য তৃপ্তির ব্যবস্থা করেছে। দুঃখজনক সত্য হল, পেডোফিলিয়া নেটওয়ার্ক ও চাইল্ড পর্ণোগ্রাফির বিশ্বব্যাপী ধারা এটাই। ঠিক যেভাবে নাইকি-র মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো কম খরচে তাদের পোশাকের চাহিদা মেটানোর জন্য ম্যানুফাকচারিং এর কাজটা “তৃতীয় বিশ্বের” দেশগুলোর কাছে আউটসোর্স করে, ঠিক তেমনিভাবে পশ্চিমারা বিকৃতকামীরা শিশু পর্নোগ্রাফি তৈরি এবং শিশুকামের জন্য শিশু সংগ্রহের কাজটা আউটসোর্স করে। টিপু কিবরিয়ার মতো এরকম এ ইন্ডাস্ট্রির আরো অনেক ম্যানুফ্যাকচারার ছড়িয়ে আছে বিশ্বজুড়ে। তিনটি উদাহরন তুলে ধরছি-
.
.
রিচার্ড হাকল – ১৯৮৬ তে ব্রিটেনে জন্মানো হাকল তার “নেশা ও পেশার” বাস্তবায়নের জন্য বেছে নেয় দক্ষিন পূর্ব এশিয়াকে। লাওস, ক্যাম্বোডিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ইন্ডিয়াতে পদচারনা থাকলেও হাকল তার মূল বেইস হিসেবে বেছে নেয় মালয়শিয়াকে। কুয়ালামপুরের আশেপাশে বিভিন্ন দারিদ্র দারিদ্রকবলিত অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর মাঝে সক্রিয় খ্রিষ্টান মিশনারীদের সাথে সম্পর্কের কারনে সহজেই হাকল মালয়শিয়াতে নিজের জন্য জায়গা করে নেয়। কখনো ফ্রি-ল্যান্সিং ফটোগ্রাফার, কখনো ডকুমেন্টারি পরিচালক, কখনো ইংরেজী শিক্ষক, আর কখনো নিছক খ্রিষ্টান মিশনারী হিসেবে মালয়শিয়া সহ দক্ষিন এশিয়ার বিভিন্ন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিশুদের কাছাকাছি পৌছুতে সক্ষম হয় হাকল।
.
২০০৬ থেকে শুরু করে প্রায় ৮ বছরের বেশি সময় ধরে দক্ষিন এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দরিদ্র শিশুদের উপর যৌন নির্যাতন চালায় হাকল। তার নির্যাতনের শিকার হয় ৬ মাস থেকে ১৩ বছর বয়সী দুইশ’র বেশি শিশু। গ্রেফতারের সময় তার ল্যাপটপে পাওয়া যায় বিশ হাজারের বেশি পর্ণোগ্রাফিক ছবি। শিশু ধর্ষনের ভিডি এবং ছবি ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিক্রি করতো হাকল। ছবি ও ভিডিওর সাথে যোগ করতো বিভিন্ন মন্তব্য, ক্যাপশান। এরকম একটি ওয়েবপোষ্টে হাকল লেখে –
“পশ্চিমা মধ্যবিত্ত ঘরের শিশুদের চাইতে দরিদ্রদের শিশুদের পটানো অনেক, অনেক বেশি সহজ।“
.
তিন বছর বয়েসী একটি মেয়ে শিশুকে ধর্ষনরত অবস্থা ছবির নিচে গর্বিত হাকলের মন্তব্য ছিল – “আমি টেক্কা পেয়ে গেছি! আমার কাছে এখন একটা ৩ বছরের বাচ্চা আছে যে কুকুরের মতো আমার আনুগত্য করে। আর এ নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো কেউ এখানে নেই!”
.
অন্যান্য শিশুকামীদের জন্য পরামর্শ এবং বিভিন্ন গাইডলাইন সম্বলিত “Paedophiles And Poverty: Child Lover Guide”” নামে একটি বইও লিখেছিল রিচার্ড হাকল। হাকলের স্বপ্ন ছিল দক্ষিন এশীয় গরীব কোন মেয়েকে বিয়ে করে একটি অনাথ আশ্রম খোলা যাতে করে নিয়মিত নতুন দরিদ্র শিশুদের সাপ্লাই পাওয়া যায় কোন ঝামেলা ছাড়াই। ২০১৪ সালে রিচার্ড হাকলকে গ্রেফতার করা হয়।
.
http://bit.ly/2ahsaVd
http://bit.ly/2azfNjo
http://bit.ly/2aMBJeb
http://bit.ly/2auZWEM
http://bit.ly/2aAOeXx
.
.
ফ্রেডি পিটস – হাকলের জন্মের আগেই হাকলের স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করেছিল ফ্রেডি পিটস। সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে ১৯৯১ পর্যন্ত প্রায় ১৭ বছর, গোয়াতে গুরুকুল নামে একটি অনাথ আশ্রম পরিচালনা করে ফ্রেডি। হাকলের মতো ফ্রেডিও ছিল ক্যাথলিক চার্চের সাথে যুক্ত। এলাকায় মানুষ তাকে চিনতো লায়ন ক্লাবের সিনিয়র সদস্য, নির্বিবাদী সমাজসেবক ‘ফাদার ফ্রেডি’ হিসেবে। টিপু কিবরিয়া এবং রিচার্ড হাকলের মতোই ফাদার ফ্রেডির আয়ের উৎস ছিল পেডোফিলিয়া এবং চাইল্ড পর্ণোগ্রাফি। তার সাথে সম্পর্ক ছিল ব্রিটেন, হল্যান্ড, অ্যামেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের শিশুকামী সংগঠনের। ফাদার ফ্রেডি তার আশ্রমের শিশুদের ইউরোপিয়ান টুরিস্ট, বিশেষ করে সমকামী ইউরোপিয়ান পুরুষদের কাছে ভাড়া দিতেন। শিশুদের ধর্ষনের বিভিন্ন অবস্থার ছবি তুলে ইউরোপীয়ান ক্রেতাদের কাছে বিক্রিও করতো ফ্রেডি। নিজেও অংশগ্রহন করতো ধর্ষনে। বিশেষ “ক্লায়েন্টদের” মনমতো শিশু সংগ্রহ করে তাদের ইউরোপে পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হতো ফ্রেডির “গুরুকুল” থেকে। এভাবে প্রায় দুই দশক ধরে ফাদার ফ্রেডি গোয়াতে গড়ে তোলে এক বিশাল ইন্ডাস্ট্রি।
.
ফ্রেডির এসব কার্যকলাপের সাথে বিভিন্ন বিদেশী ব্যাক্তি এবং আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত এমন প্রমান থাকা সত্ত্বেও গোয়ার রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্র সরকার সর্বাত্বক চেষ্টা করে এ বিষয়গুলো চাপা দেয়ার। এমনকি প্রথম পর্যায়ে চেষ্টা করা হয়েছিল দুর্বল মামলা দিয়ে ফ্রেডিকে খালাস দেয়ার। খোদ রাজ্যের এটর্নী জেনারেল এবং ট্রায়াল জাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে ফ্রেডির বিরুদ্ধে পাওয়া প্রমান ও নথিপত্র ধ্বংস করার চেষ্টার।
.
উচু মহলের এসব কূটকৌশলের সামনে রুখে দাড়ায় কিছু শিশু অধিকার সংস্থার এবং কর্মী। তাদের একজন শিলা বারসি। রাজ্য সরকার, মন্ত্রী, বিচারবিভাগ এবং মিডিয়ার বিরুদ্ধে গিয়ে ফ্রেডি পিটসের মামলার ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন শিলা। গ্রেফতারকালীন রেইডে ফাদার ফ্রেডির ফ্ল্যাটে পাওয়া যায় ড্রাগস, পেইন কিলার, এবং সিরিঞ্জের এক বিশাল কালেকশান। ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয় ২৩০৫ টি পর্ণোগ্রাফিক ছবি। মামলার কারনে শিলা বাধ্য প্রতিটি ছবি খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে। ফাদার ফ্রেডির ফ্ল্যাটে পাওয়া ২৩০৫ টি ছবিতে যে অন্ধকার অমানুষিক পৈশাচিকতার জগতকে তিনি দেখেছিলেন তার ভয়াবহ স্মৃতি আমৃত্যু তাকে তাড়া করে বেড়াবে বলেই শিলার বিশ্বাস।
.
ডেইলি ইন্ডিপেন্ডেন্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শিলা বলেন –
“সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছবিটি ছিলে আড়াই বছর বয়েসী একটি মেয়ের। মেয়েটিকে ছোট ছোট হাত আর পা গুলো ধরে তাকে চ্যাংদোলা করে অনেকটা হ্যামকের মতো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল…একটা বিশালদেহী লোক…লোকটাকে…লোকটার শরীরের আংশিক দেখা যাচ্ছিল…বাচ্চাটাকে ধর্ষন করছিল। বাচ্চাটার কুঁচকানো চেহারায় ফুটে ছিল প্রচন্ড ব্যাথা আর শকের ছাপ। ছবি দেখেও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল বাচ্চাটা সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করছিল। “
.
ছবিগুলো দেখার পর শিলা সিদ্ধান্ত নেন যেকোন মূল্যে ফ্রেডির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার। ১৯৯২ সালে ফ্রেডি পিটসের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়, এবং ৯৬ এর মার্চে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাভগ্রত অবস্থায় ২০০- সালে ফ্রেডি পিটস মারা যায়।
.
http://bit.ly/2aQxJuW
http://ind.pn/2atVuD3
http://bit.ly/2atZDgG
http://bit.ly/2aN0QxZ
.
.
পিটার স্কালি – পিটার স্কালির গল্পের মতো এতো বিকৃত, নৃশংস, এতোটা বিশুদ্ধ পৈশাচিকতার কাহিনী খুব সম্ভবত আমাদের এ বিকৃতির যুগেও খুব বেশি খুজে পাওয়া যাবে না। স্কালি অস্ট্রেলিয়ান। নিজ দেশে ব্যাবসায়িক ফ্রডের পর নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে চলে আসে ফিলিপাইনে। কিছুদিন রিয়েল এস্টেট ব্যবসার চেষ্টার পর মনোযোগ দেয় আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য চাইল্ড পর্ণোগ্রাফি বানানোয়। বেইস হিসেবে বেছে নেয় দারিদ্র কবলিত মিন্দানাওকে। গড়ে তোলে এক চাইল্ড পর্ণোগ্রাফি সাম্রাজ্য।
.
টিপু কিবরিয়া, হাকল আর ফাদার ফ্রেডির মতো স্কালিও নিজেই ছিল, অভিনেতা, স্ক্রিপ্ট রাইটার ও পরিচালক। তবে বাকিরা শুধুমাত্র শিশুকামের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও, স্কালির বিকৃতিকে নিজে যায় আরেকটি পর্যায়ে। সে শিশুকামের সাথে মিশ্রণ ঘটায় টর্চারের। স্ক্লাইরর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ভিডিওতে ধর্ষনের পাশাপাশি মারাত্বক পর্যায়ের টর্চার করা হয়, ১৮ মাস বয়েসী একটি মেয়েশিশুকে। ১২ ও ৯ বছরের দুটি মেয়েকে বাধ্য করা হয় ধর্ষন ও নির্যাতনে অংশগ্রহন করতে। যখন ভিডিও বন্ধ থাকতো তখন বন্দী এ মেয়ে দুটিকে স্কালি তার বাসায় বিবস্ত্র অবস্থায় কুকুরের চেইন পড়িয়ে রাখতো এবং তাদের বাধ্য করতো বাসার আঙ্গিনাতে নিজেদের কবর খুড়তে। পরবর্তীতে এদের একজনকে স্কালি হত্যা করে, এবং নিজের রান্নাঘরের টাইলসের নিচে মেয়েটির লাশ লুকিয়ে রাখে। মেয়েটিকে হত্যা করার ভিডিও স্কালি ধারন করে এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভিডিওটি বিক্রি করা হয়।
.
স্ক্লালির ভিডিওগুলো দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপিয়ান পেডোফাইল এবং চাইল্ড পর্ণোগ্রাফি নেটওয়ার্কে। রাতারাতি স্কালি এবং তার সাইট পরিণত হয় “সেলেব্রিটি কাল্ট-হিরোতে”। শুরুতে তার ভিডিওগুলোর জন্য Pay-Per View Streaming অফার করলেও, চাহিদা ওবং জনপ্রিয়তা বাড়ার ফলে এক পর্যায়ে স্কালি লাইভ স্ট্রিমিং করা শুরু করে। ২০১৫ এর ফেব্রুয়াত্রিতে স্ক্লালি ও তার সহযোগী দুই ফিলিপিনী তরুণীকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তকারী অস্ট্রেলিয়ান ও ফিলিপিনো পুলিশের ধারনা বিভিন্ন সময়ে পিটার কমপক্ষে ৮ জন শিশুর উপর যৌন ও শারীরিক নির্যাতন চালানোর ভিডিও ধারন করেছে। তবে প্রকৃত সংখ্যাটা আরো বেশি হতে পারে।
.
http://bit.ly/2ax6AuF
http://bit.ly/2ahqlHI
http://bit.ly/2aPkydq
http://bit.ly/2aMByzz
http://bit.ly/2azf9Co
.
.
.
৪.
টিপু কিবরিয়া, রিচার্ড হাকল, ফ্রেডি পিটস, পিটার স্কালি। ভিন্ন ভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে, তাদের অপরাধ এবং বিকৃতির মধ্যে বেশ কিছু যোগসূত্র বিদ্যমান। এরা সবাই শিকারের জন্য বেছে নিয়েছিল দারিদ্রপীড়িত এশিয়ান শিশুদের। এদের মূল অডিয়েন্স এবং ক্লায়েন্ট বেইস ছিল পশ্চিমা, বিশেষ করে ইউরোপিয়ান। আর এরা চারজনই চাইল্ড পর্ণোগ্রাফি এবং গ্লোবাল পেডোফিলিয়া নেটওয়ার্কের সাপ্লাই চেইনের খুব ক্ষুদ্র একটা অংশ। খুব অল্প পুজিতে, এবং অল্প সময় এরা সক্ষম হয়েছিল বিশাল গ্লোবাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে কিংবা এধরনের নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত হতে। এ দৃষ্টিকোন থেকে এ চারজনকে সফল উদ্যোক্তাও বলা যায়।
.
এ চার জন ধরা পড়েছে এটা মনে করে আমরা আত্বতৃপ্তি ভোগ করতেই পারি, কিন্তু বাস্তবতা হল একটা বিশাল মার্কেট, একটা বিপুল চাহিদা ছিল বলে, আছে বলেই এতো সহজে এ লোকগুলো তারা যা করেছে তা করতে সক্ষম হয়েছিল। আমাদের কাছে এ লোকগুলোর কাজ, তাদের বিকৃতি, তাদের পৈশাচিকতা যতোই অচিন্তনীয় মনে হোক না কেন বাস্তবতা হল পিটার স্কালি কিংবা টিপু কিবরিয়ারা এ অন্ধকার জগতের গডফাদার না, তারা বড়জোড় রাস্তার মোড়ের মাদকবিক্রেতা। একজন গ্রেফতার হলে তার জায়গায় আরেকজন আসবে।
.
২০১৪ তে রিচার্ড হাকলের গ্রেফতারের পর ২০১৫, সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হয় বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা শিশুকামী ও শিশুনির্যাতনকারী নেটওয়ার্কের হোতা ৭ ব্রিটিশ । ভয়ঙ্কর অসুস্থতায় মেতে ওঠা এই লোকেরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিশুদের উপর তাদের পৈশাচিক নির্যাতনে লাইভ স্ট্রিমিং বা সরাসরি সম্প্রচার করতো। বিশেষ অফার হিসেবে তারা লাইভ চ্যাটের মাধ্যমে অন্যান্য শিশুকামীদের সুযোগ দিতো ঠিক কিভাবে শিশুদেরকে নির্যাতন ও ধর্ষন করা হবে তার ইন্সট্রাকশান দেবার। এভাবে তারা অর্থের বিনিময়ে নিজেদের সহ-মুক্তচিন্তকদের আনন্দের ব্যবস্থা করতেন। ব্রিটেন জুড়ে এরকম আরো অনেক সক্রিয় নেটওয়ার্কের অস্তিত্বের প্রমান মিলেছে।
http://bit.ly/26aoSXO
.
ফ্রেডি পিটসের গ্রেফতারের পরও গোয়ার শিশুকাম ভিত্তিক টুরিস্ট ইন্ডাস্ট্রির প্রসার থেমে থাকেনি। ফাদার ফ্রেডির শূন্যস্থান পুরন করেছে অন্য আরো অনেক ফ্রেডি। তেহেলকা.কমের ২০০৪ এর একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতিবছর প্রায় ১০,০০০ পেডোফাইল গোয়া থেকে ঘুড়ে যায়। গোয়ায় অবস্থানকালীন সময়ে প্রতিটি পেডোফাইল গড়ে আটজন শিশুর উপর যৌন নির্যাতন চালায়।
http://bit.ly/2aPkH0u
http://bit.ly/2aQxpfC
.
২০১৫ তে অস্ট্রেলিয়াতে গ্রেফতার হয় ম্যাথিউ গ্র্যাহ্যাম। ২২ বছর বয়েসী ন্যানোটেকনোলজির ছাত্র ম্যাথিউ নিজের বাসা থেকে গড়ে তোলে এক অনলাইন চাইল্ড পর্ণগ্রাফি এবং পেডোফিলিয়া সাম্রাজ্য। ম্যাথিউ নিজে কখনো সরাসরি যৌন নির্যাতনে অংশগ্রহন না করলেও সক্রিয় পেডোফাইলদের জন্য সে অসংখ্যা সাইট এবং ফোরাম হোস্ট করত। বিশেষভাবে শিশুদের উপর ধর্ষনের সাথেসাথে চরম মাত্রার শারীরিক নির্যাতনের ভিডিও প্রমোট করা ছিল ম্যাথিউর স্পেশালিটি। ম্যাথিউর নেটয়ার্কের সাথে সম্পর্ক ছিল আরেক অস্ট্রেলিয়ান পিটার স্কালির।
http://bit.ly/2aSy25e
.
১৫-তেই গ্রেফতার হয় আরেক অস্ট্রেলিয়ান শ্যানন ম্যাককুল। সরকারী কর্মচারী শ্যানন কাজ করত সরকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডিলেইড চাইল্ড কেয়ার সেন্টারে। এ সেন্টারের বিভিন্ন শিশুরা ছিল শ্যাননের ভিকটিম, এবং তাদের অধিকাংশ ছিল ৩-৪ বছর কিংবা বয়সী কিংবা তার চেয়েও ছোট। শ্যানন যৌন নির্যাতন এবং ধর্ষণের ভিডিও নিজের সাইট ও ফোরামের মাধ্যমে আপলোড ও বিক্রি করতো। খুব কম সময়েই শ্যাননের সাইট ও ফোরাম কুখ্যাতি অর্জন করে।
.
http://bit.ly/2ax9gbW
http://bit.ly/2aSBdtP
http://ab.co/1UpMm3Q
.
এভাবে প্রতিটি শূন্যস্থানই কেউ না কেউ পূরন করে নিয়েছে। টিপু কিবরিয়ার রেখে যাওয়া স্থানও যে অন্য কেউ দখল করে নেয় নি এটা মনে করাটা বোকামি। আমরা জানতে পারছি না হয়তো, কিন্তু যতোক্ষন পর্যন্ত চাহিদা থাকবে ততোক্ষন যোগান আসবেই। সহজ সমীকরণ। ইকোনমিক্স ১০১। ২০০৬ এ প্রকাশিত ওয়ালস্ট্রীট জার্নালে প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুযায়ী চাইল্ড পর্ণোগ্রাফিতে প্রতিবছর লেনদেন হয় ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এটা ২০০৬ এর তথ্য। গত দশ বছরে মার্কেটে এসেছে হাকল, স্কালি, শ্যানন, গ্র্যাহামের মতো আরো অনেক “উদ্যাোক্তা”, বেড়েছে মার্কেটের আকার। ২০১১ সালের একটি রিসার্চ অনুযায়ী ২০০৮ থেকে ২০১১, এ তিনবছরে অনলাইনে চাইল্ড পর্ণোগ্রাফি সংক্রান্ত ইমেজ এবং ভিডিও বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৭৭৪%।
http://on.wsj.com/2aAOh5I
http://bit.ly/2aPkxpT
.
ইন্ডেক্সড ইন্টারনেট বা সাধারনভাবে ইন্টারনেট বলতে আমরা যা বুঝি তার তুলনায় ডিপওয়েব প্রায় ৫০০ গুন বড়। এ ডিপওয়েবের ৮০% বেশি ভিযিট হয় শিশুকাম, শিশু পর্ণোগ্রাফি এবং শিশুদের উপর টর্চারের ভিডিও ইমেজের খোজে।
http://bit.ly/2aQyq7p
.
.
বিষয়টার ব্যাপকতা একবার চিন্তা করুন। এ বিকৃতির প্রসারের মাত্রাটা অনুধাবনের চেষ্টা করুন। পৃথিবীতে আর কখনো এধরনের বিকৃতি দেখা যায় নি এটা বলাটা ভুল হবে। পম্পেই, বা গ্রীসের কামবিকৃতির কথা আমরা জানি, আমরা জানি সডোম আর গমোরাহর ধ্বংসপ্রাপ্ত সম্প্রদায় কওমে লূতের কথা। কিন্তু বর্তমানে আমর যা দেখছি এ মাত্রার বিকৃতি ও তার বিশ্বায়ন, এ মাত্রার ব্যবসায়ন, এ ব্যাপ্তি মানব ইতিহাসের আগে কখনো দেখা গেছে বলে আমার জানা নেই। কেন এতো মানুষ এতে আগ্রহী হচ্ছে? কেন জ্যামিতিক হারে এ ইন্ডাস্ট্রি প্রসারিত হচ্ছে? কেন এতোটা মৌলিক পর্যায়ে মানুষের অবিশ্বাস্য বিকৃতি ঘটছে এ হারে? কেন মানুষের ফিতরাতের বিকৃতি ঘটছে? আর কেনই এরকম পৈশাচিক ঘটনার পরও এধরনের ইন্ডাস্ট্রি শুধু টিকেই থাকছে না বরং আরো বড় হচ্ছে? শ্যানন-স্কালি-টিপু কিরিয়াদের এ নেটওয়ার্কের গডফাদার কারা? কোন খুঁটির জোরে তারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোয়ার বাইরে?
.
একে কি শুধুমাত্র বিচ্ছিন কোন ঘটনা, কিংবা অসুস্থতা বলে দায় এড়ানো সম্ভব? সমস্যাটা কি চিরাচরিত কাল থেকেই ছিল এবং বর্তমান আধুনিক সভ্যতার যুগে এসে এর প্রসার বৃদ্ধি পেয়েছে? নাকি এর পেছনে ভূমিকা রয়েছে মিডিয়া ও পপুলার কালচারের? বিষয়টি কি মৌলিক ভাবে মানুষের যৌনতার মাঝে বিরাজমান কোন বিকৃতির সাথে যুক্ত? নাকি এ বিকৃতি আধুনিক পশ্চিমা দর্শনের যৌনচিন্তা এবং আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার মৌলিক অংশ?

[ইন শা আল্লাহ চলবে]
লিখেছেন :Asif Adnan

শেয়ার করুনঃ
‘মিথ্যায় বসত’  (প্রথম পর্ব)

‘মিথ্যায় বসত’ (প্রথম পর্ব)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম ।

এক.

সক্কাল সক্কাল দুর্গা নাম জপতে জপতে  নাদুস নুদুস রসগোল্লা খাওয়া চেহারার  পুরুত মশাই লালমাটির পথ ধরে হেলেদুলে হেঁটে যাচ্ছিলেন । তার হাতে একটা দড়ি । দড়ির শেষ মাথায়  পুরুত মশাইয়ের মতোই একটা নাদুস নুদুস পাঁঠা বাঁধা । পাঁঠাটা মনিবের মতোই হেলেদুলে মনিবের পেছনে পেছনে হেঁটে যাচ্ছে । পুরুত মশাইয়ের গন্তব্য গো-ছাগলের হাট   ।

.

পুরুত মশাই পাঁঠা নিয়ে যে পথ ধরে যাচ্ছিলেন সেই পথেরই ধারে এক বটগাছের নীচে বসে ছিল ত্রিরত্ন; নীতাই,মধু আর গঙ্গা । নীতাই আর মধু তাস পিটাচ্ছিল । গঙ্গা বসে বসে  তাই দেখছিল আর বিড়ি ফুঁকছিল  । পুরুত মশাই তার পাঁঠা নিয়ে তাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন । একই পাড়ায় বাড়ি তাদের সবারই । পুরুত মশাইকে দেখে নীতাই আর মধু তাস পেটানো বন্ধ করে তার দিকে চাইলো, গঙ্গা বিড়ি লুকিয়ে ফেলে একটা নমস্কার করলো, কিন্তু পুরুত মশাই খেয়ালই করলেন না ! কি ভাবতে ভাবতে নিজের পথে চলে গেলেন  । গঙ্গা তার গমনপথের দিকে  তাকিয়ে  কষে একটা গালি দিল । পাঁঠাটা দেখা মাত্রই নীতাই এর মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি এসেছিল । কিন্ত পুরুত মশাইয়ের পাঁঠা ভেবে সঙ্গে সঙ্গেই মাথা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল দুষ্টু বুদ্ধিটা । পুরুত মশাইএর এমন ব্যবহারের পর  দুষ্টুবুদ্ধিটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো ।গঙ্গা আর মধুকে সবকিছু বলে দ্রুত সলা-পরামর্শ করে নিল । বিচিত্র  একটা হাসি ফুটে উঠলো তিনজনের মুখেই ।

.

একছুটে কিছুটা ভিনপথ ঘুরে মধু হাজির হলো পুরুত মশাইয়ের সামনে ।

“নমস্কার! পুরুত মশাই কোথায় চললেন এই নেড়ি কুত্তাটা নিয়ে” ।

“ছোকরা! চোখের কি মাথা খেয়েচিস  ! এটা নেড়ি কুত্তা হবে কেন ? এটা তো পাঁঠা । হাটে নিয়ে যাচ্চি বেচব বলে”।

.

রাগে গজরাতে গজরাতে হেঁটে চললেন পুরুত মশাই । কলিযুগে আর কতকি দেখব ! সেদিনের পুঁচকে ছোড়া আমার সঙ্গে করে ফাজলামি!  একটু পরে সামনে পড়লো গঙ্গা ।

“নমস্কার! তা পুরুত মশাই কুত্তার গলায় দড়ি বেঁধে কোতায় নিয়ে যাচ্চেন”?

পুরত মশাই এবার আগের মতো রাগলেন না ।  কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বললেন,“তোমাদের আজ কি হলো বলো তো ,বাপু? একটু আগে মধুও এই পাঁঠাকে  বলল  কুত্তা । এখন তুমিও বলচো”।

গঙ্গা মাথার দিব্যি দিয়ে বললো  যে এটা পাঁঠা নয় ,একটা লোম ওঠা নেড়ি কুত্তা ।

পুরুত মশাই বিড়বিড় করতে করতে হাঁটা শুরু করলেন । সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাতে থাকলেন পাঁঠার দিকে ।  ভয় পেতে শুরু করলেন তিনি । শেষ বয়সে মাথাটা কি গেল? পাগল হয়ে গেলাম? ঠাকুরদার অবশ্যি শেষ বয়সে মাথাটা বিগড়ে গিয়েছিল ।

.

কিছুক্ষন পরেই তার সঙ্গে দেখা হল  নিতাইয়ের । নিতাই সঙ্গে সঙ্গেই পুরুত মশাইকে জিজ্ঞাসা করল তিনি কেন কুত্তার গলায় দড়ি পড়িয়েছেন আর তাকে কোথায়ই বা নিয়ে যাচ্ছেন । পুরুত মশাই যখন দুর্বল স্বরে বললেন এটা কুত্তা নয়, পাঁঠা তখন  নিতাই মা কালীর দিব্যি খেয়ে বললো এটা কুত্তা ।

পুরুত মশাই  শতভাগ  নিশ্চিত হলেন যে এই শেষবয়সে এসে তার মাথাটা সত্যিই বিগড়ে গেছে। পাঁঠাটার গলার দড়ি খুলে দিয়ে,‘হেই কুত্তা যা যা, ছেই ছেই’ বলে তিনি তাড়িয়ে দিলেন। তারপর  উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোলা চোখে হাঁটা ধরলেন বাড়ির পথে ।

.

মধু,গঙ্গা,নিতাই কাছে পিঠেই ছিল। পুরুত মশাই চোখের আড়াল হতেই তারা দৌড়ে যেয়ে পাঁঠাটা ধরে ফেললো। তারপর কেলো হাসি দিয়ে রওয়ানা দিল  চক্রবর্তীদের আমবাগানের দিকে। পাঁঠার মাংস দিয়ে সেই একটা ভোজ হবে আজ !

.

গল্পটা পড়েছিলাম অনেক দিন আগে ইংরেজিতে, ইংরেজি পড়া শিখেছি কেবল তখন। গল্পের ত্রিরত্ন; গঙ্গা,নিতাই আর মধু মিলে  ছকে ফেলে যেভাবে পুরুতমশায়ের পাঁঠা’টা সাবাড় করে ফেললো তা খুব ক্ল্যাসিকাল একটা টেকনিক। পৃথিবীর ইতিহাসে বারবার ব্যবহার করা হয়েছে এই টেকনিকটা, মক্কার কুরাইশ থেকে শুরু করে পাশ্চাত্যের ক্রুসেডার আমেরিকা,ফ্রান্স,ইংল্যান্ড,জার্মানি- বাদ যায়নি কেউই। ইংরেজিতে গালভরা একটা নাম দেওয়া হয়েছে এর-‘ The Big Lie Theory’

[https://goo.gl/Mhc7Qn]

.

সোজা বাংলায়‘Big Lie Theory’ হলঃ  একটা মিথ্যে কথা তা যতোই বড় হোকনা কেন,তা যদি বারবার, বারবার বলা হতে থাকে তাহলে ম্যাঙ্গো পিপল একসময় সেটা  সত্যি বলে ধরে নেয়।

পুরুত মশাই যেমন একটা মিথ্যে কথা পরপর তিনজনের মুখ থেকে শুনে তা সত্যি বলে ধরে নিলেন।

.

‘Big Lie Theory’ এর সাথে নাৎসিদের নাম জড়িয়ে থাকলেও, সবচেয়ে চৌকস ভাবে এর ব্যবহার করেছে নব্য ক্রুসেডার আমেরিকা,ফ্রান্স,ইংল্যান্ড,জার্মানি,রাশিয়া,ইন্ডিয়া এন্ড কোং ।

.

টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক প্রেস কনফারেন্সেDepartment of Homeland Security (DHS) secretary John Kellyট্রাম্প প্রশাসনের সাতটি মুসলিমদেশের নাগরিকদের আমেরিকাতে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞার পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, ‘আমরা আমেরিকার নাগরিকদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলতে পারিনা’

hkttps://goo.gl/BFjhe7

.

অর্থাৎ আমেরিকার প্রশাসন বলতে চাইছে এই মুসলিমদেশের নাগরিকদের হাতে আমেরিকানদের জীবন একেবারেই  নিরাপদ নয়। তারা আমেরিকার মাটিতে পা দিতে পারলেই আমেরিকানদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলবে।

.

২০১৬ সালের এক জরিপ চালানোর সময় ১৫০০ আমেরিকানকে প্রশ্ন করা হয় তারা সবচেয়ে কিসের ভয়ে ভীত।

প্রথম পাঁচটা বিষয়ের ২ এবং ৪ নম্বরে ছিল টেররিজম বা সন্ত্রাসবাদ।

https://goo.gl/Z99q9u

.

সন্ত্রাসবাদ আমেরিকানদের জন্য আসলেই কি এতো বড় হুমকি এবং ক্ষতির কারন?

.

New America Foundation এর মতে ২০০৫ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ৯৪ জন আমেরিকার মাটিতে জিহাদীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন, ঠিক একই সময়ে আমেরিকার মাটিতে ৩ লক্ষ ১ হাজার ৭৯৭ জন প্রাণ হারিয়েছে বন্দুকের গুলিতে !

https://goo.gl/Z99q9u

একজন আমেরিকানের ক্যান্সার অথবা হার্টের অসুখে মৃত্যুবরণ করার সম্ভাবনা  রিফিউজি সন্ত্রাসীদের হাতে মৃত্যু বরণ করার চেয়ে ৬ দশমিক ৯ মিলিয়ন গুন বেশি, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাবার সম্ভাবনা  রিফিউজি সন্ত্রাসীদের হাতে মৃত্যু বরণ করার চেয়ে  ৪ লক্ষ ৭ হাজার গুন বেশি, বজ্রপাতে মারা যাবার সম্ভাবনা ২৬০ গুন বেশি। এমনকি শার্কের আক্রমণে (পৃথিবীতে শার্কের আক্রমণে মানুষ নিহত হবার ঘটনা খুবই বিরল ) একজন আমেরিকানের মারা যাবার সম্ভাবনা রিফিউজি সন্ত্রাসীদের হাতে মৃত্যু বরণ করার চেয়ে ৬ গুন বেশি।

https://goo.gl/jg9Bzx

.

তাহলে কেন সন্ত্রাসবাদকে মারাত্মক হুমকি মনে করছে আমেরিকানরা? মুসলিমদের রক্তলোলুপ পিশাচ হিসেবে বিবেচনা করছে?

উত্তর-  ‘Big Lie Theory’ । মিডিয়া,নাটক,সিনেমা, উপন্যাস,সংবাদমাধ্যম,পেইড দালাল  সম্ভাব্য সবরকম উপায়ে  ‘সন্ত্রাসবাদ আমেরিকানদের জন্য মারাত্মক হুমকি’ এই ভয়ংকর মিথ্যেটা জনগণকে বারবার বলা হয়েছে । আর সাধারণ জনগন সেটা বিশ্বাস করেই বসে আছে।

 

দুই.

এই পৃথিবীর ইতিহাস (মানব জাতির ইতিহাসও বলা যায়) হল হক ও বাতিলের দ্বন্দের ইতিহাস।জান্নাতে সেই আদম(আঃ) আর শয়তানের লড়াই থেকে শুরু। এরপর যুগে যুগে কালে কালে লড়াই হয়েছে ইব্রাহীম (আঃ) আর নমরুদের,মূসা (আঃ) আর ফেরআউনের, মুহাম্মাদ’র (ﷺ) আর আবু জেহেলদের। হক ও বাতিলের লড়াই এখনো চলছে,চলবে কিয়ামতের আগ পর্যন্ত। ইবলীশ’তো  অহংকারের বশে আল্লাহ্‌কে (সুবঃ) চ্যালেঞ্জ করেই রেখেছে…

.

‘সে( ইবলিশ) বললো, যেহেতু তুমি আমাকে এই আদমের জন্যেই আমাকে গোমরাহীতে নিমজ্জিত করলে,তাই আমিও এদের গোমরাহ করার জন্য তোমার প্রদর্শিত সরল পথের বাঁকে বাঁকে ওথ পেতে থকাবো। অতঃপর পথভ্রষ্ট করার জন্য আমি অবশ্যই তাদের কাছে আসবো ……’

[সূরা-৭;১৬-১৭]

.

আদম সন্তানকে পথ ভ্রষ্ট করার জন্য শয়তানের খুব কার্যকরী একটা হাতিয়ার হলো মানুষের যৌনপ্রবৃত্তি। মানুষের যৌন প্রবৃত্তিকে তুলনা করা যেতে পারে ধারালো ছুরির সঙ্গে। চিকিৎসকের হাতে  থাকলে সেটা জীবন বাঁচায় আর রংবাজদের হাতে থাকলে জীবন কেড়ে নেয়। যৌন প্রবৃত্তি হালাল উপায়ে ব্যবহৃত হলে  দুজন মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসে,সাদা কালো জঞ্জালে ভরা মিথ্যে কথার এই পৃথিবীতে  ভালোবাসা,স্নেহ,মায়া,মমতার সংসার গড়ে তোলে। যৌন প্রবৃত্তিতে শয়তানকে নাক গলাতে দিলে সে  ছলেবলে কৌশলে জাহান্নামের ওয়ান ওয়ে টিকিট ধরিয়ে দেবে ।

.

আল্লাহ্‌ (সুবঃ) এই সূরা আরাফের ২০ নম্বর আয়াতে বলেছেন,“ অতঃপর শয়তান তাদের দুজনকেই কুমন্ত্রনা দিল যেন সে তাদের নিজেদের (আদম এবং হাওয়া) লজ্জাস্থানসমূহ যা তাদের পরস্পরের কাছ থেকে গোপন করে রাখা হয়েছিল তা প্রকাশ করে দিতে পারে …

.

২৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে

‘হে আদম সন্তানেরা শয়তান যেভাবে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে,তেমনি করে তোমাদেরকেও সে যেন প্রতারিত করতে না পারে,শয়তান তাদের উভয়ের দেহ থেকে তাদের পোশাক খুলে ফেলেছিল,যাতে করে তাদের উভয়ের গোপন স্থানসমূহ উভয়ের কাছে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে…

“যে শয়তানের পদাংক অনুসরণ করে, সে জেনে রাখুক, শয়তান অশ্লীল ও মন্দ কাজের আদেশ দেয় (প্রলুব্ধ করে)।”
[সূরা ২৪ আন নূর : আয়াত ২১]

.

শয়তান যেভাবে আমাদের আদি পিতামাতাকে প্রতারিত করে জাহান্নাম থেকে বের করেছে তেমনি আমাদেরকেও সে প্রতারিত করার চেষ্টা করে। আমাদের মধ্যে যিনা-ব্যাভিচার ,অশ্লীলতা,বেহায়াপনা,বিকৃত যৌনাচার ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য শয়তান আর তার দোসরেরা ঝাঁপিয়ে পড়ে সর্বশক্তি দিয়ে।

.

উনবিংশ বা বিংশ শতাব্দীতে মানুষ যখন সবকিছু দেখতে শুরু করলো বিজ্ঞান নামক চশমার ভেতর থেকে তখন শয়তান আর তার দোসরদের দরকার ছিল এমন কিছু সায়েন্টিফিক থিওরির যেগুলো অশ্লীলতা,বেহায়াপনা, বিকৃত যৌনাচারগুলোর  পায়ের তলায় মাটি দাড় করিয়ে দেবে । সিগ্মন্ড ফ্রয়েড কিছু থিওরি দিয়েছে কিন্তু আসল (কু)কাজটা করে গেছে আলফ্রেড কিনসি।
.

১৯৪৮ সালে এই মহান ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ বের করে তার প্রথম বই ‘Sexual Behavior in the Human Male’ ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয় তার আরেকটি বই Sexual Behavior in the Human female’

এই দুটি বই পাশ্চাত্যে ঝড় তোলে, যৌনতা সম্পর্কে পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন আনে। পাশ্চাত্যের ইতিহাসের অন্য কোন বই বা রিপোর্ট পাশ্চাত্যকে এতোটা বদলে দেয়নি যা এই দুইটি বই দিয়েছিল। আধুনিক সেক্স এডুকেশান কিনসির এই দুইটি বইয়ের ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হচ্ছে। যৌনতা সম্পর্কে আধুনিক পশ্চিমা ধারণা একেবারে শুরু থেকে শেষপর্যন্ত গড়ে উঠেছে আলফ্রেড কিনসির এই দুই বিখ্যাত ‘থিসিসের’ উপর ভিত্তি করে।

.

এই দুটি বইয়ে কিনসি এমন কিছু কথা বলে যা মানুষেরা আগে কখনোই শোনেনি । কিনসি দাবী করে যে শিশুরা জন্মগত থেকেই সেক্সুয়ালী এক্টিভ,সাত মাস বয়সী এক শিশু এবং এক বছরের নিচের আরো পাঁচজন শিশুকে সে মাস্টারবেট করতে দেখেছে। [Sex education as bullying, page 7 ]। শিশুরা  বয়স্ক সঙ্গী/সঙ্গীনীদের সঙ্গে আনন্দদায়ক এবং উপকারী যৌনমিলন করতেই পারে এবং করা উচিত। [Kinsey,Sex and Fraud, page 3] পিতামাতার উচিত ৬-৭ বয়স থেকে শুরু করে শিশুদের মাস্টারবেট করানো। এবং মিলেমিশে একসঙ্গে মাস্টারবেট করা।

কিনসি দাবী করে ৩৭% পুরুষ  হোমোসেক্সুয়াল এক্সপেরিয়েন্সের সম্মুখীন হয় বয়ঃসন্ধিকাল থেকে বৃদ্ধ হবার সময়ের মধ্যে [Kinsey,Sex and Fraud, page 2]

.

কিনসি দাবী করে মানব যৌনতার ওপর কারো কোন কর্তৃত্ব ফলানো চলবে না । তার যা মন চাইবে সে তাই করতে পারবে, এটাই স্বাভাবিক, সমকামিতা স্বাভাবিক,শিশুকাম,মাস্টারবেশন স্বাভাবিক,স্বাভাবিক সব ধরণের বিকৃত যৌনাচার, বরং নারী-পুরুষের স্বাভাবিক অন্তরঙ্গতাই অস্বাভাবিক। [Kinsey,Sex and Fraud, page 2]

.

পরবর্তীতে এই ‘মহান’ বিজ্ঞানীর কাজগুলো রিফিউটেশানের শিকার হয়েছে বিজ্ঞানীদের দ্বারাই। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন আলফ্রেড কিনসির দাবীগুলোর তেমন কোন সায়েন্টিফিক ভিত্তি নেয়, তার তথ্য উপাত্ত গুলো যথেষ্ট পরিমাণে গোঁজামিলে ভরপুর [Kinsey,Sex and Fraud, page 1]। এক্সপেরিমেন্ট করার জন্য অনেক সময় সাবজেক্টের ওপর চরম  যৌননির্যাতন চালানো হয়েছে, রেহায় দেওয়া হয়নি শিশুদেরকেও।

.

কিন্তু ক্ষতি যা হবার তা হয়ে গিয়েছেই। কিনসি সব ধরণের বিকৃত যৌনাচারকে স্বাভাবিক করার যে দাবী তুলেছিল তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে দেরী করেনি শয়তান আর তার দোসরেরা। বস্তা বস্তা ডলার ঢেলে কিনসির ভুয়া দাবীগুলো  বিজ্ঞানের সহীহ শুদ্ধ পোশাক পরিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে পুরো বিশ্বের সাধারণ মানুষ জনের কাছে। ক্রমাগত গুনগান গাওয়া হয়েছে সমকামিতার,শিশুকামের। সেক্স এডুকেশানের নামে বাচ্চাদেরকে ছোট থেকেই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে সমকামিতা,মাস্টারবেশন,এনাল সেক্সের মতো জঘন্য বিষয়গুলো। পশুকাম,শিশুকামকে স্বাভাবিক করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যম, মুভি,সিরিয়াল,গল্প,উপন্যাসের মাধ্যমে সমকামীদেরকে সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে,পর্নমুভির মাধ্যমে হাতে কলমে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে সমকামিতা সহ সকল বিকৃত যৌনাচারের। Big Lie Theory’র আরেকটি জুতসই উদাহরণ। আর এ কাজে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছে এবং করে চলছে Sexuality Information and Education Council of the United States (SIECUS), International Plant Parenthood Federation (IPPF), জাতিসংঘ, প্লেবয়ম্যাগাজিন, পর্ন ইন্ডাস্ট্রি, বিভিন্ন এনজিও ইত্যাদি । [এই সিরিজের পরবর্তী পর্বে এগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে ইনশা আল্লাহ্‌]

.

পড়ুন এই বইটিঃ https://goo.gl/AHVq5p

দেখুন এই ভিডিওটিঃ https://goo.gl/989ni9

.

পাশ্চাত্যের সেক্সিওলোজির পুরোটাই দাড়িয়ে আছে মিথ্যের ওপর।ইরাক,আফগানিস্তান,ইয়েমেনে ড্রোনে করে গনতন্ত্র,ব্যক্তিস্বাধীনতা,ফ্রিডোম অফ চয়েস ফেরি করে বেড়ানো পাশ্চাত্য কেন মিথ্যের ওপর দাড়িয়ে থাকা এই আইডিওলোজি গায়ের জোরে চাপিয়ে দিচ্ছে পুরো পৃথিবীর ওপর? অন্যের ব্যক্তিস্বাধীনতা,অন্যের ফ্রিডোম অফ চয়েসে নাক গলানোর অধিকার তাকে কে দিল? মুসলিম ভূখন্ডের অধিবাসীরা নিজেরাই ঠিক করে নিবে তারা সমকামিতা মেনে নিবে না বর্জন করবে, পাশ্চাত্যের গনতন্ত্রই তাদেরকে এই অধিকার দিয়েছে, পাশ্চাত্যের গনতন্ত্রই তাদেরকে এই অধিকার দিয়েছে তারা বেছে নিবে তাদের জীবন যাপনের পদ্ধতি। তাহলে কেন পাশ্চাত্যে জোর করে ‘মুক্তি’-র পশ্চিমা সংজ্ঞা চাপিয়ে দিচ্ছে মুসলিমদের উপর? যারা ক্রমাগত চিন্তার স্বাধীনতার বুলি আওড়ায়, বৈচিত্র্যের স্তুতি গেয়ে বেড়ায়, যারা মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে সম্মান করার কথা বলে তারাই কেন পশ্চিমা লিবারেলিসমের আদর্শগুলোকে সারা পৃথিবীর মানুষের উপর চাপিয়ে দিতে চায়? যা কিছু পশ্চিমা লিবারেলিসমের ছকের ভেতর পড়ে তা সভ্যতা আর যা কিছু এর বাইরে তার সবই পশ্চাৎপদতা কীভাবে তারা ই ঔদ্ধত্য ভরা দাবি করে?
https://goo.gl/TtXpFh

https://goo.gl/wuQRSQ

https://goo.gl/uViyuu

https://goo.gl/AJnjJa

ইনশাআল্লাহ্‌ এই সিরিজে আমরা পাশ্চাত্যের সেক্সিওলোজির শিকড় ধরে টান দেবার চেষ্টা করব। আমরা দেখব কিভাবে পাশ্চাত্য গায়ের জোরে সমকামিতাকে স্বাস্থ্যকর হিসেবে প্রমান করে চলেছে,কিভাবে সেক্স এডুকেশানের মাধ্যমে কিন্ডারগার্ডেনের বাচ্চাদেরকেও সমকামিতা,এনালসেক্স,ওরাল সেক্স, পেডেরাস্টি, মাস্টারবেশনের দীক্ষা দিচ্ছে, কিভাবে আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোতে,বাংলাদেশে এনজিও ওয়ালারা সমকামিতার প্রসার ঘটিয়ে চলেছে, পাশ্চাত্যের চেপে রাখা শিশু আর নারী নির্যাতনের ইতিহাস আমরা আলোচনা করব, আমরা মুখোশ খুলে দেবার চেষ্টা করব  কিছু দেশ,কিছু ওরগানাইজেশান,কিছু ব্যক্তির,কিছু কোকোনাট শায়খদের যারা এই পৃথিবীটাকে আপনার এবং আপনার সন্তানের জন্য বসবাসের অনুপোযুক্ত করে তুলছে। আপনি আমন্ত্রিত।

ধন্যবাদ ।

ডাওনলোডঃ

১) Kinsey,Sex and Fraud –https://goo.gl/Jy99ze

২) Sex Education as Bullying- https://goo.gl/AHVq5p

শেয়ার করুনঃ
সমকামি এজেন্ডাঃ ব্লু-প্রিন্ট

সমকামি এজেন্ডাঃ ব্লু-প্রিন্ট

১৯৮৭ সালে অ্যামেরিকান ম্যাগাযিন ‘গাইড’ এর নভেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত হয় মার্শাল কার্ক এবং হান্টার ম্যাডসেনের লেখা প্রায় ৫০০০ শব্দের একটি আর্টিকেল। দু’বছর পর নিউরোসাইক্রিয়াট্রি রিসার্চার কার্ক এবং পাবলিক রিলেইশান্স কনসালটেন্ট ম্যাডসেন একে পরিণত করেন ৩৯৮ পৃষ্ঠার একটি বইয়ে। হান্টার ও ম্যাডসেনের এই আর্টিকেল উপস্থাপিত ধারণা ও নীতিগুলো পরবর্তী ৩ দশক জুড়ে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে রাজনীতি, মিডিয়া, অ্যাকাডেমিয়া, বিজ্ঞান, দর্শন ও চিন্তার জগতে। সারা বিশ্বজুড়ে। সমকামীদের ম্যাগাযিন গাইডে প্রকাশিত মূল আর্টিকেলটির নাম ছিল “The Overhauling of Straight America ”। ৮৯ তে প্রকাশিত সম্প্রসারিত বইয়ের নাম দেওয়া হয় – After the Ball: How America Will Conquer Its Fear and Hatred of Gays in the 90s. কার্ক ও ম্যাডসেনের উদ্দেশ্য ছিল সিম্পল –সমকামিতা ও সমকামিদের প্রতি অ্যামেরিকানদের মনোভাব বদলে দেওয়ার জন্য একটি স্টেপ বাই স্টেপ ব্লু-প্রিন্ট বা ম্যানুয়াল তৈরি করা।

.

কিন্তু কেন প্রায় তিন দশক পর বাংলাদেশে বসে কার্ক-ম্যাডসেনকে নিয়ে চিন্তা করা? কার্ক-ম্যাডসেনের নাম শুনেছেন বা তাদের লেখার সম্পর্কে জানেন এবং মানুষ খুজে পাওয়া কঠিন। শুধু বাংলাদেশেই না, বিশ্বজুড়েই। কিন্তু তাদের ব্লু-প্রিন্টের প্রভাব কোন না কোন ভাবে প্রভাবিত করে নি এমন সমাজ বা রাষ্ট্র খুজে পাওয়াটাও কঠিন। গত ৩০ বছরে সমকামিতার স্বাভাবিকীকরন, সমকামিতাকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সমকামিতার মধ্য এতোটা অস্বাভাবিক একটি বিষয়ের প্রতি মানুষের সংবেদনশীলতাকে নষ্ট করার জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা প্রায় হুবহু মিলে যায় কার্ক-ম্যাডসেনের ব্লু-প্রিন্টের সাথে। আর বাংলাদেশেও সমকামিতার প্রচার, প্রসার এবং সামাজিক গ্রহনযোগ্যতা তৈরির জন্য এখন এই একই পদক্ষেপগুলো নেওয়া হচ্ছে, একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। বর্তমানে ২২টি দেশে সমলৈঙ্গিক ‘বিয়ে’ আইনগত ভাবে স্বীকৃত। কোন আগ্রাসী সেনাবাহিনী শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে এদেশগুলোর জনগোষ্ঠীর উপর সমকামিতা চাপিয়ে দেয় নি। তবে নিঃসন্দেহে মানুষের স্বভাবজাত মূল্যবোধ, ফিতরাহর বিরুদ্ধে গিয়ে জঘন্য একটি বিকৃতিকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধতা দেওয়া, মানুষের মাঝে এই বিকৃতির গ্রহনযোগ্য তৈরি করা একটি যুদ্ধের অংশ। এই যুদ্ধ মনস্তাত্ত্বিক, আদর্শিক। এই যুদ্ধ সর্বব্যাপী এবং ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আপনি এই যুদ্ধের অংশ। আর এই যুদ্ধে শত্রুপক্ষের স্ট্র্যাটিজির মূল ভিত্তি কার্ক-ম্যাডসেনের ব্লু-প্রিন্ট। আর তাই কার্ক-ম্যাডসেনের ব্লু-প্রিন্ট সম্পর্কে জানা, শত্রুর কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে জানা একটি আবশক্যতা, কোন অ্যাকাডেমিক কৌতুহল না। তবে কার্ক-ম্যাডসেনের ব্লু-প্রিন্টের দিকে তাকানোর আগে গত তিন দশকে এর অর্জিত সাফল্যের দিকে একটু তাকানো যাক।

The Overhauling of Straight America

একটা সহজ উদাহরন দিয়ে শুরু করা যাক। Gallup এর হিসেব অনুযায়ী ৮৭-তে, অর্থাৎ আর্টিকেলটি লেখার সময়, যাদের প্রশ্ন করা হয়েছিল তাদের মধ্যে ৩২% সমকামি সম্পর্ক বৈধ হওয়া উচিৎ বলে উত্তর দিয়েছিল। ৫৭% বলেছিল এধরনের কাজ সম্পূর্ণভাবে বেআইনি ঘোষণা করা উচিৎ। ত্রিশ বছর পর ২০১৫৭ তে এসে দেখা গেল ব্যাপারটা প্রায় পুরোপুরি উল্টে গেছে। ৬৪% উত্তরদাতা এখন মনে করেন এধরনের বিয়ে বৈধ হওয়া উচিৎ, আর মাত্র ৩৪% এর বিরুদ্ধে [১]। ১৯৮৯ সালে ১৯% উত্তরদাতা বিশ্বাস করতেন মানুষ জন্মসূত্রে সমকামি হয়। ৪৮% মনে করতেন সমকামিরা সমকামিতাকে স্বেচ্ছায় বেছে নেয়। ত্রিশ বছরের কম সময়ের মধ্যে তে ৪২% উত্তরদাতা বিশ্বাস করা শুরু করলো সমকামিতা জন্মগত [২]। অথচ ১৯৭৩ সালের আগ পর্যন্ত খোদ অ্যামেরিকান সাইক্রিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশান সমকামিতাকে একটি মানসিক অসুস্থতা হিসেবে বিবেচনা করতো। অর্থাৎ ৫০ বছর আগে যা বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে স্বীকৃত ছিল আজ অর্ধেকের বেশি মানুষ তার উল্টোটা বিশ্বাস করছে, যদিও সব বৈজ্ঞানিক গবেষনার ফলাফল বারবার বলছে সমকামিতার কোন জেনেটিক ভিত্তি নেই, এটি জন্মগত না, বরং স্বেচ্ছায় বেছে নেওয়া একটি বিকৃতি।

.

পিউ রিসার্চ সেন্টারের সমীক্ষা অনুযায়ী ২০১৫ তে এসে অ্যামেরিকান খ্রিস্টানদের ৫৪% মনে করে সমকামিতার বিরোধিতা করার বদলে সমকামিতাকে সামাজিক ভাবে মেনে নেওয়া উচিৎ। অ্যামেরিকান প্রটেস্ট্যান্টদের মধ্যে ৬২% সমকামি ‘বিয়ে’-কে সমর্থন করে, আর ৬৩% মনে করে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস আর সমকামিতার মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব নেই [৩]। অথচ সমকামিতা যে একটি জঘন্য বিকৃতি, চরম পর্যায়ের সীমালঙ্ঘন এবং অত্যন্ত ঘৃণিত পাপাচার এ ব্যাপারে বাইবেলের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট।

.

অ্যামেরিকান সমকামিতা অ্যাডভোকেসি গ্রুপ GLAAD এর সমীক্ষ অনুযায়ী ২০১৬ সালে রিলিয হওয়া প্রায় ১৭.৫% হলিউড সিনেমাতে LGBT (Lesbian,Gay, Bi-sexual, Queer) চরিত্রের উপস্থিতি ছিল [৪] । পাশাপাশি গত ১০ বছরের প্রায় সব প্রাইমটাইম টেলিভিশন শো-তে কমপক্ষে একটি সমকামি বা অন্যকোন বিকৃতকামি চরিত্র রাখা হয়েছে। কিন্তু Gallup এর মতে অ্যামেরিকার মোট সংখ্যার মাত্র ৩.৯% সমকামি। মিডিয়াতে সমকামিদের ওভাররিপ্রেসেন্টেশানের সঠিক মাত্রাটা বোঝার জন্য এ তথ্য মাথায় রাখুন যে অ্যামেরিকান মিডিয়ার দর্শক শুধু অ্যামেরিকাতেই সীমাবদ্ধ না। সারা পৃথিবী জুড়ে কোটি কোটি মানুষ অ্যামেরিকান মিডিয়ার দর্শক ও ভোক্তা। এই কোটি কোটি মানুষের কাছে অ্যামেরিকান মিডিয়া সমকামিতা, সমকামি ‘বিয়ে’, সমকামি যৌনাচারকে সাধারন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করছে।

.

সর্বশেষ হিসেবে অনুযায়ী ২২টি দেশে সমকামি ‘বিয়ে’-কে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জার্মানির সংসদে গত ৩০শে জুন, ২০১৭ সমলৈঙ্গিক ‘বিয়ে’র স্বীকৃতিদানের পক্ষে বিল পাশ হয়েছে। উল্লেখ্য জার্মানির সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৪ জন নিজেদের মুসলিম হিসেবে দাবি করে থাকে। এই ৪জনই এই বিকৃতি ও চরম সীমালঙ্ঘনের আইনগত বৈধতা দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছে।

.

রাজনীতি, অ্যাকাডেমিয়া এবং মিডিয়ার উপর এই ক্ষুদ্র বিকৃত মানসিকতার মাইনরটির প্রভাবের মাত্রা কতোটুকু তা শুধু উপরের তথ্যগুলোর আলোকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব না। তবে একটা বেইসিক আইডিয়া এখান থেকে আপনি পাবেন। এই প্রভাবের উৎস কী? আর এই প্রভাবের ব্যাপ্তি কতোটুকু?

.

আর একটা তথ্য দেই। আপনি নিজেই বাকি হিসেবটা মিলিয়ে নিন।

.

পৃথিবী জুড়ে অনেকগুলো অ্যাডভোকেসি গ্রুপ সমকামিতার প্রচার ও প্রসারের জন্য কাজ করে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও ধনী গ্রুপ হল HRC বা Human Rights Campaign। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে HRC-র বার্ষিক আয় ছিল ৩.৮৫ কোটি ডলার। এই অর্থের উৎস? বড় বড় কর্পোরেশানগুলোর কাছ থেকে পাওয়া ডোনেইশান। HRC এর ডোনার এবং কর্পোরেট পার্টনারদের মধ্যে আছে স্টারবাকস, লিবার্টি মিউচুয়াল ইনশুরেন্স, অ্যামেরিকান এয়ারলাইন্স, অ্যাপল, মাইক্রোসফট, ব্যাঙ্ক অফ অ্যামেরিকা, শেভরন, কোকাকোলা, পেপসিকো, লেক্সাস অটো, গুগল, অ্যামাযন, আইবিএম, নাইকি, গোল্ডম্যান অ্যান্ড স্যাক্স, জেপি মরগান চেইস অ্যান্ড কো, ডেল, শেল অয়েলসহ আরো অনেকে [৫]।

.

বিশাল বাজেটের ব্যাপক প্রভাবশালী এসব অ্যাডভোকেসি গ্রুপ আসলে কী করে? লবিয়িং এর মাধ্যমে, প্রেশার গ্রুপ তৈরির মাধ্যমে এবং অবশ্যই অর্থের মাধ্যমে এরা প্রভাবিত করে মিডিয়াকে, রাজনীতিবিদদের, সমকামিতার সাথে সংশ্লিস্ট বিভিন্ন রিসার্চকে (যাতে করে সমকামিতার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি করা যায়), এবং সরকারের পলিসিকে। যেমন অ্যামেরিকাতে এই মূহুর্তে অ্যাডভোকেসি গ্রুপগুলো একটি প্রধান লক্ষ্য হল প্রতিটি স্কুলে, হাইস্কুল ও প্রাইমারি পর্যায়ে Gay-Straight Alliance Club অর্থাৎ স্বাভাবিক শিশু ও সমকামি শিশু ঐক্য পরিষদ জাতীয় কিছু তৈরি করা। প্রতিটি স্কুলে গড়ে ওঠা এই ক্লাবগুলোর কাজ হবে শিশুদের মধ্যে সমকামিতার প্রসার ঘটানো এবং স্বাভাবিকীকরন।

গ্লোবাল এজেন্ডা ও বাংলাদেশঃ

বিষয়গুলো শুধু অ্যামেরিকাতে বা পশ্চিমা বিশ্বে সীমাবদ্ধ না। বরং সমকামিতার প্রচার, প্রসার ও স্বাভাবিকীকরনের এই এজেন্ডা গ্লোবাল, এবং বিশ্ব রাজনীতির সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। ১৯৯৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ঘোষণা করে সমকামিতা কোন অসুস্থতা না কোন বিকৃতিও না। অর্থাৎ সমকামিতা স্বাভাবিক। OHCHR, UNDP, UNFPA, UNHCR, UNICEF, UNODC, UN Women, WFP, ILO, UNESCO, World Bank এবং UNAIDS –সহ জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, বৈষম্য নিরসন মানবাধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষার নামে উন্নতশীল দেশগুলোতে বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে সমকামিতার প্রচার, প্রসার ও স্বাভাবিকীকরনের জন্য কাজ করছে। এদের মধ্যে Office of the United Nations High Commissioner for Human Rights (OHCHR) সমকামিতাকে মানবাধিকারের সংজ্ঞার ভেতরে ফেলে এর প্রচার করছে [৬] । OHCHR সমকামিতার প্রচার ও প্রসারের জন্য Free & Equal নামে একটি আলাদা ক্যাম্পেইন চালু করেছে যার ঘোষিত উদ্দেশ্যে মাঝে আছে শিশুদের সমকামিতা সম্পর্কে সচেতন করা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ব্যবহারের মাধ্যমে সমকামিতা ও সমকামের প্রতি সহনশীলতা তৈরি করা এবং মিডিয়ার মাধ্যমে সমকামিতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা [৭] । Free & Equal ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে জাতিসঙ্ঘ সমকামি ‘বিয়ে’-কে বৈধতা দেয়ার জন্য বলিউডের মিউযিক ভিডিও-ও তৈরি করেছে।

.

পৃথিবীর যেকোন জায়গায় সমকামিতার প্রচার ও প্রসারের জন্য যা কিছু করা হচ্ছে, যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে সেগুলো এই গ্লোবাল এজেন্ডার অংশ। বাংলাদেশে যারা সমকামিতার প্রচার, প্রসার ও স্বাভাবিকীকরনের জন্য এখনো পর্যন্ত যেসব কাজ করা হয়েছে তার সবকিছুই কার্ক-ম্যাডসেনের ব্লু-প্রিন্টের সাথে খাপেখাপে মিলে যায়। একারনে তাদের কর্মপদ্ধতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বোঝার জন্য কার্ক-ম্যাডসেনের ব্লু-প্রিন্ট সম্পর্কে ধারণা থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা আলাদা ভাবে দেখার কোন সুযোগ নেই। বরং যে মডেলের মাধ্যমে অ্যামেরিকায় অভূতপূর্ব সাফল্য পাওয়া গিয়েছে বাংলাদেশসহ অন্যান্য মুসলিম দেশে এখন সেই একই মডেল বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। তাই পায়ুকাম প্রচার করা ইয়াহু চ্যাট গ্রুপ, ফেইসবুক গ্রুপ, ফোরাম, রুপবান ম্যাগাযিন, শাহবাগে সমকামি প্যারেড, বইমেলায় সমকামিতা নিয়ে কবিতার বই প্রকাশ, গ্রামীনফোনের ফান্ডিং এ আরটিভিতে প্রচারিত নাটক, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতেও এনজিও গুলোর মাধ্যমে পায়ুকামে উৎসাহিত করা, বিনামূল্যে কনডম-লুব্রিকেন্ট বিতরণ – এই সবকিছুকে দেখতে হবে একটি বৃহৎ, গ্লোবাল এজেন্ডার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ হিসেবে। যে বিষয়টা উপলব্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল শত্রুপক্ষ জানে এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ বা কম্পোনেন্টের যেকোন একটা দিয়ে রাতারাতি জনমত বদলে ফেলা যাবে না। সেটা তাদের উদ্দেশ্যও না। বরং তাদের উদ্দেশ্য হল ছোট ছোট ইঙ্ক্রিমেন্টাল পরিবর্তনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সামাজিক মূল্যবোধকে বদলে দেওয়া। এটাই কালচারাল সাবভারশানের টাইম-টেস্টেড পদ্ধতি। হঠাৎ করে একটা বড় পরিবর্তন সমাজে উপর চাপিয়ে দিতে চাইলে সেটা ব্যাকফায়ার করার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু যখন ধীরে ধীরে ক্রমবর্ধমান মাত্রায় পরিবর্তনটা উপস্থাপন করা হয় তখন এক পর্যায়ে গিয়ে সমাজ তা মেনে নেয়।

.

সহজ উদাহরনঃ একটা সময় বাংলাদেশে বুকে ওড়না না দিয়ে গলায় ওড়না দেয়াটা খারাপ মনে করা হতো। এই সময়টাতে যেসব মেয়েরা জিন্স-টিশার্ট পড়ে ঘুরে বেড়াতো তাদের ব্যাপারে সমাজের অধিকাংশের ধারণা ছিল এরা উগ্র, অশ্লীল ইত্যাদি। কিন্তু পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের ফলে যারা একসময় জিন্স-টিশার্ট পরিহিতাদের উগ্র বলতেন তারাই তাদের মেয়েদের এখন জিন্স-টিশার্ট পড়াচ্ছে, এবং ব্যাপারটা এখন প্রায় সম্পূর্ণ ভাবে ‘নরমাল’। গলায় ওড়না ঝোলানো থেকে টি-শার্টে আসার ব্যাপারটা রাতারাতি করার চেস্টা সমাজ মেনে নেয়নি। বিরোধিতা করেছে। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন পরিবর্তন হয়েছে তখন সেই একই সমাজ খুশি মনে একে মেনে নিয়েছে।

.

কার্ক-ম্যাডসেনের ব্লু-প্রিন্টের প্রথম ধাপ এটাই। মানুষকে সমকামিতার ব্যাপারে ডিসেনসেটাইয করা।

 
‘প্রথম কাজ হল সমকামি এবং সমকামিদের অধিকারের ব্যাপারে অ্যামেরিকার জনগনের চিন্তাকে 
অবশ করে দেওয়া,তাদের সংবেদনশীলতা নষ্ট করে দেওয়া [desensitization]। মানুষের চিন্তাকে 
অবশ করে দেওয়ার অর্থ হল সমকামিতার ব্যাপারে তাদের মধ্যে উদাসীনতা তৈরি করা...একজন 
স্ট্রবেরি ফ্লেইভারের আইস্ক্রিম পছন্দ করে আরেকজন ভ্যানিলা।একজন বেইসবল দেখে আরেকজন 
ফুটবল। এ আর এমন কী!’ 
 [Kirk & Madsen, The Overhauling of Straight America ]
 

কার্ক-ম্যাডসেনের মতে প্রাথমিক পর্যায়ে উদ্দেশ্য এই একটি। সমকামিতা যে একটি জঘন্য বিকৃতি, চরম সীমালঙ্ঘন, ও ঘৃণ্য পাপাচার তা সম্পর্কে মানুষের সংবেদনশীলতাকে নষ্ট করে দেওয়া। তাদের ভাষায় –

‘সমকামিতা একটি ভালো জিনিস - একেবারেই শুরুতেই তুমি সাধারন মানুষকে এটা বিশ্বাস করাতে 
পারবে, এমন আশা বাদ দাও। তবে যদি তুমি যদি তাদের চিন্তা করাতে পারো যে সমকামিতা হল 
আরেকটা জিনিষ (ভালো না খারাপ না –জাস্ট আরেকটা ব্যাপার) তাহলে ধরে নাও আইনগত ও 
সামাজিক অধিকারের আদায়ের লড়াইয়ে তুমি জিতে গেছো।’
 [Kirk & Madsen, The Overhauling of Straight America ]

.

 সমকামিতার প্রচার ও প্রসারের জন্য যারা কাজ করছে তাদের রেটোরিক খেয়াল করলে দেখবেন তাদের অধিকাংশ ঠিক এই মেসেজটাই দিতে চাচ্ছে। ‘সমকামিতা ভালো বা খারাপ না, জীবনের একটা বাস্তবতা মাত্র’। পহেলা বৈশাখের সময় শাহবাগে সমকামি প্যারেড কিংবা ঈদের সময় ঈদের নাটক হিসেবে সমকামিদের গল্প তুলে ধরার পেছনে একটি মূল উদ্দেশ্য হল সমাজের বিকৃতকামী এক্সট্রিম মাইনরিটিকে সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা। একই সাথে সমকামিতাকে ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত করা, যেমনটা জাতিসংঘের Free & Equal ক্যাম্পেইনেও করা

.

ভিকটিমহুড – সমকামিতা জন্মগতঃ কার্ক-ম্যাডসেনের আরেকটি সাজেশান হল সমকামিদের ভিকটিম হিসেবে উপস্থাপন করা। সমকামিদের ভিকটিম হিসেবে চিত্রিত করার দুটি ডাইমেনশান থাকবে। প্রথমত, সমকামিতাকে একটি সিদ্ধান্তের পরিবর্তে প্রাকৃতিক বা জন্মগত হিসেবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে সমকামিদের জন্মগতভাবেই ভিকটিম হিসেবে উপস্থাপন করা। দ্বিতীয়ত, সমকামিদের সমাজ দ্বারা নির্যাতিত হিসেবে চিহ্নিত করা।

.

বাংলাদেশে এবং বিশ্বজুড়ে যারা সমকামিতার প্রচার ও প্রসারের কাজ করে তাদের প্রপাগ্যান্ডা ও বক্তব্য আপনি সবসময় এ দুটো মোটিফ দেখতে পাবেন।

.

সমকামিরা জন্মগতভাবেই সমকামি এটা প্রমানের উদ্দেশ্য হল যদি সমকামিতাকে জন্মগত বা প্রাকৃতিক প্রমান করা যায় তাহলে সমকামিদের সম্পূর্ণ নৈতিক দায়মুক্তি সম্ভব। সমকামিতা যদি জন্মগত হয় তাহলে সমকামিতা একটি ‘অ্যাক্ট’ বা ক্রিয়া হিসেবে নৈতিকভাবে নিউট্রাল, কারন এর উপর ব্যক্তির কোন নিয়ন্ত্রন নেই। কিন্তু সমকামি জন্মগত – এই দাবির কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তো নেই-ই, বরং বিভিন্ন পরীক্ষা ফলাফল ইঙ্গিত করে যে Sexual Oreintation নির্ভর করে ব্যক্তির ‘চয়েস’ বা স্বেচ্ছায় গৃহীত সিদ্ধান্তের উপর [৮]।

.

আরেকটি বিষয় হল সমকামিতা যদি জন্মগত হয় তাহলে অন্যান্য বিকৃত যৌনাচার কেন জন্মগত বলে গন্য হবে না? শিশুকামি, বা পশুকামিদের কেন অপরাধী গণ্য করা হবে? ইন ফ্যাক্ট শিশুকামের সাথে সমকামের, বিশেষ করে পায়ুকামের সম্পর্ক তো হাজার বছরের পুরনো। প্রাচীন গ্রিসে শিশুদের সাথে মধ্য বয়স্ক পুরুষদের পায়ুকামী সম্পর্ক বা Pederasty প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে চালু ছিল প্লেইটো তার রিপাবলিক ও ল’স – রচনাতে প্রাচীন পেডেরাস্টি এবং সমকামিতার ব্যাপক প্রচলনকে গ্রীসের অধঃপতনের একটি কারন হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। অ্যামেরিকাতেও অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেদের সাথে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অধিকারের জন্য আন্দোলন করা NAMBLA (North American Man Boy Love Association) – দীর্ঘদিন ছিল গে-প্রাইড প্যারেডের নিয়মিত অংশ। বিখ্যাত অ্যামেরিকান কবি সমকামি অ্যালেন গিন্সবার্গ (সেপ্টেবর অন যশোর রোড – এর লেখক) ছিল NAMBLA এর সদস্য। এছাড়া অসংখ্য সমীক্ষার মাধ্যমে একথা প্রমাণিত যে সমকামিতার সাথে অন্যান্য যৌন বিকৃতির বিশেষ করে শিশুকামিতার ঘনিষ্ট সম্পর্ক আছে [ ৯]। সমকামিতার বিশেষ করে পায়ুকামিতার সাথে শিশুকামের গভীর সম্পর্কের ব্যাপারে সংক্ষেপে বোঝার জন্য পায়ুকামি ও শিশুকামি কেভিন বিশপের এই উক্তিটি যথেষ্ট –

 
"Scratch the average homosexual and you will find a pedophile" 
[Kevin Bishop in an interview. Angella Johnson, “The man who loves to love boys,” 
Electronic Mail & Guardian, June 30, 1997]

.

সুতরাং যদি সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষন জন্মগত হতে পারে তাহলে সমলিঙ্গের অল্পবয়েসীদের প্রতি আকর্ষন কেন জন্মগত হতে পারবে না? কেন ধর্ষনের তাড়না অনুভব ধর্ষকরা জন্মগত বিচ্যুতির কারনে ভিকটিম গণ্য হবে না? কেন পশুকাম জন্মগত বলে গণ্য হবে না? Sexual Oreintation যদি জন্মগতই তবে কেন তা কেবলমাত্র সমকামিদের ক্ষেত্রে জন্মগত বলে বিবেচিত হবে?

.

কিন্তু সব যুক্তি, প্রমান এবং বিবেচনাবোধের বিরুদ্ধে গিয়ে সমকামের প্রচারকরা একে জন্মগত বলে যাচ্ছে। আর ‘জন্মগত’ এই বৈশিষ্ট্যের কারনে কেন সমকামিদের আলাদা ভাবে দেখা হবে, এ নিয়ে আবেগঘন বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছে। এবং এ দুটি দিক থেকে সমকামিদের ভিকটিম প্রমান করার মাধ্যমে সাধারন মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।

 .

মিডিয়াঃ কার্ক-ম্যাডসেনের মতে সমকামিতার স্বাভাবিকীকরন ও গ্রহনযোগ্যতা তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমের একটি হল মিডিয়া। বিশেষ করে ভিযুয়াল মিডিয়া –

‘সোজা ভাষায়, ভিযুয়াল মিডিয়া, টিভি ও সিনেমা হল ভাবমূর্তি তৈরির ক্ষেত্রে পশ্চিমা সভ্যতার 
সবচেয়ে শক্তিশালি মাধ্যম। অ্যামেরিকান প্রতিদিন গড়ে টিভি দেখে। এই সাতঘন্টা সময় সাধারন মানুষের 
চিন্তার জগতে ঢোকার এমন একটি দরজা আমাদের জন্য খুলে রেখেছে যার মধ্য দিয়ে একটা ট্রোজান 
হর্স ঢুকিয়ে দেওয়া সম্ভব...যতো বেশি ও যতো উচ্চস্বরে সম্ভব,সমকাম, সমকামিতা এবং সমকামিদের 
কথা বলুন। বারবার দেখতে দেখতে থাকলে প্রায় যেকোন কাজই মানুষের কাছে ‘নরমাল’ মনে হওয়া 
শুরু করে...তবে মানুষের সামনে আগেই সমকামি আচরণ উপস্থাপন করা যাবে না – কারন তা মানুষের 
কাছে জঘন্য বলে মনে হবে এবং মানুষ সমকামিতার বিরুদ্ধে চলে যাবে। তাই সমকামিদের যৌনাচার 
সাধারন মানুষের সামনে উপস্থাপন করা যাবে না। আগে তাবুর মধ্যে উটের নাক ঢুকাতে দিন, তারপর 
আস্তে আস্তে বাকিটাও ঢুকানো যাবে।’
 [Kirk & Madsen, The Overhauling of Straight America ]

.আর বাস্তবিকই ধীরে ধীরে এই দরজার মধ্য দিয়ে ট্রোজান হর্স ঢুকাতে সমকামি মাফিয়া সমর্থ হয়েছে। ৯০ এবং ২০০০ এর প্রথম দশক জুড়ে বিভিন্ন ডেইলি সোপ ধীরে ধীরে সাধারন অ্যামেরিকানদের মধ্যে সমকামিতার গ্রহনযোগ্যতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জৌ বাইডেন ২০১২ সালে সরাসরি সমকামিতা প্রচার করা টিভি সিরিয ‘উইল অ্যান্ড গ্রেইস’-এর নাম উল্লেখ করে বলে –

 
“একজন পুরুষ আরেকজন পুরুষকে একজন নারী আরেকজন নারীকে বিয়ে করবে এতে আমার 
বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই...আমার মনে হয় না অ্যামেরিকান মানুষকে (সমকামিতা সম্পর্কে) শিক্ষা 
দেয়ার ব্যাপারে উইল অ্যান্ড গ্রেইসের মতো ভূমিকা আর কেউ বা আর কোন কিছু রাখতে পেরেছে। 
যা অন্যরকম মানুষ সেটাকে ভয় পায়। কিন্তু এখন মানুষ (সমকামিতার ব্যাপারে) বুঝতে শুরু 
করেছে।”[১০]

আর একইভাবে আজ বাংলাদেশেও এই একই দরজার ভেতর দিয়ে সেই একই ট্রোজান হর্স ঢোকানোর জন্য কর্মতৎপরতা চলছে। কার্ক-ম্যাডসেনের ব্লু-প্রিন্ট বাংলাদেশে প্রায় অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। সমকামিতার প্রচারে মিডিয়ার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কার্ক-ম্যাডসেনের মত ছিল প্রাথমিকভাবে প্রিন্ট মিডিয়া থেকে শুরু করা, এবং তারপর ধীরে ধীরে ভিযুয়াল মিডিয়ার দিকে আগানো। বাংলাদেশে সমকামিতা প্রচারের কাজ শুরু হয় ৯০ এর দশকের শেষের দিকে।

প্রাথমিকভাবে সমকামিতা প্রচারকদের কাজ ছিল অনলাইন চ্যাট গ্রুপ, মেইল গ্রুপ, ফোরাম ইত্যাদির মাধ্যমে সমকামিদের মধ্যে ব্যক্তি পর্যায়ে পরিচিতি তৈরি করা, বিভিন্ন সময় একত্রে ‘মিলিত’ হওয়া এবং কিছু নির্দিষ্ট অঙ্গনে সমকামিতার প্রচার করা, এবং সমকামিতার পক্ষে জনমত তৈরি করা। পাবলিক স্ফেয়ারে যখন তারা তাদের বিকৃতি প্রচারের শুরু করে তখন তারা সেটা করে প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে। ২০১০ সালে বইমেলায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনী থেকে বের হয় কুখ্যাত মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অ্যামেরিকা প্রবাসি ইসলামবিদ্বেষি অভিজিৎ রায়ের বই ‘সমকামিতা’। অভিজিৎ রায় এই বইয়ে বিজ্ঞানের জগাখিচুড়ি ব্যাখ্যা দিয়ে, এবং নানা লজিকাল ফ্যালাসি ব্যবহার করে সমকামিতা-কে স্বাভাবিক মানবিক আচরণ হিসেবে প্রমান করার চেষ্টা করে। তার অন্যান্য লেখার মতো এই লেখাটিও ছিল মূলত বিভিন্ন পশ্চিমা লেখকের লেখার ছায়া অনুবাদ। ২০১০ সালে অগাস্টে আলতাফ শাহনেওয়াজ নামে একজনের লেখা অভিজিৎ রায়ের বইটির রিভিউ প্রকাশ করে প্রথম আলো। আর এর মাধ্যমে প্রায় সবার অলক্ষ্যে তাদের বিশাল পাঠকবেইসের ড্রয়িং রূপে এই জঘন্য বিকৃতির সাফাই পৌছে দেয় প্রথম আলো।

.

বাংলাদেশে প্রকাশ্যে সমকামিতার প্রসারে পরবর্তী বড় পদক্ষেপটি আসে ২০১৪ সালে, রূপবান নামে একটি ম্যাগাযিনের মাধ্যমে। আর এই ম্যাগাযিনের পক্ষে প্রচারনা চালানো হয় প্রিন্ট মিডিয়া (যেমন ডেইলি স্টারে বিজ্ঞাপন দেয়ার মাধ্যমে) এবং অনলাইনের মাধ্যমে। ২০১৪ সালে রূপবানের প্রথম সংখ্যার প্রকাশনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ হাই-কমিশনার রবার্ট গিবসন, ব্যারিস্টার সারা হোসেনসহ আরো অনেকে। এ থেকে গ্লোবাল সমকামি মাফিয়ার প্রভাব এবং বাংলাদেশে এদের বিস্তার সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। ম্যাগাযিনটির প্রকাশনার খবর ফলাও করে প্রচার করা হয় ডেইলি স্টার, বাংলা ট্রিবিউন, ঢাকা ট্রিবিউন, বিবিসি সহ বিভিন্ন পত্রিকা ও গণমাধ্যমে। রূপবান পত্রিকার সম্পাদক ছিল সাবেক পররাস্ট্রমন্ত্রী দীপুমনির আত্মীয় অ্যামেরিকান দূতাবাসে চাকরিরত জুলহাস মান্নান। পরবর্তীতে জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা অভিজিৎ রায় এবং জুলহাস মান্নানকে যথাক্রমে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে হত্যা করে [১১]।

.

কার্ক-ম্যাডসেনের প্রেসক্রিপশান অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে প্রিন্ট মিডিয়ার ব্যবহারের পর এবার বাংলাদেশে সমকামিতার প্রচারকরা ভিযুয়াল মিডিয়ার দিকে মনোযোগ দেওয়া শুরু করেছে। সম্প্রতি আরটিভিতে প্রচারিত নাটক তাই নতুন কিছু না, বরং প্রায় দুই দশক পুরনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নতুন একট পর্যায়ের শুরু কেবল। গ্রামীনফোন প্রযোজিত এই নাটকে হুবহু কার্ক-ম্যাডসেনের শিখিয়ে দেওয়া ‘যুক্তি’গুলোই তুলে ধরা হয়েছে, এবং নাটকের ডায়ালগের মাধ্যমে সমকামিতাকে জন্মগত ও স্বাভাবিক, এবং সমকামিতা নৈতিকভাবে নিউট্রাল একটি কাজ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। নাটকে দেখানো হয়েছে সমকামি চরিত্রের পক্ষ নিয়ে একটি চরিত্র আরেকটি চরিত্রকে বলছেঃ


‘ও পায়ুকামি (not straight), এটা কি ওর দোষ? সে কি এটাকে বেছে নিয়েছে? না। ওয়ার্ল্ডে নানা 
ধরনের মানুষ থাকে, তাহলে ও কেন থাকতে পারবে না? ও কি অস্বাভাবিক? না। ও কি একজন 
অপরাধী? না। ও তোমার আমার মতোই নরমাল মানুষ।’ 
[রেইনবো,আরটিভি,নির্মাতাঃ আশফাক নিপুন, প্রযোজনাঃ গ্রামীন ফোন ] 

যদি বাংলাদেশে কার্ক-ম্যাডসেনের ব্লু-প্রিন্ট নির্বিঘ্নে অনুসৃত হতে থাকে তাহলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা এরকম আরো অনেক নাটক, শর্টফিল্ম, স্কিট এবং জনসচেতনতা মূলক বিজ্ঞাপন দেখতে পাবো। এক পর্যায়ে পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতাগুলোতে সমকামিতার স্বপক্ষে প্রবন্ধ ছাপা হবে। সমকামিতা নিয়ে বানানো নাটক ও সিনেমাকে জাতীয় পুরষ্কার, মেরিল প্রথম-আলো পুরস্কার সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরষ্কার দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমকামি অধিকার সম্পর্কে প্রকাশ্যে নানা ওয়ার্কশপের আয়োজন করা হবে, পাবলিক স্কুলের কারিকুলামে সমকামিতা ও সমকামি অধিকার সম্পর্কে আলোচনা যুক্ত করা হবে। এবং যদি সম্ভব হয় তাহলে সমকামি কোন তরুন বা তরুণীকে দেশী ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার মাধ্যমে ইয়ুথ আইকন হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। আর এভাবে ধীরে ধীরে সমকামিতাকে সামাজিক ও রাস্ট্রীয়ভাবে গ্রহনযোগ্য করে তোলা হবে একসময় একে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া হবে। অথবা আইনগত স্বীকৃতি ছাড়াই একসময় সমকামিতে সমাজে ব্যাপক গ্রহনযোগ্যতা লাভ করবে, যেমনটা বর্তমানে যিনার ক্ষেত্রে হয়েছে।

.

যদি এইভাবেই চলতে থাকে তাহলে অত্যন্ত অন্ধকার এক ভবিষ্যৎ এর মোকাবেলা আমাদের করতে হবে। তাই এ ব্যাপারটা বোঝা জরুরী যে এ দ্বন্দ্বটা শামোয়ীক কিছু না। কোন একটা নাটক বা বই বা ম্যাগাযিনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষ সমকামিতাকে রাতারাতি গ্রহনযোগ্যতা দিতে চাচ্ছে না। এই নাটক, বই বা ম্যাগাযিনগুলোও এভাবে বানানো হচ্ছে না। তারা চাচ্ছে ক্রমাগত মানুষের সামনে সমকামিতা, ও সমকামিতার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে, সমকামিতাকে স্বাভাবিক প্রমান করতে। প্রাকৃতিক প্রমান করতে। এই ব্যাপারে মানুষের সংবেদনশীলতা নষ্ট করে দিতে। মানুষকে ডিসেনসেটাইয করতে। জনমতকে পরিবর্তন করতে, সামাজিক মূল্যবোধকে বদলে দিতে। প্রতিপক্ষের আছে প্রায় অফুরন্ত ফান্ডিং, মিডিয়া এবং আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক সমর্থন। সুতরাং একটি নাটকের পর সেই নাটক নিয়ে লেখালেখি করলে অনেক মানুষ এসব সম্পর্কে জেনে যাবে – এমন ধারণা যেমন সঠিক না, তেমনি ভাবে একটি নাটকের পর কেবলমাত্র আরটিভি-গ্রামীনফোন বর্জনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে হারানো যাবে এমন চিন্তা করাও ভুল। যদি আসলেই এই বিশাল মেশিনারীকে থামাতে হয়, যদি এই এজেন্ডার বাস্তবায়নকে বন্ধ করতে হয় তাহলে সমকামি এজেন্ডা বাস্তবায়নের পেছনে থাকা কাঠামো সম্পর্কে জানতে হবে, একে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। তবে সেই আলোচনা আরেক দিনের জন্য তোলা থাক।

=========================

লেখক- Asif Adnan

=========================

আরো পড়ুনঃ

সমকামীদের মিথ্যা দাবী এবং নাস্তিকদের মিথ্যাচার (প্রথম পর্ব)- http://bit.ly/2fiqYCV

সমকামীদের মিথ্যা দাবী এবং নাস্তিকদের মিথ্যাচার (দ্বিতীয় পর্ব)- http://bit.ly/2f7f8bK

সমকামীদের মিথ্যা দাবী এবং নাস্তিকদের মিথ্যাচার (তৃতীয় পর্ব)- http://bit.ly/2eAKeKx

সমকামীদের মিথ্যা দাবী এবং নাস্তিকদের মিথ্যাচার (শেষ পর্ব) – https://goo.gl/TL4Lah

সমকামিতা,স্বাধীনতা,রোগ নাকি অন্য কিছু – https://goo.gl/ivVWhe

সমকামিতার শাস্তি – https://goo.gl/OCHKGq

=========================

[৯] ক) ১৯৭৯ এ পায়ুকামি গবেষক জে ও ইয়াং এর ‘The Gay Report’ অনুযায়ী ৭৩% পায়ুকামি উত্তরদাতা বলেছে তারা কোন না কোন সময়ে ১৬-১৯ বছরের কম বয়েসী ছেলেদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছে। [Jay and A. Young, The Gay Report (New York: Summit Books, 1979), p. 275)]

খ) শিশু যৌন নির্যাতনের উপর চালানো একটি কানেইডিয়ান সমীক্ষা দেখা যায় অপরিচিত শিশুদের (non-familial victims) উপর যৌন নির্যাতন চালানো ৯১% শিশু নির্যাতনকারী বলেছে তারা কখনো সম/পায়ুকামি সম্পর্ক ছাড়া অন্য কোন রকম যৌন সম্পর্কে জড়ায়নি [অর্থাৎ তারা সমকামি]। [ W. L. Marshall, et al., “Early onset and deviant sexuality in child molesters,” Journal of interpersonal Violence 6 (1991): 323-336, cited in “Pedophilia: The Part of Homosexuality They Don’t Want You to see,” Colorado for Family Values Report, Vol. 14, March 1994. ]

গ) যদিও পায়ুকামিরা অ্যামেরিকার মোট জনগোষ্ঠীর ২% এরও কম কিন্তু শিশুদের উপর চালানো যৌন নির্যাতনের এক-তৃতীয়াংশের বেশি সংঘটিত হয় তাদের দ্বারাই। [The Proportions of Heterosexual and Homosexual Pedophiles Among Sex Offenders Against Children: An Exploratory Study,” Journal of Sex and Marital Therapy 18 (Spring 1992): 3443, cited in “The Problem of Pedophilia,” op. cit. Also, K. Freund and R.I. Watson, “Pedophilia and Heterosexuality vs. Homosexuality,” Journal of Sex and Marital Therapy 10 (Fall 1984): 197, cited in NARTH Fact Sheet. )]

ঘ) সমকামি ম্যাগাযিন ‘Advocate’ – এর ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন সেকশানের উপর চালানো একটি কন্টেন্ট স্টাডিতে ডঃ জুডিথ রেইসমান এবং ডঃ চার্লস জনসন দেখতে পান, পায়ুকামি যৌসম্পর্কের জন্য সঙ্গীর খোজে দেওয়া এসব বিজ্ঞাপনের বিশাল একটি অংশ হল ‘চিকেন’-দের [পায়ুকামিদের নিজেদের মধ্যে প্রচলিত স্ল্যাং] বা অপ্রাপ্তবয়স্ক খোজে। [Judith A. Reisman, Ph.D., “A Content Analysis of ‘The Advocate,”‘ unpublished manuscript p. 18, quoted in “Pedophilia: The Part of Homosexuality They Don’t WantYou to See,” ibid. )]

শেয়ার করুনঃ

‘নীল নকশা’ (প্রথম কিস্তি)

নিচের ছবিটা গত ৮ ই অগাস্ট (২০১৭) এ প্রকাশিত ডেইলি স্টারের সাপ্তাহিক ম্যাগাযিন লাইফস্টাইল থেকে নেওয়া। আমি ছবিটা ব্লার করে দিয়েছি। মূল লিঙ্কে অরিজিনাল ছবি আছে। ছবিতে যাকে দেখা যাচ্ছে উনি একজন নারী, কিন্তু উনার মেইকাপ থেকে শুরু করে পোশাক পর্যন্ত সব এমনভাবে ঠিক করা হয়েছে যাতে করে উনার প্রাকৃতিক লৈঙ্গিক পরিচয় বোঝা না যায়। অর্থাৎ উনি যে একজন নারী তা বোঝা যায়। প্রশ্ন করতে পারেন “নারী” না বলে “প্রাকৃতিক লৈঙ্গিক পরিচয়” – এর মতো কঠিন ফ্রেইয ব্যবহার করার কারন কী? 

.

কারন হল, “Androgyny in a fair world” – নামের এই আর্টিকেলের উদ্দেশ্য নিছক ক্রসড্রেসিং (ছেলেরা মেয়েদের মতো পোষাক পড়া, ভাইসভারসা) জাতীয় কিছু প্রমোট করা না। বরং এ ধরনের আর্টিকেলের উদ্দেশ্য নারী পুরুষের লৈঙ্গিক পরিচয় সম্পর্কে স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির বদলে একটি বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রমোট করা। এধরনের আর্টিকেলের উদ্দেশ্য মানুষের স্বাভাবিক লৈঙ্গিক পরিচয়ের বদলে Gender Confusion বা Gender Dysphoria প্রমোট করা। 

.

Gender Confusion বা Gender Dysphoria বলতে কী বোঝায়? প্রাকৃতিক ভাবে আমরা মানুষের লৈঙ্গিক পরিচয় বাইনারী। কোন ব্যক্তি হয় পুরুষ অথবা নারী। এর পাশাপাশি অতি নগন্য সংখ্যক মানুষ থাকেন যাদের শরীরে একই সাথে নারী ও পুরুষের যৌনাঙ্গ থাকে। এধরনের মানুষদের বলা হয় True Hermaphrodite (Transsexual বা Transvestite না) বা Intersex. সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী প্রতি ২০০০ জনে ১ জন True Hermaphrodite ব্যক্তিকে পাওয়া যায়। অর্থাৎ জনসংখ্যার ০.০৫%। অর্থাৎ মানুষের লৈঙ্গিক পরিচয় যে বাইনারী এটার প্রমাণ পৃথিবীর বাকি ৯৯.৯৫% মানুষ। কিন্তু আধুনিক সময়ের অতি আধুনিক মানুষের মধ্যে কিছু মানুষের হঠাৎ করে মনে হল, মানুষের পরিচয়ের ব্যাপারে এই “পুরনো প্যারাডাইম”-কে ভেঙ্গে এক নতুন প্যারাডাইম তৈরির চিন্তা করলো। তারা বলা শুরু করলো লৈঙ্গিক পরিচয় প্রাকৃতিক ভাবে নির্ধারিত কিছু না। মানুষ তার সামাজিক প্রেক্ষাপট, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ঐতিহ্যের ইত্যাদির মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে নিজেকে হয় পুরুষ অথবা নারী হিসেবে চিহ্নিত করে। এটা নিজের বেছে নেয়ার ব্যাপার, পূর্বনির্ধারিত কিছু না। তাই এমন হতে পারে যে একজন মানুষ শারীরিকভাবে পুরুষ কিন্তু তার ভেতরের ‘সত্তাটি’ নারীর। অথবা একজন মানুষ শারীরিকভাবে নারী কিন্তু তাদের ভেতরে পুরুষ সত্তার বসবাস। যখন এমনটা, অর্থাৎ ব্যক্তির আভ্যন্তরীণ পরিচয় তার বাহ্যিক পরিচয়ের সাথে সাঙ্ঘর্ষিক হয় তখন একে বলা হয় Gender Dysphoria। আবার এমনো হতে পারে যে একজন মানুষ শারীরিকভাবে যাই হোক না কেন, সে কখনো কখনো নিজেকে নারী আবার কখনো নিজেকে পুরুষ হিসেবে আইডেন্টিফাই করে। তার কোন নির্দিষ্ট gender বা লৈঙ্গিক পরিচয় নেই, সে Gender Neutral বা Gender Fluid।

.

কথাগুলো অনেকের কাছে হয়তো পরিচিত মনে হচ্ছে। সমকামিতা, উভকামিতা ইত্যাদির ব্যাপারে সামান্য ভিন্ন আঙ্গিকে প্রায় একই যুক্তি দেওয়া হয়। তাহলে Gender Dysphoria বা Gender Fludi বিষয়ক এই নতুন আবর্জনা দর্শন প্রচারের কারন কী? বা এ নিয়ে নতুন করে কথা বলার বা চিন্তিত হবার কী প্রয়োজন? একথা ঠিক যে সমকামিতা-উভকামিতা সংক্রান্ত ধ্যানধারনার সাথে Gender Fluid/Gender Dysphoria এর এ নতুন ধারনার অনেক মিল আছে। বিশেষত এ দুই ধারনার এন্ড রেসাল্ট এক। সমাজে ব্যাপকভাবে বিকৃত যৌনতার প্রসার, নারীপুরুষের স্বাভাবিক সম্পর্ক তথা বিয়ে নামক পবিত্র ও প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তি এবং ব্যক্তি পরিচয় ও সমাজ যৌনতানির্ভর হয়ে পড়া। 

.

কিন্তু অনেক সাদৃশ্যে পাশাপাশি কিছু মূল্যবান পার্থক্যও আছে। মূল পার্থক্য হল, যখন সমকামিতা-উভকামিতা ইত্যাদির করা বলা হয় তখন স্বাভাবিকভাবে আমরা এটাকে যৌনতার সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয় হিসেবে চিন্তা করি। যেকারনে সমকামিতা-উভকামিতা-পশুকামিতা-অযাচার ইত্যাদিকে স্বেচ্ছায় বেছে নেওয়া যৌন বিকৃতি হিসেবে চিনতে আমাদের বেগে পেতে হয় না। কিন্তু যখন একজন পুরুষের শরীরে আটকে পড়া একজন নারীর করুণ উপাখ্যান – হিসেবে হুবহু একই কথা উপস্থাপন করা হলে আমরা অনেকেই হাতসাফাইটা ধরতে না পেরে এটাকে একটি জেনুইন শারীরিক বা মানসিক সমস্যা মনে করবো। এ ধরনের মানুষের প্রতি এবং এধরনের cause এর প্রতি সহানুভূতি অনুভব করা শুরু করবো। সহজ ভাষায় সমকামিতা-উভকামিতাকে সাধারন মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে উপস্থাপন করা যতোটা কঠিন সে একই জিনিষকে Gender Dysphoria/Gender Fluid – এর মোড়কে উপস্থাপন করা, সহানুভূতি ও গ্রহনযোগ্যতা অর্জন করা ততোটাই সহজ। আর এর প্রমাণ হল ডেইলি স্টারের লাইফস্টাইলের এ আর্টিকেল। Gay Clothing বা How to dress like a Lesbian – কোন জাতীয় দৈনিকে এমন শিরোনামে অথবা এমন টপিকে কোন আর্টিকেল ছাপানো এখনো বাংলাদেশে সম্ভব না হলেও, অবলীলায় Gender Dysphoria/Gender Fluidity নিয়ে আর্টিকেল ছাপানো যাচ্ছে। এর আগেও ডেইলি স্টার সমকামি ম্যাগাযিন ‘রূপবান’ – এর প্রচারনা করেছিল, বিজ্ঞাপন ছেপেছিল। কিন্তু নিজেরা সরাসরি সমকামিতা প্রচার করা থেকে বিরত ছিল। কিন্তু এই নতুন “প্যারাডাইম” তৈরির নামে এখন তারা নিশ্চিন্তে সে একই কাজ করছে। এ আর্টিকেলে মূলত বিকৃতিকে উপস্থাপন করা হয়েছে শেকল ভাঙ্গা, বাক্সের বাইরে চিন্তা করা আর প্রথাবিরোধিতার সাথে। আর্টিকেলের শিরোনামের ঠিক নিচেই লেখা হয়েছে – “‘Queer’, ‘Gender Queer’; ‘Between Genders’ — words all too familiar? Sadly, they are. These derogatory terms exist in our social lexicon as many of us are still tied up in mind boxes, unable to think beyond the square, incapable of relating to non-conformity or anything that goes beyond the traditional route to life.” [Lifestyle, The Daily Star, 8th August, 2017]

.

এলেখাটি যখন লিখছি তখন প্রথম আলোর মাসিক ম্যাগাযিন কিশোর আলোর মাধ্যমে আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রেটোরিক প্রচার করার খবর ভাইরাল। আর এদুটি খবরের মধ্যে নিঃসন্দেহে কিশোর আলোর খবরটি অধিক গুরুত্ব পাবার দাবি রাখে। তবে আমার আশংকা হয় মোটা দাগের হবার কারনে যতো সহজে কিশোর আলোর ব্যাপারটা আমাদের চোখে পড়েছে, ডেইলি স্টারের লাইফস্টাইলের ব্যাপারগুলো হয়তো ততোটা সহজেই চোখ এড়িয়ে যায়। আর সমস্যার ধরন সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষ অজ্ঞ হবার কারনে হয়তো দীর্ঘমেয়াদে লাইফস্টাইল জাতীয় ম্যাগাযিনরা যা প্রমোট করছে, এধরনের প্রচারনা আরো বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। একারনে মিডিয়ার ব্যাপারে, মিডিয়া আমাদের চিন্তার উপর ঠিক কতোটুক প্রভাব ফেলছে, মিডিয়ার কাছ থেকে কতোটুক আমরা নিচ্ছি – এ ব্যাপারে অত্যন্ত সজাগ থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে আমাদের পরিবারের নারী ও শিশুদের চিন্তাভাবনা কি মিডিয়ার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে কি না সে ব্যাপারেও সতর্ক হওয়া উচিৎ। 

বাংলাদেশের মিডিয়া দীর্ঘদিন ধরেই কিছু নির্দিষ্ট ধ্যানধারণা-আদর্শ সাধারন মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে কাজ করছে। মিডিয়া খুব ধীরে ধীরে কিন্তু নিয়মিত কাজটা করে তাই ব্যাপারটা সবসময় হয়তো আমাদের চোখে পড়ে না। ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ মানুষের কাছে গ্রহনযোগ্য করে তোলা, একটি নির্দিষ্ট ধর্ম বা জনগোষ্ঠী ডিমনাইয করা, কোন অস্বাভাবিক আচরণ বা বিকৃতিকে স্বাভাবিক করে তোলার কাজে মিডিয়ার ব্যবহার আজকে নতুন না। বরং সোশ্যাল এঞ্জিনিয়ারিং এবং পাবলিক ওপিনিয়ন ম্যানিপুলেশানে সবচেয়ে কার্যকরী অস্ত্র হল মিডিয়া। এর একটি কারন হল মিডিয়া মানুষের জন্য তথ্যের উৎস হিসেবে কাজ করে। যার ফলে কিছু তথ্য চেপে রাখা বা বদলে দেয়ার মাধ্যমে মিডিয়া ইচ্ছেমতো কোন বিষয়ে সাধারন মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, মিডীয়া বিভিন্নভাবে মানুষের সামনে ট্রেন্ডসেটারের ভূমিকা পালন করে। পোশাক, বই, সিনেমা, গ্যাজেট থেকে শুরু করে আদর্শ পর্যন্ত – বিভিন্ন ক্ষেত্রেই মিডিয়াই মানুষকে জানিয়ে দেয় কোনটা ‘হিপ অ্যান্ড ট্রেন্ডি’ আর কোনটা সেকেল। আর যেমনটা উপরের উদাহরন থেকে দেখতে পাচ্ছেন, মিডিয়ার কাজ হল সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রচার করা। অন্ধকারকে আলো আর আলোকে অন্ধকার হিসেবে উপস্থাপন করা। 

.

ডেইলি স্টারের সাপ্তাহিক ম্যাগাযিন লাইফস্টাইলের আলোচ্য প্রবন্ধের লিঙ্কঃ http://ow.ly/e0JG30eiMH0

===========

লেখকঃ Asif Adnan

=============

লেখকের ফেসবুক আইডি লিংক- https://goo.gl/WXdp4w 

শেয়ার করুনঃ